আমি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিশেষজ্ঞ নই, তবে যখনই যেখানে এ নিয়ে ছাপা হয় বেশ আগ্রহের সাথে পড়ি। ইদানিং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়ে যা বুঝলাম তা হল বর্তমান বিদ্যুৎ সমস্যার বেশ কয়টি মূল কারন রয়েছে:
১। গ্যাসের স্বল্পতা (৭০০-১০০০ মেগাওয়াট এবং নতুন প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট ব্যবহার করা যাচ্ছে না /যাবে না)।
২। বোরো সেচের চাহিদা (প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট)।
৩। পুরনো অবকাঠামো (আজকেরও আশুগঞ্জের ৫ নং ইউনিট ওভারহলে নেয়া হল, ১৫০ মেগাওয়াট লস আর ৭ দিন লাগবে; নিয়মিতই বিভিন্ন ইউনিট ট্রিপ করে)।
৪। সাধারন চাহিদার ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি।
সামহোয়্যারইনের অনেক সদস্যই দেশের বাইরে বসবাস করেন, সুতরাং বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে স্বচ্ছ ধারনা থাকতে নাও পারে অনেকের, তাই একটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করি: এখন গড়ে ৭-৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিনত হয়েছে। সরকারীভাবে ৫৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ৩৭০০-৩৮০০ মেগাওয়াট। বেসরকারী চাহিদা ৬,৫০০ মেগাওয়াট! সামনে কোন রিলিফ দেখাও যাচ্ছে না।
বর্তমান সরকারকে হয়তো এ ব্যাপারটি নিয়ে খুব কড়াভাবে দোষ দেয়া যাবে না, কিন্তু এ ভোগান্তি লাঘবে ওনাদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগও আমি দেখছি না। এ বিষয়টা নিয়ে আরো উঠেপড়ে লাগার অন্তত মনোভাব দেখালেও জনগন মানসিক শান্তি পেতো। এইচ এস সি পরীক্ষার প্রথমদিন যতজন অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেয়া হল সবাই এ নিয়ে বেশ হাহাকার করলেন, অথচ শিক্ষামন্ত্রী নাহিদকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উনি বেশ উদাসীনতার সাথে উত্তর দিলেন: "এ ব্যাপারে তেমন কিছুই করার নেই।"
অবশ্যই অনেক কিছু করার আছে! 'ডেলাইট সেভিং টাইম' নিয়ে আসুন! শিডিউল করে বিদ্যুৎ নিন! জনগনকে বারে বারে জানান যে এ নিয়ে আপনারা কাজ করছেন আর পরের বছর বা তার পরের বছর এই এই উন্নতি হবে! অবৈধ সংযোগ কাটুন! সেদিন প্রথম আলোয় পড়লাম আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিদ্যুৎ উপদেষ্টা নাকি খুব কড়া করে প্রতিদিন কত উৎপাদন, কত খরচ সেগুলোর হিসাব নিয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বেশ উন্নতি ঘটিয়েছিলেন। এখনকার সরকার আসার পর নাকি আবার যে-কে-সে অবস্থা হয়ে গেছে! কেন? এখনকার সরকার এত বিশাল ম্যান্ডেট পেল, তাদের তো আরো উদ্যম নিয়ে ঝাপিয়ে পড়া দরকার ছিল এ সমস্যা মোকাবেলায়!
কি অদূরদর্শী দেশ আমরা! ৬-৭ বছর আগেও গ্যাস রপ্তানী নিয়ে ব্যাপক হইহই-লাফালাফি। আর এখন গ্যাসের চাপের অভাবে ৭০০-১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উৎপাদনই করা যাচ্ছে না। এই যে বিশাল একটা ধোঁকাবাজি, যে আমরা কিনা গ্যাসে ভাসছি, এর জন্য দায়ী কে (যদিও যতদূর জানি পেট্রোবাংলা এ ব্যাপারে বেশ আগে থেকেই সাবধানবানী দিচ্ছিল)?
সেদিন অফিসে এক সহকর্মীর সাথে এ নিয়ে কথাও হচ্ছিল। আমি যতদূর বুঝি, বিদ্যুতের ধারনক্ষমতা বাড়ানো তেমন কঠিন কোন কাজ না, বিশেষত আমাদের দেশ যেখানে যমুনা সেতুর মত বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ও খুব সহজ ভাষায় আমাকে একটি উত্তর দিল: "কোন সরকারই ৫ বছরে বিদ্যুৎউৎপাদনের কাজ শুরু করে ক্রেডিট পাবে না, ক্রেডিট পাবে পরের সরকার, সুতরাং এরকম অলাভজনক প্রকল্প শুরু করতে বাংলাদেশী সরকারগুলোর আগ্রহ কম।" এখানে কিছু জিনিসে খটকা লেগে যায়, কিন্তু মনের একটা অংশ আবার বলে কথাটায় সত্য আছে। আব্রাহাম লিংকনের একটা উক্তি মনে পড়ে যায়: :" It's surprising how much you can accomplish if you don't care who gets the credit."
আমি নিজে একটা পর্যায়ে গিয়ে সরকারের উপর নির্ভর করা অপছন্দ করি (বেশ লিবারটারিয়ান), সুতরাং সরকারকে আমি আদৌ সমালোচনা করি না। আমার দর্শন: কিছু চাইলে নিজে ব্যবস্থা কর, আজাইরা ঘ্যানঘ্যান করে লাভ নেই (সেদিক দিয়ে এ পোস্টকে আমি ঘ্যানঘ্যান পোস্টই বলবো)। আমার নিজের কি খুব ভোগান্তি হচ্ছে? না। আমি আমার বাসায় বেডরুমগুলোতে আই পি এস লাগিয়ে নিয়েছি। বিদ্যুত গেলে শুধু গরম বেশি লাগে (এসি ছাড়তে পারি না) আর টিভি দেখতে পারি না (গেমও এখন ল্যাপটপে নিয়ে গেছি, সব যদিও না)। সামনে হয়তো এগুলোও এড়ানোর ব্যবস্থা করবো। ফাঁকতালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কিছু প্রোডাক্টিভ কাজ-কর্ম করা হয়।
কিন্তু যেটা আমি বুঝতে পারি না তা হল পশ্চিম বঙ্গ যদি এই ঘোর গ্রীষ্মে ২৪ ঘন্টা রাজ্যের নাগরিকদের বিদ্যুৎদিতে পারে, তাহলে আমরা কি দোষ করলাম? পশ্চিম বঙ্গ কি আরেক বিশ্ব? এটা কি এমন কঠিন কোন কাজ? একটু প্রোঅ্যাক্টিভ হলে আমাদের দেশের শিল্প, কৃষির কতই না সুবিধা হয়, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর (আর দামী) এই ডিজেল জেনারেটরগুলোর ব্যবহারও কমে।
সামনে নাকি নিউক্লিয়ার শক্তি আনবে শুনলাম, ৩-৪ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ, সুতরাং ৫-৬ বছরই ধরি। এর মধ্যে কি আর কিছু করা যাবে না? সৌরশক্তি? আমি নিজে পরিকল্পনা করছি বাসায় সোলার প্যানেল লাগাবো, পরীক্ষামূলকভাবে হলেও।
কিন্তু এখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা তো লাগবে! সরকার আকাশের দিকে তাকিয়ে পথ হাঁটলে তো হবে না; বিদ্যুৎ তো খুবই গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার, প্রতিটা মানুষকে ব্যাক্তিগতভাবে প্রভাবিত করে। এটাকে সরকারের আরো অনেক গুরুত্বের সাথে নেয়া দরকার নয় কি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


