আমার প্রিয় পোস্ট

যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরানী প্রকাশ্য পথে হত্যার প্রতিশোধ চায়না আমি তাদের ঘৃণা করি

এক কিশোরের চোখে মুক্তিযুদ্ধের অমলিন স্মৃতি < ২১ > সেই রাতে যেন কেয়ামত নেমে এসেছিল

০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:৪৪

শেয়ারঃ
0 0 0



কনকনে ঠান্ডা আর কুয়াশা ভেদ করে আমাদের জিপটা এগিয়ে চলেছে। হুড নেই বলে প্রচন্ডা ঠান্ডা বাতাসে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। আমার গায়ে সেই খাকি রঙের সোয়েটার আছে ঠিকই কিন্তু তাতেও শীত মানাচ্ছে না! আমি শীতে জড়সড় হয়ে খাবারের সসপ্যানের ধারে বসে আছি। কারো কোন কথা নেই। একটানা ছুটে চলেছে জিপটা। একসময় আমার চেনা জায়গাও পার হয়ে গেল, তাও জিপ থামল না। আমাদের সেই বাঙ্কারগুলোও পেরিয়ে এলাম। জিপ ছুঁটে চলেছে। একটানা গো গো শব্দ আর বাতাস কাটার হিস হিস শব্দ আর কিছুক্ষণ পর পরই পেছন থেকে কামানের গোলা ছুঁটে যাওয়ার শব্দ। ঝাঁকি খেতে খেতে একসময় আমাদের জিপটা যেখানে থামল সেই জায়গাটা আমার অচেনা। জিপটা যেখানে থেমেছে সেখানে অস্থায়ী একটা বড় তাবু টাঙানো হয়েছে। জিপ থেকে খাবারের সসপ্যান আর গোলাবারুদের বাক্সোগুলো নামিয়ে সেই তাবুর ভেতরে নেওয়া হলো। তাবুর ভেতর আরো পাঁচ-ছয় জন বসে খুব দ্রুত ম্যাগজিনে গুলি ভরছে। আমাকে তাবুতে রেখে জিপটা আমাদের বা দিকে চলে গেল। আমি কি করব বুঝতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকলাম।

প্রায় অন্ধকারে কাগজের আড়াল দিয়ে একটা টিমটিমে মোমবাতি জ্বলছে। ওরা সেই অল্প আলোয় ম্যাগজিনে গুলি ভরছে। এমন সময় আমাকে চমকে দিয়ে একজন আমার নাম ধরেই বলে উঠল-‘মনজু হাত লাগা বাবা’! আমি একটু কাছে গিয়ে টের পেলাম এই লোকটা এমদাদুল কাকার টিমের গেরিলা। নাম জানিনা, কিন্তু চিনি। চুয়াডাঙ্গাতেই কাকাদের পাড়ায় থাকতেন। ক্যাম্পেও দেখেছি। আমি চটপট বসেই ম্যাগজিনে গুলি ভরতে শুরু করলাম। ঠান্ডায় ঠিক মত গুলি ধরে চাপ দিয়ে ভরতে পারছিলাম না। বার বার পিছলে যাচ্ছিল। সেই কাকা বললেন-সসপ্যানে হাত ঠেসে ধর, গরম হবে। সেই মত ধরতেই হাতটা একটু গরম হলো। তারপর একের পর এক ম্যাগজিনে গুলি ভরছি......হঠাৎ আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে একসাথে যেন শত শত এসএলআর, রাইফেল, এলএমজি গর্জে উঠল.....শুরু হয়ে গেল বাবার বলা সেই মরণ কামড়! এত গুলির শব্দ এর আগে শুনিনি। প্রথম ধাক্কাতেই হতচকিত হয়ে গেলোম। গুলি ভরা বন্ধ করে নির্বাক চেয়ে আছি কাকাদের দিকে.....একটু বিরতি দিয়ে আবারো সেই সম্মিলিত গুলির শব্দ। মনে হচ্ছে আমার পাশে থেকেই যেন গুলিগুলো ছুঁটে যাচ্ছে! এই সময় কাকা আবার তাড়া লাগালেন সবাইকে-ক্যুইক! আমি আবার হুমড়ি খেয়ে পড়লাম ম্যাগজিন নিয়ে। একটু পরেই জিপের শব্দ পেলাম। জিপ থেকে এবার অচেনা একজন নেমে এসে দ্রুত ম্যাগজিনগুলো জিপে তুলে নিচ্ছেন। আমরাও যার যার সামনে যে কয়টা লোডেড ম্যাগজিন আছে সব জিপে তুলে দিলাম। সাঁই করে আবার বেরিয়ে গেল জিপটা। জিপটা চলে যাবার পর পরই গুলির শব্দ বদলে গেল। এবার মনে হচ্ছে পাক সেনাদের গুলি আসছে......একসাথে অনেকগুলো মেশিনগানের শব্দ। টানা তিন-চার মিনিট ধরে..... মনে হচ্ছে লোহার শিকের উপর দিয়ে আর একটা লোহার রড টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। একটু বিরতি দিয়ে মর্টারের গোলা এসে পড়ছে! ভয়ে আমি কাকাদের দিকে তাকাচ্ছি। আমাকে ভয় পেতে দেখে একজন সান্তনা দিল-অনেক দূরে আছি, ভয় নেই কিছু হবে না। বেশ কিছুক্ষণ পর এই একঘেয়ে গুলি ভরার কাজটা ভাল লাগছিল না। আমি অপেক্ষায় আছি, এবার জিপটা এলেই উঠে বসব। কাছে থেকে যুদ্ধ দেখার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠল। আজ আমার হাতে কোন রাইফেল বা এসএলআর নেই। তাতে কি? ইচ্ছে করলে এই তাবু থেকে যে কোন একটা এসএলআর তুলে নিলেই হয়!

