‘দাবার চালে ভুল করিলে রাজা খতম, সঠিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং না চিনিলে আপনি খতম’। এমন অন্ত্যমিলের পদ্য লিখে বিজ্ঞাপন দিয়ে চট্টগ্রামে কোচিং বাণিজ্যে পাকাপোক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। এসব কোচিং সেন্টারের আয়ের টাকা জমা হচ্ছে শিবিরের ফান্ডে। কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে শিবির কর্মীদের দেয়া হচ্ছে সংগঠনিক তালিম।
জানা গেছে, জামাত-শিবিরের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের পরিচালনায় নগরীতে ৫টি কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে ব্যবসা চলছে। তাদের এই ব্যবসার আয়-ব্যয়ের সঠিক কোনো হিসাব নেই। এক হিসাবে দেকা যায়, এ থেকে শিক্ষার্থীদের অর্ধকোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে । একই সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলা হয় বার্ষিক অডিট রিপোর্ট। চট্টগ্রাম
নগরীতে শিবির পরিচালিত প্রবাহ কোচিং সেন্টারের প্রসপেক্টাসে আরো ৪টি কোচিং সেন্টারের মনোগ্রামের প্রচারের কারণ ও সংযুক্তি অনুসন্ধানে এসব তথ্য পায় ভোরের কাগজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চিটাগাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট রিচার্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত ইনডেক্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মালেক ফাউন্ডেশন পরিচালিত ফোকাস, রেটিনা ফাউন্ডেশনের মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল এডমিশন কোচিং রেটিনা, কনক্রিট ফাউন্ডেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড আর্কিটেকচার ভর্তি কোচিং কনক্রিট ও প্রবাহসহ মোট ৫টি কোচিং সেন্টার নগরীতে শিবির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের নামে পরিচালিত হলেও মূলত তা সরকারের নজর এড়ানোর বিশেষ কৌশল বলে জানা যায়। আগে এসব কোচিং সেন্টারের প্রসপেক্টাসে শিবিরের বিভিন্ন প্রচারণামূলক বক্তব্য থাকলেও বর্তমানে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে সেসব আর ব্যবহার করা হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ইনডেক্স পরিচালনাকারী চিটাগাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট রিচার্স ফাউন্ডেশনটি সাম্প্রতিক সময়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। ২০০৬ সালের ভর্তি গাইড ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, কোচিং সেন্টারটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির দ্বারা পরিচালিত হয়। গাইডটির প্রচ্ছদ ও পিছনের পৃষ্ঠা সাজানো হয়েছে শিবিরের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, ৫ দফা কর্মসূচির ব্যাখ্যা, সংবিধান ও কর্মপদ্ধতিসহ ৫টি বইয়ের পরিচিতির মাধ্যমে। এছাড়া বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রয়েছে শিবিরের বিভিন্ন স্লোগান।
২০০৬ সালের চবি শিবির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ নাঈম ও সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ শিহাব উল্লাহ সে সময়ে ইনডেক্সের প্রধান পরিচালক ও পরিচালক ছিলেন। একইভাবে বর্তমান শিবির সভাপতি মু. বদিউল আলম (গ্রেপ্তারকৃত), সাধারণ সম্পাদক ইমরুল হাসান (গ্রেপ্তারকৃত), সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ও সিনিয়র সদস্য আসাদুজ্জামান বর্তমান ইনডেক্সের যথাক্রমে প্রধান পরিচালক, পরিচালক, সহ-পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জামাত এমপি শামসুল ইসলাম ফাউন্ডেশনটির চেয়্যারমান বলে জানান ইনডেক্স কর্মকর্তারা।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, চবি শিবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে ইনডেক্সের প্রধান পরিচালক ও পরিচালক হয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে ইনডেক্সের নির্বাহী পরিচালক জানান, শিবির সভাপতি শুধুমাত্র তাদের দেখভাল করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ফোকাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মালেক ফাউন্ডেশন পরিচালনা করে বলে জানান চট্টগ্রাম শাখা প্রধান মাসুম বিল্লা। কে এই আব্দুল মালেক প্রশ্ন করা হলে তিনি তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অপর একটি সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট ঢাবির রসায়ন বিভাগের আব্দুল মালেক নামক ছাত্র প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন। তিনি তৎকালীন ছাত্র সংঘ (বর্তমান শিবির) ঢাবির সভাপতি ছিলেন। এ ব্যাপারে ফোকাস মহাপরিচালক মোঃ মহব্বত আলীর সঙ্গে যোগাযোগের একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম শাখা প্রধান মাসুম বিল্লা চবি শিবিরের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ব্যাপারে তিনি ভোরের কাগজকে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
