এক
রাজকুমারীরা ছুঁয়ে ছিল বলেই আমাদের ব্যাঙাচী জীবনের সমাপ্তি ঘটে যায়। আমরা রাজকুমার না হলেও সোনাব্যাঙ হয়ে উঠি; আর তাতেই খুশিতে আটখানা হই। অনেকদিন পরে, ছাত্রসখা বইয়ের মলাট খসে পড়লে আমাদের মনে পড়ে ত্রিভুজ বালিকাদের, যারা ফ্রক পড়ে ক্লাসে আসতো, আর নাক দিয়ে সিকনী গড়ালেও ছেলেদের মতোই লজ্জা পেত না।
সেকেলে বলেই ত্রিভুজ বালিকারা, বা বালিকাদের মায়েরা তাদের কন্যাদের নাকছাবি পরতে দিতনা। নাকে নাকফুল, আর কানে দুল ঝুলিয়ে তারা স্কুলে আসতো, নামতা পড়ত। তখনো জানিনি, আমরা ত্রিভুজ বালিকা নই; ত্রিভুজরাও যেমন জানতো না যে, তারা ব্যাঙাচী নয়। যেদিন মেয়েগুলো ছেলেদের সাথে ঝগড়া করলো, আর নিজেরা একা একা চালতার আঁচাড় খেল- সেদিনই আমাদের বয়স বাড়ল। সেদিনই আমরা কেউ কেউ নিজেদের পুরুষ-মানুষ ভাবতে শুরু করলাম।
পৌরষত্ব প্রমান করতে আমরা চিঁ-বুড়ী ছেড়ে ফুটবল খেলা শুরু করেছিলাম। দুপুর-রোদে নিজেদের পুড়িয়ে, বেপাড়ার ছেলেদের হাতে পিটুনি খেয়ে বাড়ী ফিরলে- মায়ের হাতে আমাদের নব্য পুরুষ-জীবন হেনস্থা হতো। সেসব ইতিহাস প্রতিবেশী ত্রিভুজকন্যাদের কাছ থেকে স্কুলে পৌঁছালে আত্মহত্যার সাধ জাগতো।
যখন জীবন বুঝিনা, প্রয়াণে বিচলিত হই- তেমন এক বিকেলে অংক-আপা উড়ে আসেন আমাদের খেলার মাঠে, মৃত্যু সংবাদ হয়ে। আমাদের ত্রিভুজ আর ব্যাঙাচী জীবন অর্থহীন উপবৃত্ত হয়ে খেলার মাঠে পড়ে থাকে। একটা খালি রিক্সা-ভ্যানের পেছনে আমরা ছুটি আসন্ন সন্ধ্যাকে সামনে রেখে। অনন্তের শবযাত্রী হয়ে আমরা অকিঞ্চিৎকর জীবনকে দেখি সহপাঠীর চোখে। সেদিন জেনেছিলাম, আমরা ছেলেমানুষ নই, মেয়েছেলেও নই। অনভিজ্ঞ দশ আঙ্গুলের করতলে মৃত্যুকে ছুঁয়ে বুঝেছিলাম- কত সহজেই না 'চলে যাওয়া শিখেছে মানুষ!'
দুই
ত্রিভুজ বালিকারা ঐকিক-নিয়ম শেখার আগেই আয়তকার হয়ে ওঠেছিল। সেসব আয়তক্ষেত্রের জন্য কাজলদানী, রেশমীচুড়ি আর লালফিতে বিক্রি করতো গন্ধবণিকেরা। আমরা সেসব মনোহারী দোকানের সামনে দিয়ে যেতাম ঘুড়ির সুতো কিনতে। যারা পায়রা ওড়ায়নি জীবনে, কিন্তু ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে আকৈশোর দৌড়েছে, তারা কোনদিন ভাবেনি- অমল বিকেলগুলোতে পঁয়ত্রিশটা বালিহাঁস কেন ঋ-কার চিহ্নের মতো দিগন্তে ভেসে যায়।
বছরখানেক আগেও আমাদের যাদের নামে কোন পয়সা বরাদ্দ হয়নি, চায়ের দোকানের বাকির খাতায় তাদের নাম তোলা হয়। কিছু বোঝার আগেই, আমরা বুঝে যাই- আমাদের ছ্যামড়া জীবন শুরু হয়েছে। রিক্সায় যেকোন জ্যামিতিক নারী দেখলেই মন কেমন করত! মন অমন কেন করে, তখনো জানা হয়নি আমাদের। সে সময়ে, কোন কোন সন্ধ্যাবেলা, মেহগনীর বীজগুলো হেলিকপ্টারের পাখা হয়ে আকাশ থেকে নেমে আসলে- জীবনটাকে অর্থহীন মনে হতো আমাদের। সেইসব অর্থহীন জীবন নিয়ে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়াতাম আমরা।
লসাগু, গসাগু শেখার পাশাপাশি আমাদের বাড়ন্ত দেহের রসায়ন পাঠ করে শরীর। আমাদের সেয়ানা হয়ে ওঠার মরিয়া চেষ্টায়- গোঁফ না-ওঠা মুখও লুকিয়ে রাখতে পারেনা বলাকা ব্লেডে অপটু চোরা-চাষ। আমাদের মধ্যে যারা দুঃসাহসী ছিল, তারা তখনই সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং বানাত। সাদা বৃত্তগুলো টাল সামলাতে সামলাতে বাতাসে মিলিয়ে গেলেও, গন্ধ শুকে পাড়াতুতো বড় ভাইয়েরা আমাদের কান মলতো। বাড়ী ফিরলে আরো কয়েক দফা 'কান টানলে মাথা আসে'র প্রামান্য অভিজ্ঞতা বরাদ্দ ছিল যথারীতি। তবে, সেই বিকট শাস্তির পরেও আমরা কেউ টমাস আলভা এডিসন হতে পারিনি। কারন, আমরা কানে খাটো হইনি, কানের লতিটা সামান্য ঝুলে পড়েছিল মাত্র।