কান ঝালাপালা করে বুকের ভিতর ধপ ধপ শব্দ করে টানা গুলি হচ্ছে। এখন আর পৃথক করতে পারছিনা কোন কাদের গুলি। দুই পক্ষ থেকেই মর্টারের গোলা ছোঁড়া হচ্ছে, দুই পক্ষ থেকেই রাইফেল, এলএমজির ব্রাশ ফায়ার করা হচ্ছে। শুধু আমাদের মাথার উপর দিয়ে চিঁ চিঁ করে গোলা উড়ে যাওয়ার শব্দ পেলেই বুঝতে পারছি এটা ভারতীয় আর্মির ছোঁড়া কামানের গোলা। আধা ঘন্টা না একঘন্টা টের পাচ্ছিনা। এর মধ্যে আবার জিপটা ফিরে আসল। এবার আমি সোয়েটার পরা বুকের সাথে দশ-বারটা ম্যাগজিন সাপটে ধরে জিপে গিয়ে উঠলাম। ভেবেছিলাম বাবার মতই আজকের ভয়ংকর লড়াইয়ের মাঠে এরা আমাকে যেতে দেবেন না, কিন্তু কেউ কিছুই বললেন না। ম্যাগজিন রেখে আবার নেমে একটা এসএলআর নিয়ে এলাম। জিপ ছেড়ে এবার ডান দিকে যাচ্ছে। জিপের ড্রাইভারকে চিনি। সেই কাকা মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখেই ধমক দিলেন! "বাবাও বলেছেন না আসতে, তাও আমি এসেছি" শুনে আর কিছু বললেন না। কোন রাস্তা নেই কখনো ক্ষেত কখনো উঁচুনিচু মাঠের মধ্যে দিয়ে ঝাঁকি খেতে খেতে জিপটা এগুচ্ছে। কিছুক্ষণ পর এক জায়গায় জিপ থেমে গেল। আমরা লাফ দিয়ে নামলাম। নির্দেশ এলো সারি সারি উপুড় হয়ে থাকা যোদ্ধাদের কাছে চার-পাঁচটা করে ম্যাগজিন দিয়ে আসতে হবে। সহজ কাজ মনে করে আমি সবার আগে ম্যাগজিন নিয়ে দৌড়ে গেলাম......মনে হলো আমার ঠিক পায়ের কাছে গোলা ফাটল! আমি নিজের অজান্তেই লাফিয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়লাম! আমার আগেই আর সবাই মাটিতে পড়েছে.....গোলা ফাটার শব্দে মনে হয় কান বন্ধ হয়ে গেল .....কিন্তু এর পরই মানুষের মরণ চিৎকারে ভুল ভাঙ্গল! না আমার কান ফেটে যায়নি! আমরা যেখানে আছি তার আট-দশ হাত দূরে এক লাইনে একটু উঁচু ঢিবি মত জায়গায় ত্রিশ-চল্লিশ জন মুক্তিযোদ্ধা পজিশনে। ঠিক তাদের সামনে গোলা ফেটেছে! ড্রাইভারের পাশে পাশে ক্রল করে আর একটু কাছে যেয়ে যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে উঠল! আমি দুহাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম! ড্রাইভার এক হাতে শক্ত করে আমার মাথা নিজের বুকের কাছে চেপে রাখল। কিছুক্ষণ পর ভয়ে ভয়ে মাথা তুললাম।

কুয়াশা ঠাসা আকাশে চাঁদের আবছা আলোয় নিঃসাড় পড়ে আছে দুটি মৃতদেহ! একজনের হেলমেট উড়ে গেছে, কাঁধের পাশ থেকে একটা হাত নেই! আর একজনের পেটের কাছে বগলা হয়ে মাংশ খুবলে নিয়ে গেছে! আশ্চর্য ব্যাপার! একমুহূর্ত পরই সেই গ্রুপের কমান্ডার চিৎকার করে নির্দেশ দিল-‘ফরোয়ার্ড মুভ’। ড্রাইভার তাড়াতাড়ি তার হাতের ম্যাগজিনগুলো ছুঁড়ে দিল। আমার হাতের ম্যাগজিনগুলো সব মাটিতে পড়ে গেছে। তাকে দিতে দেখে আমিও খুঁজে খুঁজে তিন-চারটে ম্যাগজিন তুলে ওদের হাতে দিলাম। ওরা কুঁজো হয়ে দৌড়ে সামনে চলে গেল। ড্রাইভার সেই লাশদুটোর পাশ থেকে এসএলআর দুটো তুলে জিপে গিয়ে বসল। আমি বোকার মত দাঁড়িয়ে আছি! কি করতে হবে বুঝে উঠতে পারছিনা। রক্তাক্ত লাশ দেখে আমার তখনো ঘোর কাটেনি। পেছন থেকে ড্রাইভার জোরে ডাক দিলে এক দৌড়ে জিপে গিয়ে বসলাম। ড্রাইভার বা আর কারো যেন ওই লাশদুটোর জন্য কিছুই করার নেই। ‘অন্য সময় হলে লাশদুটো আনা হতো’ ড্রাইভারের মুখে এই কথা শোনার পর খেয়াল হলো আজকের সময়টা আসলেই অন্য সময়!

