"মৎস্য মারিব, খাইব সুখে" প্রবচনখানি আলস্যতার পরিচায়ক হইলেও ইহাকে কার্যে পরিনত করিতে পারিলে বাঙ্গালী কি পরিমান সুখী হইত তাহা বর্ননা করা কঠিন। বাঙ্গালীর মৎস্য প্রীতি তাহাকে ঋণের দায়েও ফেলিতে পারে। তাহা সত্তেও মৎস্য বিনা বাঙ্গালী রসনা পরিতৃপ্ত হয়না। এইপার বাংলায় বাংলাদেশ মানেই প্রথম যেই শব্দ জিভের জল ট্রাফিক সিগনালে আটকাইয়া মুখবিবর হইতে বাহিরে নির্গত হয় তাহা "ইলিশ"।
বাংলাদেশ যাইব শুনিতেই দাদার প্রথম কথা ছিল গিয়া গোটা মাছ ভাজিয়া খাইব। আমিও মনে মনে পুলকিত ছিলাম। মাছ খাইবার জন্য নহে নৌকায় করিয়া তাহার শিকার করিবার জন্য। মাছের প্রতুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইবার জন্য পথিমধ্যেই মাকে বারে বারে নানান জিজ্ঞাসায় অতিষ্ঠ করিয়া তুলিলাম। মা বলিলেন আর কিছু বলিব না। পৌঁছিয়া নিজেরাই দেখিবি।
মামার বাড়ি প্রবেশের পূর্বেই বিশালাকায় দিঘী। এইখানে কাহারও নিকট গল্প করিলে তাহাদের আন্দাজ সেই দিঘীর অর্ধেকেও পৌঁছায় না। বলি দিঘী, তাহারা বলে পুকুর। প্রথম দর্শনেই যাহা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল তাহা হইল সেই দিঘীর একপাড়ে বাঁধা নৌকাখানি।
পরদিনই দাদার অর্ডার গোটা মাছ রাধিঁতে হইবে। সৈন্য সামন্ত মৎস মারিতে নামিয়া গেল, সাথে আমি। রুইকাৎলা যাহা ধরা পড়িল তাহা দাদার উদরে ঠাসিয়াও ভরা যাইবে না। হয়তো দাদার খাইবার সখের কারনেই আরেক জীবের প্রতিনিধি জালে উঠিল (তাহারা সাধারনত সাধারন জালে ওঠেন না)। তাহা গলদা চিংড়ি। আমাদের এই জীবন কালে ঐ সাইজের চিংড়ির দর্শন আর মেলে নাই। এক হাত লম্বা তাহার দাঁড়া। দাদার রুচি পরিবর্তন হইয়া গেল নিমেষেই। ঐ চিংড়ি চাই। ততক্ষনে চিংড়ি ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। দাদা গেল ক্ষেপিয়া। কিছুতেই আর চিংড়ি জালে আসিলেন না। সেইদিন রুই কাৎলার দলই দাদার উদরে খাবি খাইলেন। তবে মা'র কারনে দাদাভাই আমার ৩কেজি সাইজের কাৎলা একা খাইবার জেদে অনড় থাকিতে পারিলেন না।
তালুকদারের নাতি আসিয়াছে শুনিয়া এলাকাময় নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইবার ধুম পড়িল। পরদিন প্রত্যুষে জানিতে পারিলাম আজিকে আরেক মামা আমাদের আপ্যায়ন করিবার সুযোগ পাইয়াছেন। তিনি দাদার জন্য গোটা মাছ এবং আমার নিমিত্ত নৌকাবিহার করিয়া মৎস্য শিকারের ব্যবস্থা করিয়াছেন। সকালেই চলিয়া গেলাম। আমি যৎপরোনাস্তি মৎস্য শিকার আর দাদা গোটা মাছ খাইয়া বাড়িতে ফিরিয়া জানিতে পারিলাম দূপুরে চিংড়ির ব্যপারী আসিয়া চিংড়ি ধরিয়া লইয়া গিয়াছে। মামা আমার কড়কড়া নোট দেখিয়া সবই বিক্রি করিয়া দিয়াছেন। নোটের নেশায় ভাগীনা মনে আসে নাই। ভাগীনার অবস্থা দেখি মামী মাঠে নামিলেন। জানা গেল ব্যপারী চিংড়ির ধর লইয়া গেলেও তাহার মস্তক লন নাই। চিংড়ির মস্তক নামক জটিল বস্তুখানি বিদেশীদের মুখে রুচে না। আর ঐ মাথার ঘিলু খাইয়াই বাঙ্গালী দুধের স্বাদ ঘোলে মিটায়। অগত্যা চিংড়ির মাথা হইতে ঘিলু চাঁচিয়া বাহির করা হইল। সেই ঘিলু দিয়া যাহা তৈয়ারী করা হইয়াছিল তাহার স্বাদ অদ্যাবধি আমার জিহ্বায় লাগিয়া রহিয়াছে। ভাগ্যে কেহ বিদেশীদের এই ব্যাঞ্জন পাক করিতে শিখায় নাই। তাহা হইলে ইহাও জুটিত না। দাদাভাই চক্ষু হইতে অগ্নি বর্ষণ করিয়া খাইতে খাইতে বলিলেন, ইহাই যদি এত স্বাদ যাহা পাই নাই তাহা না জানি কিরুপ হইবে!!!
