আমার দেশ পত্রিকার বন্ধের ধারাবাহিকতায় ঘরে-বাইরে নানা বিতর্ক চলছে এখন। তবে মাহমুদুর রহমানের চাইতে পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের বিষয়টিই এমুহূর্তে সচেতন মহলকে বেশি করে নাড়া দিয়েছে। সামনে চলে এসেছে তাদের তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি।
যতোদূর জানা যায়, মাহমুদুর রহমান খুব সুশীল চরিত্রের লোক নন। একাধারে ধূর্ত, দুর্নীতিবাজ, উত্তরা ষড়যন্ত্রের নায়ক বলেই দেশবাসী চিনে। সম্প্রতি রাজনীতি ও সাংবাদিকতার নামে তিনি যা শুরু করেছিলেন তাকে এক কথায় দুর্বৃত্তপনা’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। তার বিরম্নদ্ধে প্রতারণা বা অন্য কোনো গুরম্নতর অভিযোগ থাকলে এবং মামলা মোকদ্দমা হয়ে থাকলে আগেই গ্রেফতার করা উচিত ছিল।
বর্তমান সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা প্রতিশোধ-পরায়ণ হলে ২১শে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর তার গায়ে রক্তের দাগ না শুকাতেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা এবং তৎকালীন সাপ্তাহিক যায় যায় দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান এই হামলার দোষ হাসিনার ঘাড়েই চাপিয়ে যেসব অসত্য কথা লিখেছিলেন, তাতে এখনো সেই সম্পাদকের পক্ষে বহাল তবিয়তে দেশের মাটিতে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব হতো না। কিংবা একজন সিটিং প্রাইম মিনিস্টারের হাত গুঁড়িয়ে দেব বলে কোনো নিম্নস্তরের ছোকরা সাংবাদিকের পক্ষে হুমকি দেওয়াও সহজ হতো না।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যখন দেশের চারটি জাতীয় দৈনিক ছাড়া আর সব কাগজ বন্ধ করে দেন, তখন প্রত্যেকটি কাগজের প্রত্যেকটি সাংবাদিক ও কর্মচারীর-এমনকি সর্বনিম্ন বেতনের একজন পিয়নের পর্যনত্ম বিকল্প সরকারি চাকরির ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। একজনকেও তিনি বেকার থাকতে দেননি। ‘আমার দেশ’ পুন:প্রকাশের ব্যবস্থা না হলে এই কাগজের নির্দোষ সাংবাদিক ও কর্মচারীদের জন্য একটি বিকল্প জীবিকার সংস্থান করাও যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্যের মধ্যেই থাকা উচিত।
আমার দেশ পত্রিকার প্রকৃত মালিক ছিলেন খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মোসাদ্দেক আলি ফালু এবং প্রকাশক ছিলেন তার ভাই হাসমত আলি হাসু। মোসাদ্দেক আলি ফালু যতো বিতর্কিত চরিত্রের লোকই হোন, তার পরিচালনায় এবং আতাউস সামাদের সম্পাদনায় পত্রিকাটি অনেকটা নিরপেক্ষ চরিত্র অর্জন করেছিলো একথা যে কেউ স্বীকার করবে। গোল বাধে মাহমুদুর রহমান নামক ধূর্ত লোকটির পত্রিকার মালিকানা ও সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণের পর। দলীয় পত্রিকারও সাংবাদিকতার একটি নীতিমালা মেনে কাজ করতে হয়। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের সম্পাদনায় আমার দেশে যা শুরু করে তা দলীয় সাংবাদিকতাও নয়। তা ছিলো নির্লজ্জ অসত্যের বেসাতি এবং পত্রিকাটি হয়ে দাঁড়ায় মিথ্যাচার-রাজনীতির মুখপত্র। আতাউস সামাদ ও তার পরবর্তী সম্পাদককেও ছলেবলে কৌশলে সরিয়ে মাহমুদুর রহমান নিজেই এক সময় পত্রিকাটির সম্পাদক বনে যান।
সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ মনগড়া, অত্যন্ত মানহানিকর এবং একটি উদ্দেশ্যমূলক খবর যখন ‘আমার দেশে’ প্রকাশ করা হয়, তখনই থেকেই মনে করা হচ্ছিল এব্যাপারে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। তবে পত্রিকাটি বন্ধ না করে; এর সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকরের বিরম্নদ্ধে সিভিল এবং ক্রিমিনাল দুই প্রকারের মামলা করেই তা করা যেতো। আমার দেশকে বিএনপি-রাজনীতির একটি সুস্থ ও সুন্দর মুখপত্র হিসেবে দাঁড় করানোর ইচ্ছাও তার ছিলো না। সাংবাদিকতা করা মধ্যেও যে সততা থাকা দরকার তা তার ছিলো বলে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাও মনে করেন না। অসাধু রাজনৈতিক স্বার্থ এবং নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তিনি মোসাদ্দেক আলি ফালুর পত্রিকাটির মালিকানা গ্রহণ করেছিলেন এবং পত্রিকাটিকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছিলেন। তার এই দুর্বৃত্তপনা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেই বন্ধ করা যেতো।