ফ্রন্ট লাইন বরাবর জিপটা রসদ পৌঁছানোর কাজ করছিল। একবার বায়ে, একবার ডানে। একটু পর পরই ফ্রন্ট লাইন বদলে যাচ্ছিল। রাত তখন কয়টা সে সম্পর্কে কোন ধারণাই করতে পারছিলাম না। এবার তাবুর ভেতরের যত ম্যাগজিন, গুলি, বন্দুক ছিল সব জিপে তুলে জিপটা বায়ে ছুঁটল। কে যেন ড্রাইভারকে বলল-‘ওকে রেখে যাও’। ড্রাইভার বলল-‘এখানে তো কেউ থাকবে না, ও বরং সাথেই যাক’। যারা তাবুতে ছিল সবাই জিপে উঠে বসল। আবার ছুঁটছে জিপ। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ জিপ থেমে গেল। আমরা নেমে একটু সামনে গেলাম। কয়েকটা খালি ব্যাগ আর গুলির বাক্সো পড়ে আছে। পাশ থেকে কে যেন বলল- ফরোয়ার্ড করছে..... সামনে বাড়াও.....জিপে উঠে বসতেই এবার জিপটা সামনের দিকে এগুচ্ছে.....পাঁচ-ছয়টা লাশ কেউ চিৎ হয়ে কেউ উপুড় হয়ে পড়ে আছে! ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকের ভিতর! এই গ্রুপে কি বাবা ছিলেন! চলন্ত জিপ থেকে লাফ দিয়ে নেমে গেলাম! আমার নামা দেখে জিপটা একটু থেমে দাঁড়াল। এক পলকে সব কয়টা লাশের মুখ দেখে আবার ফিরে এলাম জিপে! বাবা বেঁচে আছেন! অদ্ভুত একধরণের আনন্দ হলো! এখনো আমার বাবা বেঁচে আছেন! ওই যে মানুষগুলো মরে পড়ে আছেন তাদের মৃত্যুতে কষ্ট পাওয়ার বদলে আনন্দ হচ্ছে বাবা বেঁচে আছেন ধরে নিয়ে! বাবার জন্য বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। ঠিক এই সময়ের অনুভূতি বর্ণনা করা যাবে না। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর জিপটা এখন খুব আস্তে আস্তে এগুচ্ছে.....আর একটু পরেই ইঞ্জিন বন্ধ করে থেমে গেল। সবাই জিপ থেকে নেমে গেল। জিপে যা যা ছিল সব হাতে হাতে নিয়ে আমরা হেঁটে এগুচ্ছি.....কিছুদূর এগুতেই আবছা আলোয় ছায়ার মত দেখা যাচ্ছে.....গাছগাছালির ভিতর এক একটা গাছের এপাশে তিন-চার জন করে পজিশন নিয়ে শুয়ে-বসে আছে। আমরাও শুয়ে ক্রলিং করে এগুলাম। একটা আমগাছ সামনে রেখে আমরা শোয়া থেকে উঠে বসলাম। বসেই আছি। একটু পর দূরের একটা গাছের আড়াল থেকে কে যেন এক দৌড়ে আমাদের কাছে এসেই গাছের আড়ালে বসে পড়ল! বাবা! আমি দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম! অবাক হয়ে গেলাম! বাবা আমাকে সব সময় ‘তুই’ বলতেন, এখন তিনি খুব নিচু গলায় বললেন-‘তোমাকে না আসতে বারন করেছিলাম বাবা, শুনলে না’? আমি বাবার সেই কথা শুনেও যেন শুনলাম না, বরং হড়বড় করে বলে যাচ্ছি....আব্বাজী আমি ছয়-সাতটা লাশ দেখেছি, সবাই মরে গেছে, কারো হাত নেই, কারো পেট ফুটো হয়ে গেছে.....বাবা এক হাতে আমার মুখ চেপে ধরলেন-‘এই কারণেই আজ আসতে নিষেধ করেছিলাম, আজ আমরা মেহেরপুর এ্যাটাক করব, তুমি ফিরে যাও বাবা’!

টানা গুলির শব্দ, গোলা ফাটার শব্দ, মানুষর মরণ চিৎকার, শরীর থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দেখে কিনা জানিনা আমার মধ্যেও অদ্ভুত একটা পরিবর্তন এসেছিল! আমি জীবনে কোনদিন বাবাকে ‘বাবা’ এবং ‘তুমি’ বলিনি, সেই আমি বাবাকে বলে বসলাম-‘আমি তোমার পাশে থাকব বাবা’! বাবা খুব জোরে আমাকে জড়িয়ে ধরেই ড্রাইভারকে বললেন-‘ওকে দেখে রাখিস’। বাবা দৌড়ে আগের পজিশনে চলে যেতে গেলে আমিও তার পিছু পিছু দৌড় দিচ্ছি দেখে এবার তিনি জোরে ধমকে উঠলেন-‘এই পজিশনে থাকো, কখনোই দাঁড়াবে না’। আমি থতমত খেয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে এলাম। বুঝতে পারছিলাম না বাবা কেন আমাকে তার কাছে রাখতে চাইছেন না! এটা না বুঝে বরং আমার অভিমান হচ্ছিল। আমাদের এতসব ঘটনা ঘটল যেন অনেক সময় ধরে! আসলে সবই ঘটেছিল খুব অল্প সময়ে। এই সময় আমাদের এই গ্রুপের কমান্ড এলো সামনে বাড়ার। এখন কোন দিক থেকেই গুলি হচ্ছে না। আমরা নিচু হয়ে দৌড়ে যাচ্ছি.....তারই মধ্যে আবার শুরু হলো গুলি.....মুহূর্তে সবাই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। গুলি একটু থামলেই আবার সেই কুঁজো হয়ে দৌড়। পেছনের জিপটা এখন আর দেখো যাচ্ছেনা। এবার জঙ্গল পেরিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দিয়ে দৌড়াচ্ছি.....একটু পরেই দেখি সামনে নদী! তার মানে আমরা মেহেরপুরের নদীর এপারে এসে গেছি! নির্দেশ এলো নদীর পাড়ে উঁচুমত জায়গায় সবাই যেন পজিশন নেয়। একটু পরেই আমাদের আরো বা দিক থেকে একটা আগুনের টুকরো আকাশে সোজা উঠে গেল! আমার পাশ থেকে কে যেন বিড় বিড় করে বলল-‘জিরো আওয়ার’।

