ভাতের প্লেটে হাত দিলেই রাজ্যের চিন্তা মাথায় আসে শোভনের,যেন চিন্তারা এতখন তার সাথে কথা বলার সুযোগ পেল,কে কার আগে আসবে এই প্রতিযোগীতা তাদের মাঝে।তাই ভাত মুখে দেয়ার গতি তার অতি ধীর।যদি ও খিদে পেটে অবচেতনে জানান দিতেই থাকে।মাঝে মাঝ তন্ময়ের মা তাগাদা দিয়ে যান।তাতেও যে গতি বাড়ে এমন নয়।কত যে চিন্তা তার!থিসিসের কাজ শেষ করতে হবে,তাদের থিসিসটা পাবলিশ করতে পারলে যে কত এগিয়ে যাবে সে!বিদেশ যাওয়া,চাকরী সব দিক কিছুটা বেশী ই সহজ হবে তার জন্য। ১টা পার্ট টাইম জব যেভাবেই হোক খুজে পেতেই হবে,বাবা মায়ের হাত তোলা হয়ে আর কত!তাদের ও তো ক্লান্তি আছে,এ মাসের টাকাগুলো এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল!কী জবাব দেবে বাড়িতে সে?ওদিকে তার বন্ধুরা কতভাবে টাকা আয় করছে,কিছুই জানেনা ,বোঝেনা সে।এতদিন ঘরের মানে হলের রুমের বাইরে পা ই রাখেনি।তাই লিংক ও নেই বেশি,বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতার ঝুলি শুন্য।
যে কারণে বা যার জন্য আজ এত বোধ আর চিন্তারা মাথায় ভীড় করছে,যার জন্য আজ সে ঘরের বাইরে পা রেখেছিল প্রথম তার জন্যই চিন্তাটা সবচেয়ে বেশি।মাত্র ৪ দিন দেখা হয় না তার সাথে,মনে হচ্ছে কত যুগ যুগান্ত পেড়িয়ে গ্যাছে।ওর জন্য হলেও খুব তাড়াতাড়ি অন্তত ১টা পার্ট টাইম জব পাওয়া ভীষন জরুরী হয়ে পড়েছে।
আজ ও দেখা হলনা তার সাথে।বন্ধু তন্ময়ের বাসায় থাকছে আজ ৩ দিন ধরে সে।শুধু থিসিসের কাজের জন্য।এর মাঝে ফোন বেজে উঠল।অতি প্রত্যাশিত ফোন,পূর্বপরিকল্পিতভাবে নিরব,যদিও আহবান তার সরব।কিন্ত সবার সামনে ধরা যাবে না।কাটা মুরগীর মত ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে থাকে সে খাবার টেবিলে বসে।এই তাগিদে চোখের নিমেষে খাওয়া শেষ করে পড়ার টেবিলে ফিরল সে।ওপাশ থেকে সারা এল সতস্ফূর্ত,
-"হ্যালো,হ্যা ফোন ধরলে না ক্যান?
-"সরি ডিয়ার কাকিমা ছিল তো সামনে,তাই।খেয়েছ?"
-"সে খবর আর তোমার রাখার দরকার মনে হয় নেই,দয়া করে না রাখলেই খুশি হব।"
-"প্লিস,রাগ করোনা।তুমিতো জান আমি থিসিসের কাজে কত ব্যাস্ত।কিন্ত আমার মন তো.....
কথা চলতে লাগল।মোট ৪০ মিনিট।তন্ময় কিছুখন ১ দৃস্টে ওর কথা বলা দেখছিল,নিরব দৃষ্টির ও ১টা আকর্ষন থাকে,সে কথা বন্ধ করল আপাতত ।ঠিক হল পরদিন সকাল ১১টায় ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ক্যাম্পাস থেকে সোজা ইডেনের গেটে যাবে,থাকবে অপেক্ষায়।ওর ক্লাস শেষ হলেই কোথাও ঠান্ডা নিরিবিলিতে একটু বসবে তারা।
সকাল,লীনা ঘুমিয়ে ছিল,দেয়ালঘেষা খাটে দেয়ালজোরা জানালার দিকে মুখ গুজে।ধাপ করে হঠাৎ পুরো পর্দাটা বাতাসের তোড়ে উড়াল দিল,এক ঝাপটা বাতাস এসে সাড়া ঘরটা নাড়া দিয়ে গেল।লীনার ঘুম ও ভাংল।উঠে বাইরে তাকাল;অনেক পরিপক্ক মেঘের দল বৃষ্টি ঝড়ানোর অপেক্ষায় উন্মুখ।বাতাসটা থমকে আছে একটু।সে জানাল আটকে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
বৃষ্টির যেন বিরাম নেই,বাতাস আর বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে সব,কী করে বাইরে যাব!ছটফটিয়ে এ ঘর থেকে ও ঘর যাচ্ছে সে।মুঠোফোনের ডাক এল।খপ করে ধরেই বলল,"আ্যই তুমি এখন কোথায়?"
-" আমি?এইতো ক্লাস থেকে বেড়ুলাম।এখনই আসছি আমি।একটু ওয়েট কর প্লিস।"
-"আরে শোন,খুব বৃস্টি,এর মাঝে বেরুবো কী করে?আর আমি আজ কলেজে যাইনি।এখন এসনা।বিকেলে এস।আমি বিকেলে কলেজের দিকে না হয় যাব বৃস্টি থামলে।কেমন!"