বাংলাদেশ পৌঁছিয়া প্রথম বাসনা প্রকাশ করিয়াছিলাম ইলিশ খাইব বলিয়া। ইহাতে সকলেরই সায় ছিল মানে আমারও। কারন এইপারে শিশু মুখেভাতেই জানিতে পারিয়া যায় এইখানের ইলিশের কৌলিন্য নাই। ইলিশ মানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই ইলিশ। মায়ের গ্রামের বাড়িতে জানিতে পারিয়াছিলাম ঢাকায় গেলে তাহা জুটিবে। অতএব ছিলাম চুপচাপ। ভ্রাতাও আমার এই বিষয়ে অধিক জেদ না করিয়া চুপেচাপে জিভে শান দিয়া যাইতেছিলেন। ঢাকায় পৌঁছিয়াই ভ্রাতা জিহ্বার ধার পরীক্ষা করিতে ব্যাস্ত হইয়া পড়িল। "কপালে নাই ঘি, ঠকঠকাইলে হইবে কি?"। যেই সময়ে আমরা বাংলাদেশে গিয়াছিলাম সেইসময় ইলিশের দল সাগর বক্ষে প্রেম পত্র লিখিতে ব্যাস্ত।
কবে হইবে প্রেম আর মিলিবে কবে?
পাড়িতে আসিয়া ডিম,
কড়াইতে যাবে।
অতএব আবারও দুধের স্বাদ ঘোলে। টিনবন্দি ইলিশ শুঁটকি খাইয়া দেশে ফিরিতে হইল। ভ্রাতা কহিলেন, খালি ডায়লগ, কিছুই নাই। টাঁটকা চিতলের পেটি আর রুই-কাতলা, ফলির ঢেঁকুর তাহার স্মরনে আসিল না।
তাহার পর বহুদিন ইলিশ খাইয়াছি। যেহেতু কিনিতে হইয়াছে এইপারে তাই মৎস ব্যপারী হাজার কসম খাওয়া সত্তেও তাহা বাংলাদেশের ইলিশ সমতুল্য বলিয়া কখনও পরিগনিত হয় নাই। সকলকেই বলা ছিল সম্ভব হইলে বাংলাদেশ হইতে সোজাসুজি আনা ইলিশ হাতে উপস্থিত করিবি। দীর্ঘ ১৫ বৎসর পর এক বন্ধু সেই কর্ম সফল করিল। বাংলাদেশে কেনা ইলিশ "হিলি" বর্ডার দিয়া আমাদের নিকট পৌঁছাইল। মৎসখানি হাতে পাইয়াই বুঝিলাম ইহা রান্নার মাসীর নিকট হস্তান্তরীত করিলে ইলিশভাঁপা না রকেট মাছের ঝোল বুঝা যাইবে না। অতএব "অনুমান" শরনাপন্ন। তাহাদের রন্ধনরুচি সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। মৎস কাটিলেন অনুমান, রাঁধিলেন কাকীমা আর খাইলাম আমরা। ইলিশ লইয়া মেসে যেই কাড়াকাড়ি পড়িল তাহা বর্নিতে আরেক মহাকাব্য হইয়া যাইবে। দুঃখ থাকিয়া গেল, আমি বাংলাদেশী ইলিশ খাইতে পারিলেও ভ্রাতার শানিত জিহ্বায় তাহা দিতে পারিলাম না।
ইলিশে জমিল খানা, চিংড়ি হইল শেষ। মাছ ভাত পাতে আজি, মনেতে বাংলাদেশ।
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।