জিরো আওয়ার বলার সাথে সাথে আমাদের পেছন থেকে ভারতীয় আর্মির গাড়িকামান গর্জে উঠল একসাথে! শত শত গোলা ছুঁটে আসছে! গোলাগুলো এসে পড়ছে ঠিক আমাদের সামনে নদীর ওপারে একের পর এক। তারপর আরো বেশী শব্দ করে ফাঁটছে! সাথে সাথে কয়েক জায়গায় আগুন লেগে গেল। গোলা আর থামে না। একটু পর দেখলাম ওপারের বাড়িগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে। পুরো নদীর পাড় আলো আলো হয়ে উঠল। একসাথে ভারতীয় কামানের গোলা উড়ে আসার পর আর পাক সেনাদের গুলির শব্দ আসছে না। পুরো ওপারটায় যেন সবখানেই আগুন ধরে গেল! আসছে তো আসছেই.....একটানা অনেকক্ষণ গোলা ছোঁড়ার পর একটু বিরতি, আর সেই সময় আমাদের এপার থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুঁটে যাচ্ছে রাইফেল, এসএলআর, এলএমজির গুলি। আমি যে দুই দিকে দুটি গ্রুপ দেখেছি, তা ছাড়াও ক্যাপ্টেনের গ্রুপ আছে আমাদের আরো বায়ে। সেই গ্রুপটার ওপারেই নদীর পাড়ে মেহেরপুর থানা বিল্ডিং। ওই জায়গাটা আমি চিনি। আমাদের একসাথে ছোঁড়া গুলি শেষ হতেই কি মনে করে আমি হঠাৎ ফাঁকায় তিন-চার রাউন্ড গুলি করে বসলাম! এই বিপদের মধ্যেও ড্রাইভার হেসে উঠল-‘ এতক্ষণ কি মনে ছিলনা’? আমি নিজেই বুঝলাম আমি এতক্ষণ কেন যেন গুলি করতে পারিনি! ভারতীয় বাহিনীর গোলা বর্ষণ একটু থামতেই আমাদের বেশ বায়ে ক্যাপ্টেনের পয়েন্ট থেকে মর্টারের গোলা শুরু হলো। একেবারে সোজা ওপারে গিয়ে থানা বিল্ডিংয়ে ফাঁটছে। আমাদের এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে আগুন দলা পাকিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে। আমি একের পর এক ড্রাইভারকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি। ড্রাইভারও বিরক্ত না হয়ে উত্তর দিচ্ছে। ড্রাইভারও যে গুলি করতে পারে সেটা আজ দেখলাম। আমি ভাবতাম ও শুধু গাড়ি চালাতেই পারে! ড্রাইভারের ম্যাগজিন লোড করা,কাক করা, আবার পজিশন বদল করা এতই দ্রুত হচ্ছে যেন মেশিন! ওই কাজগুলোই করতে আমার ডবল সময় লাগছে।

আমরা যে খাবার নিয়ে এসেছিলাম তা কারো পেটে গেল না। কেউ মনেও করল না যে খাবার আছে। সেই খাবার জিপে না সেই তাবুতে তাও মনে পড়ল না। আমি এই ফাঁকে ড্রাইভারকে জিঞ্জেস করলাম-‘জিরো আওয়ার কি’? সে জানাল-রাত বারটা। মনে মনে ধারণা করলাম তাহলে এখন রাত একটা বা দেড়টা হবে। একটু গুলির বিরতি হলেই এটা ওটা মাথায় আসে। বাবার কথা মনে পড়ে, বাড়িতে মা-বোনরা কম্বলের তলে আরামে শুয়ে আছে ভেবে হিংসে হয়, মনে হয় আমার কি কষ্ট তা মা দেখল না! কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় মা তো জানেনই না! আমি তো না বলে চলে এসেছি! মা তো জানেন আমি ক্যাম্পে ঘুমিয়ে আছি! ক্যাম্প, ঘুম, মা, বোন, বাড়ি, কম্বল, ওম, আরাম এসব মনে পড়তেই রাগ না অভিমান কি হয় জানিনা, নিজেকে বোঝাতেও পারিনা, তবে অন্যরকম কিছু হয় সেটা বুঝতে পারি। একটু আলাদা ধরণের কিছু। কি সেটা? জানিনা।