চার দলীয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতনের পর ২০০৮ সালের ২১ আগস্ট পত্রিকাটির মালিকানা হস্তান্তর হয় এবং ২০০৯ সালের ২৮ জুন জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে পত্রিকাটির মালিকানার পরিবর্তন রেজিস্ট্রি হয়। মাহমুদুর রহমান পত্রিকাটির মালিক হন। একই সালের ১১ অক্টোবর তারিখে হাশমত আলি হাসু ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে সি ফরম পূরণ করে পত্রিকাটির প্রকাশক হিসেবে নিজের নাম প্রত্যাহার করেন এবং মাহমুদুর রহমান দাবি করেছেন তিনি ওই ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়েই বি ফরম পূরণ করে হাশমত আলির স'লে পত্রিকাটির প্রকাশক হওয়ার আবেদন জানান। এই আবেদনটি এখনো বিবেচনাধীন এবং প্রকাশক হিসেবে তিনি এখনো সরকারি অনুমোদন পাননি। এই অবস্থায় হাশমত আলি হাসুর নামই পত্রিকাটির প্রকাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।এটি অবশ্যই একটি অবৈধ কাজ।
গ্রেফতার হওয়ার আগে মাহমুদুর রহমান নাকি প্রেস কনফারেন্স ডেকে অভিযোগ করেছেন, সরকারি গোয়েন্দা দফতরে হাশমত আলিকে ডেকে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তাকে দিয়ে মাহমুদুর রহমানের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করানো হয়েছে! এই অভিযোগের সত্যতা কতোটুকু? কেউ এই অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারেন, কেউ নাও পারেন।
বিএনপির শাসনামলে মোসাদ্দেক আলি নানারকম দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অনেক অভিযোগ আছে। তারই ভাই হাশমত আলি হাসু। এখন মাহমুদুর রহমান ফালু ও হাসুর কাগজটি হাতে পেয়ে যেভাবে অসাধু ও অশুভ সাংবাদিকতায় পত্রিকাটিকে জড়িয়েছেন, তাতে পত্রিকার প্রকাশক হিসেবে হাসু সরকারি রোষে পড়তে পারেন এবং একই সঙ্গে তার ভাইও তাতে জড়িত হতে পারেন, এই আশঙ্কায় তারা নিজেরাই পত্রিকাটির সঙ্গে সংশ্রব ত্যাগ করতে চেয়েছেন এবং মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করে তার কবল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন বলেই সকলে মনে করছেন।
তবে এখানে একটি প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক যে, গত বছর ১১ অক্টোবর হাশমত আলি হাসু অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে সি ফরম পূরণ করে পত্রিকাটির প্রকাশক হিসেবে নিজের নাম প্রত্যাহার করেছেন এবং মাহমুদুর রহমান দাবি করেছেন, এই দাবি সত্য হলে, পত্রিকাটির ডিক্লারেশন তার নামে পরিবর্তনের আবেদন পুরো সাত মাস ঝুলিয়ে রাখার কারণটা কি? যদি মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা-মোকদ্দমার কারণে তাকে প্রকাশক হওয়ার অনুমোদন দেওয়া না যায়, তাহলেও তাকে তা আরও আগেই জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল। যাতে করে পত্রিকাটির ডিক্লারেশন পরিবর্তনের জন্য বিকল্প নাম দেওয়ার সুযোগ দিয়ে পত্রিকাটিকে সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্তা করা যেতো। মালিকের অপরাধে পত্রিকা ও পত্রিকার কর্মী ও সাংবাদিকেরা যাতে শাস্তি না পায় সেদিকে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অবশ্যই সুদৃষ্টি থাকা দরকার।
আমার দেশ পত্রিকার হয় উপযুক্ত মালিকানা সৃষ্টি করে পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্থা করা হোক নয়তো অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের বিকল্প কর্মর্সস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। আর তা যদি করা যায় তবেই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের উদার ও অনুকুল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে হতে পারে একটি যথাযথ পদক্ষেপ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