"আচ্ছা,ওকে রাখছি।"এটা কী বলল সে?মুখটা কাল হয়ে গেল শোভনের।সে তো এই বৃস্টিতে ভেজার জন্য ও প্রস্তুত ছিল।আর সামান্য এই কারণে সে আসতে পারল না?কেন?তাকে কী লীনার একটু ও দেখতে ইচ্ছে হয়না?এই কী লীনার ভালবাসা এত দিনের?সে যে রাগ করে ঝপ করে ফোনটা কেটে দিল তাও কী বুঝল না লীনা?
ভাবতে ভাবতে বৃস্টিটা কী মনে করে থেমে গেল।ওহ! বাচা গেল।সে উৎফুল্ল হয়ে মুঠোফোনটা হাতে নিতেই মনের কোনে নগদ জমা অভিমান মাথা চাড়া দিল।না, সে কিছুতে ই লীনাকে ফোন দেবে না,আজ সে দেখবে কখন তাকে যাওয়ার জন্য ফোন দেয় লীনা।সে রুমে ফিরল,না খেয়েই।প্রতিমূহূর্তের অপেক্ষা আর দৃস্টি,ফোনের দিকে।মিনিটের পর মিনিট চলে যাচ্ছে।একবার সে বিছানায়,একবার বাড়ান্দায়,বাথরুমে আবার বিছানায় পায়চারী করতে লাগল।নাহ! কোন সারা নেই।এভাবে কী থাকা যায়!জামা প্যান্ট পরে সে বের হল,কোন রকম হেটে পলাশি আজিমপুর পেরিয়ে নিউমার্কেটে এসে বাস ধরল,দুদিন আগে তারই এক জুনিয়র বাস দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় পলাশি বুয়েট ক্যাম্পাসে বাস চলাচল বন্ধ।কোথায় যাওয়া যায়!ঝুলতে ঝুলতে সে এসে কলাবাগান নামল।পায়ে পায়ে হেটে এল রবীন্দ্র সরোবর।কিছুটা অবাক হল সে,এ যেন তার অবচেতন মনেরই চাওয়া যে আজ লীনার সাথে দেখা হতে ই হবে।তাই লীনার মেসের অতি কাছের বেড়ানো আর বসে বসে গল্প করার এই ডেড়াতেই সে আনমনে আশ্রয় নিয়েছে।যতই মন আনচান করুক আজ সে কিছুতেই ফোন দেবে না।১২টা,১টা, ২টা সময় কেটে যাচ্ছে,পথ চেয়ে,অপেক্ষার প্রহর কেন এত যন্ত্রনাদায়ক!অবশেষে বিকেলের আযান দিল।কই ফোন তো এল না!এভাবে কী বাঁচা যায়!শোভনের ১টা হাত মুঠোফোনের বাটন টিপতে শুরু করে দিয়েছে ততখন।সে নিজেকে থামাতে পারছেনা।
"বিকেল কী হয়েছে?"
ওপাশে কোন সারা নেই,যদিও ফোন ইন কল দেখাচ্ছে,যদিও ওপাশের পরিচিত গলার মানুষটি হ্যালো বলছে না,তবুও অভিমানাহত শোভন আবার একবার বলল বাষ্পভরা কন্ঠে "বিকেল কী হয়েছে তোমার?"
"আমি বলছি,দাদা,নন্দীতা।"
"হ্যালো,লীনা কোথায়?আমি একটু ওর সাথে কথা বলতে চাই।একটু ডেকে দেবে?
কান্নায় ডুকরে উঠছে নন্দীতা,ফোনে সে শব্দ শুনে আকুল গলায় শোভন জানতে চাইল,"কী হয়েছে নন্দীতা?ও কোথায়?ওকে দাও না!"
কান্না মাখা গলায় নন্দীতা বলল,"আর কখনই ওকে ফোন দিতে পারবোনা দাদা।কখনই আর ওর বিকেল হবে না।সে তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য তোমার সাথে সকালে ফোনে কথা বলেই তোমার সাথে দেখা করার জন্য বেরিয়েছিল।কিন্তু পারবেনা,কোনদিন ই পারবেনা।বাসায়ও ফিরতে পারবে না।শি ইজ ডেড।"
ফোনটা ঠাস করে পড়ে গেল হাত থেকে।চোখের সামনে অন্ধকার এক রাজ্য নেমে এল।দুহাতে চোখ ঢেকে সে লুটিয়ে পড়ল।
পরদিন নিজেকে রুমের খাটেই আবিস্কার করল সে।কী হল,স্বপ্ন দেখেছে নাকী সে এতখন!কীসব ভয়ানক আজেবাজে স্বপ্ন।এখনই তার সোনাপাখিটার একটু খোজ নিতে হয়!তার মুঠোফোন সক্রিয় হল।নাহ্!আর কবে যে লীনা একটু রেসপনসিবল হবে!এত বেলা পর্যন্ত ঘুমায়!ফোন বেজেই চলে।ফোন ধরার বেলায় তার কোন ততপরতা নেই।নাস্তা করে এসে আরেকবার চেস্টা করা যাবে!
নিচে নেমে ডাইনিংয়ে ঢোকার আগে কী মনে করে গেস্টরুমে ঢুকে পত্রিকাটা তুলে নিল।মূল শিরোনামটার পাশেই ১টা বেশ বড় বক্সে বেশ বড় লাল হরফে লেখা চোখে পড়ল তার,"আরেকটি তাজা প্রান ঝরে গেল মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায়"ভিতরে মাঝরি হরফে লেখা ২টো লাইন,"শিকার ইডেনের ছাত্রী লীনা/ঘাতক বাস ড্রাইভার পলাতক।"পাশে ১টা ছবি,সেই ছবি, যা শোভনের বুকে চিরদিনের জন্য আঁকা হয়ে ছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