চিন্তা করতে পারছিলাম মানে এখন গোলা ছোঁড়ায় বিরতি! কিন্তু আর বেশী চিন্তা করা হলো না, আবার একসাথে শুরু হলো গোলা বর্ষণ। মনে হলো পৃথিবীর যত কামান আছে সব আজ একসাথে গোলা ছুঁড়ছে..... একটানা বিরতিহীন......আমি এত বেশী গোলা ছোঁড়ার শব্দে ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম –যদি আমাদের উপর এসে পড়ে? ড্রাইভার পিঠে হাত রেখে বলল-ভয় নেই পড়বে না, অ্যাঙ্গেল ঠিক করা আছে। কিছুক্ষণ পর বাবা তার পজিশন থেকে ক্রল করে এসে আমাকে দেখে গেলেন। এবার আমার বেশ ভাল লাগল। সেই খুশীতে আবার যেই বাবার সাথে যেতে চাইলাম বাবা আবার ধমক দিয়ে ফিরে চলে গেলেন ক্রল করতে করতে। ভারতীয় কামান একটু থামতেই আমাদের গুলি শুরু হলো। এবার আমি আর ভুল করলাম না। সবার সাথেই গুলি ছুঁড়ছি। কোথায় লাগছে নাকি কোথাও উড়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা। একের পর এক গুলি ছুঁড়ছি। একটা গুলি সোজা হাত রেখে করতে পারলে খুব ভাল লাগছে। এভাবে কিছুক্ষন টানা গোলা বর্ষণ আবার টানা রাইফেলের গুলি চলতেই থাকল বিরতি দিয়ে। অনেকক্ষণ ধরেই ওপার থেকে পাক সেনাদের কোন গুলি আসছিল না। মনে হয় এখন রাত দুই-তিনটা হবে। আবার বেশ অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। একটু একটু করে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। শুধু হালকা ম্যাগজিন লোড করার, গুলির বাক্সো খোলার শব্দ হচ্ছে। কেউ একটু আধটু কথা বলছে, কেউ পেছন ফিরে বসে পেশাব করছে। একজন ঠুস করে ম্যাচ জ্বেলে একটা সিগারেট বা বিড়ি ধরাল। তারপর আর সেই আগুন দেখলাম না। হাতের ফাঁকে আগুন ঢেকে বিড়ি টানছে। এভাবে আরো প্রায় ঘন্টাখানেক বা আরো একটু বেশী সময় পার হয়ে গেল। আমার এখন বেশ শীত করছে। গুলি না করতে হলে সেই সময় খালি শীত লাগে, আর তখনই বাড়িতে গরম কম্বলের কথা মনে পড়ে!

চাঁদটা ঢলে আরো নীচের দিকে নেমে গেছে। এখনো অনেক কুয়াশা, তারপরও চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আজ অবাক ব্যাপার, একটা পাখিও ডেকে উঠল না, কোন কাঠবেড়ালি বা বেজি শুকনো পাতার উপর দিয়ে দৌড়ে গেলনা! অচেনা কোন পাখির অদ্ভুত ডাকও ভেসে আসল না। গুলির শব্দে পাখির ডাকও বন্ধ হয়ে গেছে! এভাবে আরো কিছু সময় পার হবার পর আবার সেই একটানা কামানের গোলা! মনে হলো পুরো মেহেরপুর শহরটা মাটির সাথে মিশে যাবে! এত যে গোলা পড়ছে তাতে তো মেহেরপুরের সব বাড়ি ঘর ভেঙ্গেচুরে দলা হয়ে যাবার কথা! এবার কামানের গোলার সাথে সাথে আমাদের গুলিও চলতে থাকল। এত জোরে গুলি শব্দ হচ্ছে যে কেউ কাউকে কিছু বললে চিৎকার করে বলতে হচ্ছে। ঠিক এই সময় আমাদের বা দিকের পজিশন থেকে একটা অদ্ভুত ধরণের গুলির শব্দ হলো। সাথে সাথে আমাদের সবাই উপুড় হওয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যার যার হাতিয়ার গোলাগুলি তুলে নিয়ে সামনে মুভ করল। আমিও তাই করতে গেলে ড্রাইভার হাত ধরে থামাল। ‘আমরা যাব না, ফিরে যেতে হবে’। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-‘কেন’? ড্রাইভার বলল-‘আমাদের বাহিনী ওপারে পার হবে, ওপারে ঠিক কি হবে আমরা জানিনা, আমাদের জিপ নিয়ে ফিরে যেতে হবে, তুমিও যাবেনা’। আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখলাম আমাদের গ্রুপের সবাই ঝপাঝপ নদীতে লাফিয়ে পড়ছে! এই কনকনে শীতের রাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে আমার গায়ে কাঁটা দিল। শির শির করে উঠল গোটা শরীর। ছপছপ করে ওরা নদী পার হয়ে গেল। আমি আর ড্রাইভার এপারে দাঁড়িয়ে দেখছি। নদীর ওপারে ওরা পৌঁছানোর পর ওদের খুব ছোট ছোট দেখাচ্ছিল। দূর থেকে চাঁদের আলোয় মনে হচ্ছে ছোট ছোট বেড়াল হেঁটে হেঁটে পাড় বেয়ে উঠে যাচ্ছে। বাবাও মনে হয় সেই ভাবে বেড়ালের মত পাড় বেয়ে উঠে গেছেন। এখন আর গোলা ছুঁটে আসছে না। আমাদের এরাও কোন গুলি করছে না। সব খুব শান্ত হয়ে গেছে। ড্রাইভার আমার পিঠে একটা জোরে চাপড় দিয়ে বলল-‘কাক্কু শালারা ভাগছে মনে হচ্ছে, আমরা মনে হয় মেহেরপুর দখল করছি’! আমি এক ভাবে ওপারে তাকিয়ে আছি! ‘আমরা মনে হয় মেহেরপুর দখল করছি’ কথাটা কানে বেজে চলেছে......এর পর কি হবে সে সম্পর্কে কোন ধারণা নেই আমার। আরো কিছুক্ষণ পরে ড্রাইভার আমার হাত ধরে টান দিল। ‘চলো জিপের কাছে যেতে হবে’। জিপে উঠে বসার পর জিপটা চেড়ে দিল। পুবদিকে একটু একটু আলো আলো হয়ে উঠেছে......আবার প্রচন্ড শীত লাগা শুরু করল.....এই প্রচন্ড শীতে বাবাও নদীর পানি সাঁতরে ওপারে গেছে..........

