মুক্তিযুদ্ধের সময় ঈশ্বরদীর চারিদিকে যুদ্ধের দামামা চলছে, শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে বক্তারপুর গ্রামে এক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাকে দাফন করার মত কেউ নেই, এলাকা জনশূন্য। বাড়ির নারী ও শিশুদের আর্ত চিৎকারে সেসময় সাহস করে ওই মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ হাতে দাফনের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন ৭ নং সেক্টরের তরুন মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মোল্লা। যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ঈশ্বরদী কলেজের ছাত্র।
ওই দিন তহুরুল আলম সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ হাতে গোসল ও কাফনের কাপড় পরিয়ে কবরস্থ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে সেই তহুরুল আলম বাড়ি ফিরে হন্যে হয়ে অনেক খুঁজেও তার বাবার মরদেহ খুঁজে পাননি। পরে জানতে পারেন ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ঈশ্বরদীর কতিপয় রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে তার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন সহ ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ডেকে নিয়ে হত্যার পর সব লাশ গুম করে।
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলা কমান্ড মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান সহকারী কমান্ডার (অর্থ) আলহাজ্ব তহুরুল আলম মোল্লার সঙ্গে আলাপ কালে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই লাশ দাফনের অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধের পর নিজের পিতার লাশ খুঁজে না পাওয়ার বেদনা থেকে মানুষের মরদেহ দাফনের এক ব্রত গ্রহণ করেন তিনি। এ পর্যন্ত ৩ শতাধিক মানুষের মরদেহ নিজ হাতে গোসল ও কাফনের কাপড় পরিয়ে কবরস্থ করবার অনন্য এক রেকর্ড গড়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তহুরুল আলম মোল্লা জানান, যুদ্ধের পর বাবার লাশ খুঁজে না পেয়ে মনের অজান্তেই কখন যে এই ব্রত নিয়েছি তা বুঝতে পারি নি।
তখন থেকেই ঈশ্বরদী কিংবা আশে পাশে কেউ মারা গেছে শুনলে নিজ উদ্যোগে সেখানে হাজির হন তিনি, আবার এখন অনেকেই তাদের প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তহুরুল আলমকে দিয়ে গোসল ও দাফনের কাজ সম্পন্ন করানোর জন্য অনুরোধ করেন। বর্তমানে অবস্থা এমন হয়েছে যে ঈশ্বরদীতে কেউ মারা গেলে প্রথমেই ডাক পড়ে তহুরুল আলমের, আবার অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন যারা জীবিত অবস্থাতেই তহুরুল আলমকে আগেভাগেই বলে রেখেছেন যে, তাদের মৃত্যুর পর মরদেহ যেন সে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দাফন করে দেন। তহুরুল আলম মোল্লা জানান, মানুষের লাশ দাফন করার এই কাজ করাটা এখন তার এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে। ব্যাক্তিগত জীবনে ঈশ্বরদীর এই মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জরিনা খাতুন ও দুই ছেলে নিয়ে সুখের সংসার তার। বড় ছেলে রাফিফ উল আলম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার এবং একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আর ছোট ছেলে শাফিফ উল আলম বিবিএ করছেন ঢাকায়। তহুরুল আলম মোল্লা’র ব্যাক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এস এম কনফেকশনারীর দেখাশোনা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কাজ-কর্ম করে সময় কাটান তিনি।
ব্যাতিক্রমী নেশা মানুষের মৃতদেহ দাফন করার অভিজ্ঞতা বর্ননা করে তহুরুল আলম মোল্লা জানান, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে অদ্যাবধি বিগত ৪০ বছর ধরে শত শত মানুষের মরদেহ গোসল করানো, দাফন কার্য সম্পাদন করেছেন। এসব কাজ বাবদ কেউ কোনদিন সেধেও পারিশ্রমিক দিতে পারেন নি বরং কোন দরিদ্র পরিবারে কাফনের কাপড় কেনার সামর্থ্য না থাকলে তিনি ব্যাক্তিগতভাবে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মানুষের সেবা করতে গিয়ে নিজস্ব আয়ের অর্থ দিয়ে একটি ছোট তহবিল করেছেন যেখান থেকে হতদরিদ্র মানুষকে কাফনের কাপড় কিনে দেওয়া, কবর দেওয়ার সামর্থহীনদের সাহায্য করাসহ অসহায় মানুষের কেউ মারা গেলে তার লাশ দাফন করার ব্যবস্থা করে থাকেন স্ব-উদ্যোগেই। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ব্যাতিক্রমী এই কাজ অনেকটা নীরবে করে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মনে করেন, দেশে যেমন শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য স্মৃতিসৌঘধ রয়েছে তেমনি এসব স্মৃতিসৌধের পাশেই রাজাকারদের উদ্দেশ্যে একটি করে ঘৃনাস্তম্ভ তৈরি করা উচিৎ, যাতে মানুষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাথে সাথে ঘৃনাস্তম্ভে ঘৃনা প্রকাশের সুযোগ পান। তার এই পরিকল্পনা মাথায় এসেছে ২০০০ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করতে গিয়ে শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করার সময়।
দিন-রাতের যেকোনো সময কেউ মারা গেছে শুনলে শত ব্যস্ততা ফেলেও তিনি সাথে সাথে ছুটে যান মৃত দেহটির কাছে। অভিজ্ঞতার স্মৃতি হাতড়ে তহুরুল আলম মোল্লা বলেন, একবার ঢাকা থেকে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে দেখেন তার ঘরের দরজায় ৩/৪ জন লোক তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন, তাদের এক আত্মীয়ের মরদেহ দাফন করার জন্য তাকে খবর দিতে। তিনি দীর্ঘ সময় বাস জার্নি করে কান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে ঘরে পর্যন্ত বসেন নি, কোন রকমে ব্যাগটা রেখেই ছুটে যান সেই মৃতদেহের কাছে, গভীর রাত পর্যন্ত সেই লাশের দাফন কার্য শেষ করে ভোরে বাড়ি ফেরেন। এরকম অসংখ্য ঘটনার মধ্যে চাটমোহরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই লাশের দাফন করার উল্লেখযোগ্য ঘটনা বর্ননা করতে গিয়ে তিনি জানান, দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন ও থেঁতলে যাওয়া লাশ দুটি যখন কেউ দাফন করতে পারছিলেন না তখন খবর দেওয়া হয় তাকে। তিনি সেই লাশ দুটির গলিত মগজ ও শরীরের বিভিন্ন ক্ষত বিক্ষত অংশ পলিথিনে সাজিয়ে বিশেষ কায়দায় কাফনের কাপড় পরিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করে বেশ প্রশংসিত হন।
ঈশ্বরদীর এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবনের বাকি সময় এভাবেই মৃত মানুষের মরদেহ দাফন করার কাজ করেই কাটাতে চান। আর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতি স্তম্ভের পাশে রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা জানাতে একটি করে ঘৃনাস্তম্ভ নির্মানের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে চান।
রাজাকারদের প্রতি এদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে যাতে ঘৃনা প্রকাশ করে যেতে পারে সে জন্যে মুক্তিযোদ্ধা তহুরুলের চেতনা ও দিব্যজ্ঞানকে সমীহ করে আমরাও তার অন্তিম ইচ্ছের বাস্তবায়ণ চাই।
- মূল খবর
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০১০ ভোর ৪:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



