দশ মিনিট ধরে বাসে বসে আছি। ইডেন কলেজের সামনে থেকে উঠেছি সন্ধ্যা ৬.১০-এ। বাস এগিয়েছে ১০ কদম, লেগেছে ১০ মিনিট। জ্যাম নিউমার্কেট পর্যন্ত, আরও ৪০মিনিট সর্বনিম্মে বসে থাকতে হবে বাসে। মোবাইলে গেমস খেলে আলসে সময়গুলোকে দূরে ঠেলে রাখছিলাম।
সন্ধ্যার আধারীতে রাস্তার সোডিয়াম বাতি গুলো জ্বলে আছে, আর ছড়াচ্ছে হলুদ আলো। চারদিকে কেমন জানি সব হলুদ হলুদ।
খেলা বাদ দিয়ে বাইরের মানুষগুলো দেখতে লাগলাম। দেখতে দেখতে চোখ পড়লো এক মেয়ের উপর। খুব সুন্দরী বলবোনা, তবে তার মুখে যেনো কিসের একটা সৌন্দর্য্য লেগে আছে। হালকা একটা চিন্তার টান তার চোখে, ঘন ঘন হাতের ঘড়ি দেখছে। যেনো অপেক্ষা করছে কারো জন্য।
আমি দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না তার মুখটা থেকে। সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো পড়েছে তার এক গালে। আর অন্য গালটাতে চলছে হালকা আলো আর অন্ধকারের এক খেলা। তার মুখটা যেন হয়ে উঠেছে এক অনন্য অসাধারণ শিল্পকর্ম। চেয়ে থাকলাম অনেকক্ষন।
বলতে পারেন ধ্যানই হয়তো পেয়ে বসেছিলো, বাসটি যদি না আগাতো টেরই পেতাম না, আমি চেয়েছিলাম তার দিকে প্রায় পনের মিনিটের মতো। এর মাঝে বারংবার মন চেয়েছি বাস থেকে নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করি তার চোখের সেই চিন্তার কারণের কথা, অথবা কার জন্য অপেক্ষা সে বারংবার হাতঘড়িটাকে দেখছে তার কথা। পারলাম না, সাহস কুলোয় নি। এগোতে থাকলো আমার বাস যথারীতি, সময়ও এবং আমিও।
কিছুদূর এগোতে গিয়ে চোখ পড়লো আরেক চেহারায়। এই চেহারায় নায়িকা হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নেই, দেখার পর এই কথাটায় মাথা এসেছিল প্রথম। কেনো এসেছিলো জানা নেই। চোখে চশমা, লম্বাটে চেহারায় একটা কর্কশতার ভাব আছে, হয়তো তাই। হাতে তার কয়েকটা বই, খাতা, মুখে ছোট্ট একটা হাসি, একটা ছোট্ট টোল সেই সঙ্গে আছে তার গালে। কর্কশতার মাঝেও কেমন একটা নিষ্পাপ ভাব আছে মুখটায়। চেয়েই থাকতে মন চায়না, তবুও চোখ সরানো যায়না।
আলোর খেলা এখানেও। সোডিয়াম বাতির হলুদ বাতি পড়েছে তার একগালে। বাসের পেছনে ছিলো একটা প্রাইভেট কার, তার হেডলাইটের সাদা আলো অন্য গালে। সেই দৃশ্যের কথা ভাষায় বর্ণনা করা অবাষ্ঞনীয়, ব্যর্থ। চশমার পেছনের চোখগুলোতে খুশি খুশি ভাবে সাথে অশ্রুর ফোটার অস্তিত্ব, সেইখানে আলোর প্রতিফলনের খেলা। চেয়ে থাকলাম এখানে এক দৃষ্টিতে।
হঠাৎ কানের কাছে একটা গানের শব্দ এসে ধাক্কা মারলো, পরিচিত সুরে। দৃষ্টির ধ্যানে সুরটা চিনতে পারলাম না, তবে ধাক্কায় ধ্যানটা ভেঙ্গে গেল। সেকেন্ড পড়ে বুঝতে পারলাম মোবাইল বেজে চলছে। ধরে হ্যালো বলতেই মায়ের ধমক, "কিরে কই তুই? ছোটটার যে সামনে পরীক্ষা, পড়াতে হবে না? তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।" ধমকের চোটে সব ধ্যান ভেঙ্গে গেল সাময়িক ভাবে। সামনে চেয়ে দেখলাম জ্যামের প্রায় সামনে এগিয়ে এসেছি।
এরপর আর ৫মিনিট ছিলাম সেই জ্যামে। তখনো মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে সেই চেহারাদুটো, যাদের সাদামাটা চেহারায় আলো আধারীর খেলা তাদের চেহারাটাকে এনে দিয়েছিলো অবর্ণনীয় সৌন্দর্য, ক্ষনিকের সৌন্দর্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