চলবে.......


 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): এক কিশোরের চোখে মুক্তিযুদ্ধের অমলিন স্মৃতিকিশোর মুক্তিযোদ্ধামুক্তিযুদ্ধবাঙ্গালীবাংলাদেশীবাংলাদেশ১৯৭১৭১'৭১মনজুরুল হকস্মৃতিকথাগেরিলাপাকিস্তানপূর্ব বাংলাবিহারী197171'71bangladeshfreedom fighterliberation warbangladeshibanglaeast pakistanwest pakistan.... ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ; ;
প্রকাশ করা হয়েছে: মুক্তিযুদ্ধস্মৃতিকথা  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১০ ভোর ৪:২০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৪:০২
ফারহান দাউদ বলেছেন: অনেক বেশি দাম দিয়ে নিতে হয়েছে, যতবার লেখাগুলো পড়ি সেটাই মনে হয়।
০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:০৫

লেখক বলেছেন:
এখন সেই "দাম" আর "মূল্য" নিয়ে চুলচেরা বাছবিচারের শেষে নিট প্রাপ্তি একরাশ হতাশা! আর এটাই পরবর্তি শাসকদের মূল লক্ষ্য ছিল, তারা পুর্ণমাত্রায় সফল।

২. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৪:১৯
মুনশিয়ানা বলেছেন: মুগ্ধ হয়ে পড়ছি... যুদ্ধের শিউরে ওঠা বর্ণনা। দুঃসাহসিক একদল যোদ্ধার মাতৃভুমিকে শত্রুমুক্ত করার মরণপন লড়াই।

এই যোদ্ধাদের জানাই অন্তরের সেরা শ্রদ্ধা আর সম্মান!!
০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:১০

লেখক বলেছেন:
অথচ এই যোদ্ধারা কোন কালেও তাদের বীরত্ব কোন পাল্লায় মেপে মূল্য নিরুপণ করেননি! প্রতিদান চাননি! শুধুই কিছুটা স্বীকৃতি, তাও আমরা দিতে পারিনি। মাত্র কিছুদিনের ভেতরই এই মহান যুদ্ধটা হয়ে দাঁড়ালো-"গন্ডোগোলের বছর"!!!

৩. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৪:৩৪
kisuna বলেছেন: মুনশিয়ানা বলেছেন: মুগ্ধ হয়ে পড়ছি... যুদ্ধের শিউরে ওঠা বর্ণনা। দুঃসাহসিক একদল যোদ্ধার মাতৃভুমিকে শত্রুমুক্ত করার মরণপন লড়াই।

এই যোদ্ধাদের জানাই অন্তরের সেরা শ্রদ্ধা আর সম্মান!!
০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৫৭

লেখক বলেছেন:
আপনাকে ধন্যবাদ কিছুনা।

৪. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:১১
পি মুন্সী বলেছেন: কিশোরের মানবিক চোখে এবারের বর্ণনা খুব ভাল হয়েছে। জায়গাটাও খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ। পড়ে মনে করাতে পেরেছেন - যেন আমিও যুদ্ধের মাঠে সব দেখতে পাচ্ছি।

যুদ্ধের মাঠে বাবা ছেলের সম্পর্ক - অপূর্ব। আপনার বাবার জন্য রইল আমার সশ্রদ্ধ ভালবাসা।

০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:২১

লেখক বলেছেন:

অনেক পরে জেনেছিলাম; বাবা কিছুতেই আমাকে তার পাশে রাখতে চাইছিলেন না কারণ, তার বা আমার মৃত্যু যেন কাউকে সামনা সামনি দেখতে না হয়!

যদিও এই বাবা-ছেলের সম্পর্ক পরবর্তীতে আমার রাজনৈতিক মতাদর্শের ভেদাভেদে অনেকটা দূরের হয়ে গেছিল... তবুও বাবার জন্য আমার গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।

অ.ট. আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুমাতে হবে। কাল যদি সময় করতে পারেন তাহলে একবার মেইলে নক করলে কিছু জরুরী কথা সেরে নেওয়া যাবে।

৫. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ৭:২৯
রাজর্ষী বলেছেন: মুগ্ধ হয়ে পড়ছি।
০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৩

লেখক বলেছেন:
শেষ করে এনেছি রাজর্ষী, আর একটি পর্ব....

০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৪

লেখক বলেছেন:
শুভ নববর্ষ।
ভাল থাকুন সারাটা বছরজুড়ে...

