ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের লাভক্ষতির হিসাব কষছে বিএনপি
লোটন একরাম/হাসান শিপলু [ সমকাল ৩১ জুলাই ২০১০ ]
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। প্রকাশ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের বিরোধিতা করলেও ভেতরে ভেতরে 'অন্যরকম' হিসাব-নিকাশ করছেন তারা। দলের নেতারা মনে করেন, জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো নিষিদ্ধ হলে বিএনপির ক্ষতি নয়, লাভই হবে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বিএনপির ব্যানারে শামিল হতে পারেন ইসলামী দলগুলোর ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধ ও জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীরা বিএনপিতে যোগ দিলে দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয় কি-না_ তা নিয়েও চিন্তা করছেন দলের নেতারা। এ পরিস্থিতিতে আপাতত কৌশলী অবস্থান নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার কথা বলছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি ফিরে আসার পর ইসলামপন্থি দলগুলো নড়েচড়ে বসেছে। অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের মধ্যে শুরু করেছে আলোচনা। এ দলগুলোর একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কৌশল নির্ধারণে এক হওয়ার চেষ্টা করছে। পুরো রায়ের বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দলগুলো অভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরতে চায়। প্রয়োজনে নিজেদের 'অধিকার রক্ষায়' তারা আন্দোলন করতে চায়। বিএনপি এ বিষয়ে আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় না থাকলেও ইসলামিক দলগুলোকে সমর্থন দেবে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে
বিএনপির সমর্থন চাইতে জোটের শরিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ চলতি সপ্তাহে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রোববার রায় পর্যালোচনায় বৈঠকে বসবেন দলীয় বিশেষজ্ঞরা : সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় পর্যালোচনা করতে কাল রোববার বৈঠকে বসবেন বিএনপির সংবিধান বিশেষজ্ঞ নেতারা। বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা করা হবে। সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি কী সুপারিশ করে সে বিষয়টিও তারা দেখতে চান। এরপর বিএনপি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের ব্যাপারে বর্তমানে কিছু বলবেন না তারা। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের পর সংসদ কোন সংশোধনী গ্রহণ বা বাতিল করে তা দেখার অপেক্ষা করছেন তারা। কারণ আদালতের রায়ে সংবিধান সংশোধন করলেও তা সংসদেই পাস করতে হবে। উচ্চ আদালতের পুরো রায় বাস্তবায়ন নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।
রায়ের অসঙ্গতিগুলোর বিরোধিতা করবে : সূত্র জানায়, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ের অসঙ্গতিগুলোর বিরোধিতা করবে বিএনপি। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহর ব্যাপারে দলটি তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করবে। তবে পুরো রায়ের ব্যাপারে আপত্তি জানানোর পক্ষে নন দলের শীর্ষ নেতারা। এ মুহূর্তে রায়ে কী কী অসঙ্গতি রয়েছে তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছেন তারা। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করবেন তারা।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া সমকালকে বলেন, 'পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও সুপ্রিম কোর্ট ওই সংশোধনীর ভালো দিকগুলো রেখেছেন। আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন, 'বিসমিল্লাহ'র ব্যাপারেও স্পষ্ট কিছু বলা নেই। এসব বিষয় নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।' তিনি আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ই হচ্ছে আইন। সে ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটি কী করবে তা-ই দেখার বিষয়। তবে বিএনপি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জনগণের জন্য সংবিধান। সে সংবিধান নিয়ে জনগণ যদি প্রশ্ন তোলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে।
অবশ্য রফিকুল ইসলাম মিয়ার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি সমকালকে বলেন, বিচারকদের দায়িত্ব সংবিধান সংরক্ষণ করা। সংবিধান সংশোধনের দায়িত্ব সংসদের। সাকা চৌধুরী বলেন, রায় পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়ার বিষয় নয় এটি। বিচারকরা যে রায় দিয়েছেন তা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সংসদের দায়িত্বের ওপর বিচারকরা অনৈতিক হস্তক্ষেপ করে সংসদের অধিকার খর্ব করেছেন।
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর দলের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা রায়ের কপি নিয়ে তা বিশ্লেষণ করছেন। বুধবার দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মামলার বাদী বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, মামলার আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদসহ কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞকে রায়ের কপি পড়ে কী কী অসঙ্গতি রয়েছে তা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে খালেদা জিয়া সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের সঙ্গে আলোচনা করেন। সূত্র জানায়, সংবিধান বিশেষজ্ঞ নেতাদের কাছ থেকে অসামঞ্জস্যগুলো পাওয়ার পর আগামী দু'তিন দিনের মধ্যে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়া বৈঠক করবেন। তারপর প্রয়োজনে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকও ডাকা হতে পারে।
লাভ-লোকসানের হিসাব মেলাচ্ছেন নেতারা : ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বন্ধ নিয়ে লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশ করছেন বিএনপির নেতারা। জামায়াতবিরোধী বিএনপি নেতারা বলছেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে আওয়ামী লীগের লোকসান এবং বিএনপি লাভবান হবে। কাজেই এ বিষয়ে হিসাব-নিকাশ করে বিএনপির অবস্থান নেওয়া উচিত। আবার জামায়াতের পক্ষের নেতারা বলছেন, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর রাজনীতি বন্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার এখনও সময় হয়নি। উচ্চ আদালতের রায় সংসদ পাস করলে তারপর তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন আসবে।
আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ে নামবে ক্ষুব্ধ ইসলামী দলগুলো : ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনে নামার চিন্তা-ভাবনা করছে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো। আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক না হলেও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐকমত্যে পেঁৗছাতে যাচ্ছে তারা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু রাখতে সংবিধানের মূলনীতি অপরিবর্তিত ও সংবিধানে 'বিসমিল্লাহ' বহাল রাখতে প্রচারণা চালানো এবং আদালতের রায় বিশ্লেষণ করে আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ে কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হবে না। এক্ষেত্রে আরও কিছু আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কাজেই তারাও বিষয়টি আইনি এবং রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামী সমকালকে বলেন, 'রায়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তা হবে না। এখন আমরা দেখতে চাই সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার আমাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই।'
তিনি বলেন, তারা অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করছেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ইসলামী আন্দোলন গতকাল বিকেলে মুক্তাঙ্গনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের লাভক্ষতির হিসাব কষছে বিএনপি
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।