বাংলাদেশের সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকই এখনো পাকিস্তানিই রয়ে গেছে এবং তারা পাকিস্তানি ভাবাদর্শে বিশ্বাস করে। এই অবিশ্বাসী অংশটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতির পিতা - এসব ইস্যুতে মোটেই আস্থাশীল নয় এবং জনগণের মূলস্রোতের প্রতি বরাবরই অসহিষ্ণু আচরণ প্রকাশ করতে দ্বিধা করে না।
অন্যদিকে পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তারা আগের মতই প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালবাসার ভাব পোষণ করে। তারা মনে করে - বাংলাদেশপন্থীরা দুস্কুতিকারি, পাকিস্তানের জাতশত্রু, ভারতের চর কিংবা তোষণকারি বা দালাল।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে এদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। তন্মধ্যে এককোটি লোক পাকবাহিনীর আক্রমনের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল বটে, তবে বাদবাকি সাড়ে ছ’কোটি লোক বাংলাদেশেই ছিল। এদের মধ্যে আরো এককোটি যারা পাকসেনা ও রাজাকারদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র, এবাড়ি-সেবাড়ি, আজ এ গ্রাম কাল ও গ্রাম, কিংবা বনে-জঙ্গলে নিরুদ্দিষ্টভাবে আত্মগোপন করে দিনাতিপাত করেছিল এবং আরো এককোটি লোক সাময়িকের জন্যে অন্যত্র আশ্রয় গ্রহন করলেও পরে নিজ-নিজ বাড়িতেই ফিরে এসেছিল এবং স্বাভাবিক কাজকর্মে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছিল। বাদবাকি অর্ধেকেরও বেশি লোক পাকিস্তান সরকারের “স্বাভাবিক অবস্থা” ঘোষণার সুযোগে আগের মতই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছিল।অফিস-আদালতে যেখানে-যেখানে লোকজন পালিয়ে যাওয়ার ফলে শুন্য হয়ে পড়েছিল সেখানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে লোক এনে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। যুদ্ধের মাঝামাঝি অবস্থা থেকে শেষ পর্যন্ত হাট-বাজার, যানবাহন, রেল-বিমান, লঞ্চ-স্টিমার চলাচল ছিল প্রায় স্বাভাবিক। যে সব বুদ্ধিজীবীকে ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হয় তারা সবাই ছিলেন পাকিস্তান সরকারেরই অনুগত লোকজন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে কর্মরত। দেশে স্বাধীন হওয়ার পর ‘সাধারণ ক্ষমা’র আওতায় এসব সরকারী কর্মচারিরা স্ব স্ব কর্মস্থলে যোগদান করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের মধ্যে সরকারের অফিস-আদালত চালানোর মত যোগ্য জনবল তখনো তৈরি হয়নি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়া ও এরশাদের আমলে এসব পাকিস্তানি ভাবাদর্শের লোকজন আবার নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করে এবং একধরনের স্বস্তি ফিরে পায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙ্গালি সেনাদের (৩০,০০০) ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরত আনা হলে তারা এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টিতে অগ্রগামী ভুমিকা পালন করে। এখানে উল্লেখ্য, যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীতে নিয়মিত যোদ্ধা ছিলেন ১৫,০০০ জন যারা স্বাধীনতার পর বাহিনীতে থেকে যান এবং ১৯৭২ সালে গেরিলা বাহিনী থেকে ২০,০০০ সেনা সংগ্রহ করে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়। পাকিস্তান ফেরত সেনাদলটি দেশে রক্ষীবাহিনীর উপস্থিতি মনেপ্রাণে গ্রহন করেনি। বরং পাকিস্তান প্রত্যাগত এই বাহিনীর উস্কানি ও মতলববাজিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক পরবর্তীতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে যায়। বর্তমানে রাজাকার, আলবদর, আল শামস্, ৭১-এর শান্তিকমিটি ও গ্রেফতারকৃত ৩০,০০০ যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় এককোটির কাছাকাছি। এদের কাছে ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতি আর ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানীর কোনো মূল্য নেই।
আর এভাবেই তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি জনতা তথা বর্তমানের সাড়ে ষোলকোটি মানুষ তাদের জাতিগত ঐক্য হারিয়ে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে। এই জাতিকে পুনরেকত্রিতকরণ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করাই হবে আজকের দিনের সবচেয়ে বড় কাজ। আর তা না করতে পারলে বাংলাদেশ কোনোদিন বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। বলাই বাহুল্য যে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র অযোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা এই কাজ কখনো সম্ভবপর হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