০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৭

লেখক বলেছেন:

হ্যাটস অফ টু অল ফ্রিডম ফাইটারস।

৮. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০:১৪
মাহবুব সুমন বলেছেন: একটা জিনিস জানার ছিলো মনজু ভাই, আপনি সব খানেই এসএলআরের কথা বলছেন। কিন্তু .৩০৩ এর কথা আসছে না। সেসময় কি সবাইকেই এসএলআর ইস্যু করা হতো ? আমার জানা মতেতো একটা প্লাটুনে ২/১ জনকে এসএলআর দেয়া হতো।
০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৫৬

লেখক বলেছেন:
না না, তা কেন হবে! আমি থ্রী নট থ্রী না বলে সব খানেই "রাইফেলের" কথা বলেছি ৩০৩ না লিখে রাইফেল লিখতে বা বোঝাতে সহজ। আর একবার পড়ে দেখুন। কখনো কখনো শুধু "হাতিয়ার" উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের ওখানে ইপিআররা প্রায় সবাই রাইফেল ব্যবহার করলেও সিভিলিয়ানরা এসএলআর পছন্দ করত। কোন ঘাটতি ছিলনা।

৯. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:০৭
নাজমুল আহমেদ বলেছেন: সম্মুখ যুদ্ধের দারুন বর্ণনা পড়লাম
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:১১

লেখক বলেছেন:
আসলে যা যা ঘটেছিল তার সব কিছুই নিখুঁত ভাবে তুলে আনা যায় না। কিছুটা ধারণা দেওয়া যায় মাত্র.......

১০. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:২৫
ফিরোজ-২ বলেছেন: মুগ্ধ হয়ে পড়ছি... যুদ্ধের শিউরে ওঠা বর্ণনা। দুঃসাহসিক একদল যোদ্ধার মাতৃভুমিকে শত্রুমুক্ত করার মরণপন লড়াই।

এই যোদ্ধাদের জানাই অন্তরের সেরা শ্রদ্ধা আর সম্মান!!

ভালো থাকুন................।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ২:৫৮

লেখক বলেছেন:
হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোনখানে!

এরই মত এখন আমাদের চৈতণ্য হলো শ্রদ্ধা ভালবাসা সন্মান নয় কেবল একটু স্বীকৃতি, যে, আমরা কেবল আমাদের জন্য নয়, সকল মানুষের জন্য প্রাণ সপে দিয়েছিলাম।

১১. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১২:১০
ত্রিশোনকু বলেছেন: "ওই যে মানুষগুলো মরে পড়ে আছেন তাদের মৃত্যুতে কষ্ট পাওয়ার বদলে আনন্দ হচ্ছে বাবা বেঁচে আছেন ধরে নিয়ে!"

-কি অবিশ্বাস্য,একেবারে অনন্য অনুভূতি।


খুব ধীরে ধীরে পড়ছিলাম। যাতে শেষ না হয়ে যায়। কিন্তু শেষ হয়ে গেল।


আমাদের এই মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের, অনন্য দেশপ্রেমের কোন স্বীকৃতিই আমরা আজও দেইনি।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:০০

লেখক বলেছেন:
তার পরেও সব কিছু একসময় শেষ হয়, হয়ে যায়। আর একটি পর্বে এই ইতিহাসেরও যবনিকা ঘটবে........

কাকে কি বলি, আমি নিজেই বিদায় ব্যথায় ভারাক্রান্ত হচ্ছি!

১২. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১:০৪
মোস্তাফিজ রিপন বলেছেন: হ্যাংলার মতো বলি, এই পর্বের গাঁথুনিটা অসাধারণ।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:১০

লেখক বলেছেন:
তেমন কিছু না, ক্লাইমেক্স এসে গেছে তো, তাই অলংকরণ কমে এসেছে, শুধু নিরেট ঘটনাবলি উঠে আসছে....

১৩. ০২ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:২৮
পল্লী বাউল বলেছেন: খবর শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি।



শুভ নববর্ষ।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:৩১

লেখক বলেছেন:

ধন্যবাদ বাউল।

আপনি ঠিক কোন খবর শুনে কষ্ট পেলেন?
গত কয়েক দিনে আমি কষ্ট পেয়েছি এমন দুটি ঘটনা ঘটেছে।

১৪. ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১:৫০
দীপান্বিতা বলেছেন: উফ! দম বন্ধ করে পড়ে নিলাম!....কি দুর্ধর্ষ অভিজ্ঞতা!!
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:৫৪

লেখক বলেছেন:
অনেক অনেক ধন্যবাদ দীপান্বিতা।

আপনার কাব্যময় জগতের বাইরে এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তাঘেরা ইতিহাস পড়ছেন জেনে ভাল লাগছে!

১৫. ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ৮:৪১
সহেলী বলেছেন: পড়তে কেন যেন কষ্ট হয় ।
আপনার যে এসব লিখতে গেলে অনেক কষ্ট হয় -- সেটা মনে করে করে পড়ি ।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৩৯

লেখক বলেছেন:
লিখতে অনেক কষ্ট হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় দগদগে ক্ষত খুঁচিয়ে তাজা করে এক ইচ্ছাকৃত কষ্ট টেনে আনছি...কিছুটা ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো সজীব করে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছি.........

তারপর যখন ভাবি এই লেখা পড়ে আমার অনেক সুহৃদ একাত্ম হচ্ছেন, সমব্যথী হচ্ছেন, তখন মনে হয় সব কষ্টের প্রাপ্য সুখ বুঝি পেয়ে গেলাম!