আমাদের কারো কারো পকেটে তখন আমলোকীর বদলে ক্ষুর ঢুকেছে। কারো কারো সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সুড়কি। যারা হারিয়ে যাওয়া ব্যাঙাচী-লেজের শোকে কাতর ছিল, জীবন শুরু হওয়ার আগেই একজীবনের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তারা স্কুল পালাতো। সেইসব গেরিলা ছ্যামড়াদের রুলটানা খাতায় ভুল মাত্রায় সনেট লিখে যেতেন মধুসুদন দত্ত। মাঝে মাঝে কারো গাছের গাব কিংবা ডাব খোয়া গেলে স্কুলে নালিশ আসতো; আর মধুসুদন দত্তদের পিঠে জাদু দেখাতেন কোন শিক্ষক। বাবা-মায়েরা মাষ্টারদের কাছে 'শুধু হাড্ডি' ফেরত চেয়েছিলেন বলেই, আমাদের পিঠের চামড়া ফুলে থাকতো। এসময় ফোস্কা পিঠে, আর ক্ষুর পকেটে রেখে, আমরা কেউ কেউ শিক্ষক হত্যার দায়ে ফাঁসিতে ঝোলার স্বপ্ন দেখতাম।
সেইসব বিকেলে আয়তক্ষেত্র-কিশোরীরা চুলে লক্ষ্মীবিলাস তেল মাখতো; আর চেহারায় ওলো-সই ভাব আনতো এবং তাদের আম কি তেঁতুল গাছে লটকানো ঘুড়ি পাড়তে গেলে আমাদের চিনতো না। প্রতিশোধ নিতেই স্কুলের দেয়ালে কারা যেন অমুক যোগ তমুক লিখে রাখত, আর হেড-স্যার বেত ভাঙতো সোনাব্যাঙের পিঠে। সেই সব দেয়াল লিখন আমাদের কপাল-লিখন হয়নি বলা-ই বাহুল্য।
তিন
চিঠি দেবো বলে আমরা যারা স্কুল ছেড়ে ছিলাম, তারা কোনদিন চিঠি লিখিনি। আমরা তখনই বুঝে নিয়েছিলাম- আহ্নিক গতির পৃথিবীতে সবকিছু ধ্রুব নয়; এইসব রাত্রি-দিন কথার কথা মাত্র।
এমন দারুন কষ্টের দিনেই পালকি, কিংবা প্রজাপতির ছবি আঁকা কার্ডে বিয়ের দাওয়াত পেতাম কেউ কেউ। আয়াতকার বালিকারা বিয়ের পিঁড়িতে বসলে, আমরা চুপ করে কি যেন ভাবতাম। আর একটু পরে নিজের করা কোন অশ্লীল রসিকতায় নিজেই লাল হয়ে উঠলে বুঝতে পারতাম, বুকের বা-দিকে ঈর্ষার-কাঁটা জমতে শুরু করেছে।
আমরা খুশি হব বলেই হয়তো, বিয়ের পর আয়তকার তরুণীরা বর্গাকার নারী হয়ে উঠেছিল। চেহারায় দেমাগী-ভাব প্রকট হওয়ার আগেই তাদের কোলে শিশু ত্রিভুজ কিংবা ব্যাঙাচী ঝুলতো। আমরা- পাড়াতুতো মামারা, সেসব সুখী মানুষদের দেখে ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, এইসব ত্রিভুজেরা আমাদের 'কি-না হইতে পারিত!' কখনো পথে কি বাজারে দেখা হলে, বর্গাকার নারীরা খালাম্মা-খালুজানের খবর নিত। আমাদের শরীর খারাপ হতোনা বলেই বুঝি- সেসব সংবাদ-সমাচারে বড় অভিমান হতো।
শাড়ীর ভাঁজে ন্যাপথলিন, আর পাঁচফোড়নের মিশ্রজীবন আমাদের নাকে বিলিয়ে বর্গাকার নারীরা মা হয়ে উঠেছিল।
চার
কোন কোন ঝিমধরা দুপুর কেন যে পায়ের তলায় ক্ষয় করে দিতাম, এখনো বুঝিনা। পথ হাঁটার নেশায় বাটার স্যাণ্ডেলের এমন মরন কেন যে ডেকে আনতাম আমরা! আজো জানা হয়নি- কিসের কষ্ট নিয়ে তিনটি বাই-সাইকেলের অমল চাকা দেবদারুর ঋজু শরীরে বিশ্রাম নিত।
দুপুর পুড়িয়ে বাড়ী ফেরা জীবনে কে জানত, বালিহাঁসেরা কেন ঋ-কার চিহ্ন হয়ে আকাশে ভেসে বেড়ায়? জীবনানন্দ দাশ ছাড়া এ সংবাদ কে আর তালাশ করেছে জীবনে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