রেটিনা নামের মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল এডমিশন কোচিং সেন্টার রেটিনা ফাউন্ডেশনের নামে শিবির পরিচালনা করছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটির চট্টগ্রাম শাখা পরিচালক শরীফুল ইসলাম পিয়াস চমেক শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম চমেক শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক। রেটিনার সঙ্গে শিবিরের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে রাশেদুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তা এড়িয়ে যান।
এদিকে প্রবাহ কোচিং সেন্টার পরিচালিত হয় মহানগর শিবিরের অধীনে। মহানগর দক্ষিণ শাখা শিবির নেতা মোঃ শামীম ভোরের কাগজকে এ প্রসঙ্গে নিশ্চিত করে বলেন, এটির প্রধান পরিচালক মহানগর শিবির সভাপতি। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার ও আর্কিটেকচার কোচিং সেন্টার কনক্রিটের উপ-মহাপরিচালক মুসলেহ উদ্দীন চুয়েট শিবির সভাপতি ও শাখা পরিচালক খালকুজ্জামান চুয়েট শিবিরের সিনিয়র সদস্য বলে জানা যায়।
প্রতি বছর আয় : ভোরের কাগজের অনুসন্ধানে জানা যায় কোচিং সেন্টার ৫টির মাধ্যমে শিবির প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের থেকে প্রায় ৫২ লাখ ১৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ইনডেক্স ব্যতিত অন্যগুলো তাদের আর্থিক বিষয়ে তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়।
এ ব্যাপারে ইনডেক্সের নির্বাহী পরিচালক ভোরের কাগজকে বলেন, গত ২০১১-২০১২ সেশনে তারা শিক্ষার্থীদের থেকে কোচিং বাবদ প্রায় ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা পায়। কিন্তু বছর শেষে তাদের ঘাটতির প্রশ্নে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রধান পরিচালক বা পরিচালক বলতে পারবেন। কিন্তু তারা গ্রেপ্তার থাকায় এই মুহূর্তে তা বলতে পারছি না। এছাড়া প্রবাহ ২৭ লাখ টাকা, রেটিনা ৫ লাখ টাকা, ফোকাস ২ লাখ টাকা ও কনক্রিট ৬ লাখ টাকা প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের থেকে পায় বলে জানা যায়। ইনডেক্স ব্যতিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল এই আয়ের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা তা অস্বীকার করেন। প্রবাহের নির্বাহী পরিচালক মোঃ শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, এসব কোচিং সেন্টারের বার্ষিক আয় দুই কোটি টাকারও বেশি।
অর্থের ব্যয় : আয়ের বিশাল এই অর্থ কিভাবে ব্যয় হয় তার সুস্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা শিবিরকে উদ্বৃত্ত অর্থ তুলে দেয়। রেটিনা, প্রবাহ ও কনক্রিটের পরিচালকদের থেকে শিবিরকে অর্থ জোগানের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা তা জানাতে অস্বীকার করেন।
ইনডেক্সের নির্বাহী পরিচালক আসাদুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, শিবির রাজনৈতিক সংগঠন আর ইনডেক্স চবির ছাত্র কল্যাণমূলক সংগঠন। এ সময় তিনি শিবিরকে অর্থ জোগানের কথা নাকচ করে বলেন, ইনডেক্স শিবিরকে নয় চবির দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের অর্থের জোগান দেয়।
তবে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, এসব অর্থ যায় জামাত-শিবিরের ফান্ডে। এছাড়া কয়েক বছর আগে এসব কোচিংয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে শিবিরের দুগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষও হয়েছিল।
বিশেষ কৌশল অবলম্বন : অত্যন্ত ধুর্ততার সঙ্গে শিবির তাদের কোচিং সেন্টারের দিক থেকে সরকারের নজর এড়াতে বিভিন্ন সময় বিশেষ কৌশল গ্রহণ করে। সবগুলো কোচিং সেন্টারের পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন সব জনশক্তি তারা প্রতি বছর পরিবর্তন করে ফেলে। ফোকাস পরিচালক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে প্রথমে নিজেকে চট্টগ্রামের নতুন ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে মালিক হয়েছেন দাবি করলেও পরে সব কিছু ঢাকা থেকে জানতে অনুরোধ করে ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বছর শেষে তাদের অভ্যন্তরীণ অডিট হয়। কিন্তু অডিটের সব কাগজপত্র প্রতি বছর পুড়িয়ে ফেলা হয়। রেটিনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অডিটের কপি পুড়িয়ে ফেলার কথা স্বীকার করলেও কেন তা পুড়িয়ে ফেলা হয়, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অডিটের কপি ও বিগত বছরের সব কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলার বিষয়টি স্বীকার করে ইনডেক্স সংশ্লিষ্ট আসাদুজ্জামান কক্ষের স্বল্পতা ও ব্যয় কমানোর জন্য এমনটা করা হয় বলে জানান। এছাড়া জানা যায়, কোচিং সেন্টারগুলোতে ক্লাস নেয়া নিজেদের সাংগঠনিক কাজ হিসেবে দাবি করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবিরের সাথী ও মাস্টারস পড়ুয়া এক শিক্ষক।
তথ্যসূত্র: ভোরের কাগজ / প্রথম পাতা : ০১/০৬/২০১২
লেখক: স্বরূপ ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম ।
(রিপোর্টটি তৈরি করতে সার্বিক সহায়তা করেছেন ইকবাল হোসাইন)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