এই সিরিজের এমন কয়েকটি পর্ব আছে যা লিখতে গিয়ে চোখের জলে বুক ভেসেছে, কিছুক্ষণ চোখে ঝাপসা দেখেছি! স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে!

অনেক অনেক শুভ কামনা সহেলী।

১৬. ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:১০
ত্রিশোনকু বলেছেন: ঘুরে ঘুরে গেলাম।
০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৪১

লেখক বলেছেন:
মনে হয় ঠিক আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে লেখার প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন.....ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাইলে তাড়া দিয়ে জাগ্রত করছেন আপনারা সবাই মিলে।

এই অবদান কোনদিন ভুলব না!

১৭. ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:৩১
অপ্‌সরা বলেছেন: কেমন আছো ভাইয়া???


মৃত্যুর বর্ণনাগুলো পড়ে হিম হয়ে যাই।
০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:০০

লেখক বলেছেন:
ভাল আছি অপসরা।
তোমাদের খবর ভাল তো?

মৃত্যুর মনে হয় কোন বর্ণনা লাগে না,
মৃত্যু এমনিতেই যথেষ্ট পরিমানে হিম হওয়া ব্যাপার!

১৮. ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৩:২৪
খারেজি বলেছেন:
আর একটা অসাধারণ পর্ব, মনজু ভাই!

স্যালুট।
০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:০৭

লেখক বলেছেন:
সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ বন্ধু!
সব বলাবলি শেষ করে ফেলেছি, ঝাঁপি বন্ধ হয়ে গেল!!

সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

১৯. ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৬:২২
সুলতানা শিরীন সাজি বলেছেন:
আপনার কষ্টের দিন তাহলে একটু হলেও ফুরালো...।
কেমন দম আটকানো লাগতে পারে এমন লেখা লিখতে,বুঝতে পারি।
আবার ভাবি না লিখে এতগুলো বছর কেমন করে ছিলেন?
শেষ পর্বটা পড়বো এখুনি........।

আপনার জন্য।
আপনার বাবার জন্য।
আপনার সাথে যারা যুদ্ধে ছিলেন সবার জন্য শ্রদ্ধা...........

যে যেখানেই যেভাবে থাকুক.....এপারে কিংবা ওপারে.......আমাদের দোয়া রইলো।
ভালো থাকবেন মনজুরুল ভাই.........
আপনার সন্তানরা গর্বকরে বাঁচুক....।
শুভেচ্ছা।
০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:০১

লেখক বলেছেন:
এর আগে কোথাও পত্রপত্রিকায় লিখতে ইচ্ছে করলেও লিখতাম না। ভয় হতো, কেউ যদি মনে করে আমি কিছু চাইতে এসেছি!

এ পর্যন্ত যাপিত জীবনে এই অমলিন স্মৃতিগুলো থেকে থেকে মন্থন করে যাচ্ছি...আমার বড় মেয়ে, ভাগ্নিরা ভীষণ ভাবে সময়ের সাথে ব্যস্ত। তাদের ফুরসৎ নেই। তাই ছোট মেয়েটিকে নিভৃতে বসে বসে শোনাই, আর নিজেই হারিয়ে যাই সেই সোনালী দিনগুলোতে.....আমার সেই নিজের হাতে বানানো এক একটা দিন!

আমার তো গর্বের কিছু নেই
যদি সন্তানরা গর্ব করতে শেখে সেটা তাদের অভিরুচি।

২০. ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:০২
যীশূ বলেছেন: রণাঙ্গনের যুদ্ধটা দেখলাম এবার।
০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:১৯

লেখক বলেছেন: এখনো চোখ বন্ধ করলে ছবির মত ভেসে ওঠে!
এখনো ঘুমের ঘোরে আঁতকে উঠি!

তার পরও এক অনাবিল ভাললাগায় সেই সব স্মৃতির সুখস্বপ্ন দেখি...

২১. ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:১৬
নির্ঝরিনী বলেছেন: সেই ভয়াবহ রাতের বর্ননা পড়ে ভয়ে শিউড়ে উঠলাম!!!!!!

কি মরনপণ লড়াই করেছিলো সেই সব দুঃসাহসিক যোদ্ধারা....

সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সশ্রদ্ধ সালাম....
০৮ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৫২

লেখক বলেছেন:

সেই অগনিত মহৎপ্রাণ মানুষদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

২২. ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০:৫১
সামছা আকিদা জাহান বলেছেন: পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে যেন মানুষের ভয় পাবার ও একটা সীমা থাকে। একসময় মানুষ তা অতিক্রমকরে। এরপর আর ভয় বলে কিছু থাকে না।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৩৫

লেখক বলেছেন:
ঠিক তাই, মানুষ একটা সময় আর ভয় পায়না। এই ভয় না পাওয়ার সময় পর্যন্ত যেতে মানুষকে অমানুষিক কষ্ট সইতে হয়। সেই কষ্টটাই পুরো একাত্তর। পুরো নয়টি মাস!!!

 

মোট সময় লেগেছে ১.০০৯৩ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমাদের মাতৃগর্ভগুলি এই নষ্ট দেশে
চারিদিকের নিষেধ আর কাঁটাতারের ভিতর
তবু প্রতিদিন রক্তের সমুদ্রে সাঁতার জানা
হাজার শিশুর জন্ম দেয়,যারা মানুষ ।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