'দৈনিক কালের কণ্ঠ' "মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পরের প্রজন্মও চাকরিতে কোটা পাবে" ও অন্যান্য কয়েকটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধা সংবর্দ্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা কটাক্ষ করে বিভিন্ন ব্লগে কিছু ইডিয়ট নানান ধরনের বিদ্বেষী মন্তব্য সম্বলিত পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে। একশ্রেনীর মন্তব্যকারী এগুলোকে আবার সমর্থন করে উস্কানীও দিচ্ছেন।
আমার যতটুকু মনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রথম রাজনেতিক ভেল্কিবাজি করেন জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে ১৯৭৮-৭৯তে। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রচেষ্টায় বেকার ও অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে বা বিদেশে চাকুরি দেয়া হবে এমন একটি প্রজেক্ট খাড়া করা হয়। প্রাথমিকভাবে এক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে মিরপুর টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারসহ আরও কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিভিন্ন ট্রেড-এ এক বছর মেয়াদী বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকুরির ব্যবস্থা না করলে তারা রাস্তায় নামে, তৎকালীন জনশক্তি মন্ত্রী এস.এ.বারি এ.টি.র মিন্টো রোডের বাড়ির জানালা-দরজা ও আসবাবপত্র ভাংচুর করে, প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট ও জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে। পরে '৮০ সালের শুরুর দিকে এদের কিছুসংখ্যককে সৌদি আরব ও কুয়েতে নির্মান শ্রমিক ও স্ট্রিট ক্লিনারের চাকরি দিয়ে পাঠানো হয় এবং বাকিরা বাড়ি ফিরে যায়। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ারও মৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য যে, এসব প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল বিএনপি'র 'জাগদল' ভার্সনের কর্মী ও সমর্থক। তারা আদতে মুক্তিযোদ্ধাই ছিল না।
এরশাদের ক্ষমতাদখলের পর তিনিই হন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা অথচ তিনি ছিলেন পাকিস্তান ফেরত আর্মিদের একজন। সেসময় জাতীয় পার্টি গঠনপ্রক্রিয়ার আড়ালে প্রায় সকল সরকারী কর্মকর্তাকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেন এই এরশাদ। তখনকার বিসিএস অফিসাররাই মূলতঃ বেশি মাত্রায় এই অফার গ্রহণ করে। যাই হোক, জিয়া বা এরশাদের বিরুদ্ধে কথা বলার মত পরিস্থিতি সে সময় কারো ছিল না। রাজাকাররাও সুযোগ বুঝে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে রগ কাটতে শুরু করে।
৯০-এ এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনের প্রাক্কালে আঃলীগ-বিএনপি-জামাত ইত্যাদি সবগুলো প্রধান প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল যখন যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষনা দিয়ে রাজপথে নামলো তখন হাসিনা-খালেদা-নিজামীরা এক মঞ্চে বক্তৃতা দিতেন।
এরপর ৯১-তে বিএনপি ক্ষমতায় আসে, ভাতার ব্যবস্থা তারা করেনি।
৯৬-এর নির্বাচনে আঃলীগের সাথে জামাতও বিরোধীদলের ভুমিকায় থাকে ক্ষমতায়। একবার এক মঞ্চে কুটবুদ্ধিসম্পন্ন নিজামীর মুখেই স্টান্টবাজি আকারে প্রথম বের হয়েছিল, ভবিষ্যতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আগে থেকেই এই দাবি করে আসছিল। যাহোক, দর কষাকষিতে না পোষালে শেষপর্যন্ত জামাত আঃলীগ ছেড়ে বিএনপির দিকে ঝোঁকে। আঃলীগ ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের লজ্জা ঢাকতে জামাতের সেই ঘোষণা কার্যকর করে অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে প্রথম সীমিত পরিমাণে ভাতা চালু করে।
২০০১-এ বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় এসে সেই ভাতার পরিমাণ ও সংখ্যা খানিকটা বাড়ায়। সেটাও হয়তো জামায়াতের ইচ্ছেতে, কারণ তখন সমাজকল্যাণমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল জামাত।
পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ও বর্তমান সরকারের আমলে আরো দু'বার সেই ভাতার পরিমাণ ৯০০ টাকায় উঠেছে। বলাই বাহুল্য যে, এসব কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য অনগ্রসর মুক্তিযোদ্ধাদের দারিদ্রকে সহায়তা নয় বরং পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, ১৯৭১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বলতে গেলে একই ছিল (তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পত্রিকা 'মুক্তিবার্তা' দ্রষ্টব্য)। ২০০১-২০০৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা হঠাৎ করেই অতিরিক্ত ২ লাখ বেড়ে গেল এবং এই দু'লাখের প্রায় সবাই জামাত ও বিএনপি'র সমর্থক।
বর্তমান সরকারের আমলে আরো ২ লাখ বেড়েছে বিগত সরকারের দেখাদেখি। এই দু'লাখে আঃলীগের সাথে জামাতও আছে।
এখন গোটা প্রক্রিয়া সম্প্রসারিত হয়েছে এবং দেশে প্রায় ৬ লাখ লোক মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ভাতা নিচ্ছে, সেই সাথে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। তবে বলাই বাহুল্য যে, এসব ভাতাভোগীদের মধ্যে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করানো বা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার মত অর্থনৈতিক সামর্থ্য বলতে গেলে কারোরই নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এতে মুক্তিযোদ্ধারা কিছু তো পাচ্ছে, অন্য কে কি পেলো তা ওইসব গরীব মুক্তিযোদ্ধাদের না জানলেও চলবে। যেমন, ৭১ সালে ২২ পরিবার থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই স্বাধীনতার সুফল হিসেবে বর্তমানে দেশে দেড়লাখ পরিবারের জন্ম হয়েছে, এরা সবই লুটেরা, নব্য কোটিপতি। এদের কুকৃর্তির কথা কেউ বলে না। এই দেশের একজন প্রধানমন্ত্রীও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নেয়।
এসবে মুক্তিযোদ্ধাদের কি-ই বা আসে যায়?
শেখ হাসিনার ঘোষণা এসেছে অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের টেনে তোলার, কিছু করবার। কিন্তু সেই ঘোষণা কতটুকু কার্যকর হয় সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এ দেশে কেউ কিছু ঘোষণা করলেই যে সবকিছু হয়ে যাবে সে প্রধানমন্ত্রী হোক বা রাষ্ট্রপতি - এমন উদাহরণ ক'টিই বা আছে!
শেষকথা:
মুক্তিযোদ্ধারা কেউ নিজের কথা ভাবে না, এখনো তারা দেশের কথা ও সমগ্র জাতির সুখের কথাই ভাবে যে দেশ তারা সৃষ্টি করেছে। তারা সত্যিকার সোনার বাংলা দেখে যেতে চায় - যে জন্য তারা যুদ্ধ করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা যদি জীবনে কিছু না পায় তবুও তারা হতাশ হবে না, মনে করবে স্বাধীনতা যখন আছে তখন আজ হোক কাল হোক - একদিন এ দেশ মাথা তুলে দাঁড়াবে। তবুও তারা এরিস আফ্রোদিতি, আদিল মাহমুদ (মাটি বাবা), কে?, কানাবাবা, উড়নচণ্ডী, সায়মন, মৌচাকে ঢিল, ভদ্রছেলে, ড.হাতাশি, সুপ্ত, সিয়েরা-১০-৩১, বহিরাগত কিংবা গোলাম আজম, নিজামী, কামরুজ্জামান, দেলোয়ার হতে পারবে না; বরং এদেরকে আমৃত্যু ঘৃনা করে যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



