বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।
পাষন্ডরা মোটরসাইকেল তুলে দিয়েছিল তার উপর ।
কী মর্মান্তিক খবর। রাষ্ট্র কী এভাবে পরাজিত হবে হায়েনাদের
হাতে ??
কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ইভটিজিং। ঢাকাসহ সারাদেশে আগের চেয়ে বেড়ে গেছে বখাটেদের উৎপাত। সামাজিক আন্দোলন চালিয়েও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুল-কলেজে গোয়েন্দা নজরদারির কথা থাকলেও তা বাস্তবে নেই বললেই চলে। বখাটেদের গ্রেফতার করার পর রাজনৈতিক নেতারা হস্তক্ষেপ করায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার করার কিছুই থাকছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ছয় মাসে সারাদেশে ৪১৭ বখাটেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আইনি কাঠামো দুর্বল হওয়ায় বখাটেরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। এই ছয় মাসে ২১ তরুণী আÍহত্যার পথ বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, নাটোরে ইভটিজিং প্রতিরোধ করতে গিয়ে স্বনামধন্য কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমানকে পিটিয়ে আহত করে বখাটেরা। ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে মারা যান। রোববার সকালে ঢাকার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বখাটেরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের নানা ভঙ্গিমায় আজেবাজে কথা বলছে। এসব স্থানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও কাউকে দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে নেমে আসে নির্যাতন। তাছাড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইভটিজিং প্রতিরোধে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় সংশোধনীর কাজ চলছে। এ আইন সংশোধন করলে অভিযুক্ত বখাটেরা কমপক্ষে সাত বছরের সাজা ভোগ করবে। প্রতিদিন রাত ৯টার পর বখাটে ধরতে পাড়া-মহল্লায় বিশেষ অভিযান চালানোর চিন্তাভাবনাও করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
মহাপুলিশ পরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার জানিয়েছেন, ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি। সামাজিকভাবেই বখাটেদের রুখতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। স্কুল-কলেজের সামনে গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। ডিবির উপপুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, বখাটেদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকাসহ সারাদেশে নারী উত্ত্যক্তকারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছে সরকার। কিন্তু দিন দিন বেপরোয়াভাবে ইভটিজিংয়ের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। অভিভাবকরাও এ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন। অনেক সময় মা-বাবার সামনেই সন্তানদের বখাটেরা হুমকি দিচ্ছে। থানায় অভিযোগ করলে নেমে আসে নানা নির্যাতন। নাটোরে বখাটেদের হাতে স্কুলশিক্ষক মারা যাওয়ার পর এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঢাকার খিলগাঁওয়ে আÍহননকারী সিমির পরিবারকে বখাটেরা হুমকি দেয়া অব্যাহত রেখেছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। দুর্বৃত্তরা জামিনে বের হয়ে সিমির পরিবারের ওপর একাধিকবার হামলা করেছে। আরেক স্কুলছাত্রী ইলোরার পরিবারও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ- বখাটের উৎপাত ও অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাস্তায় বের হলেই ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। অনেককে হুমকি দেয়া হচ্ছে মামলা প্রত্যাহার করতে।
মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ইভটিজিং বেড়ে যাচ্ছে। এর জন্য সামাজিক আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া যে আইন রয়েছে তা দিয়ে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। আইনের ধারা দ্রুত সংশোধন করতে হবে।
রোববার ঢাকার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বখাটেদের উৎপাত আগের মতোই রয়েছে। সকাল ১০টায় খিলগাঁও মডেল স্কুলের সামনে সাত-আট বখাটে স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওই সময় ৩ ছাত্রী রাস্তায় এলে বখাটেরা অশ্লীল ভাষায় কথাবার্তা বলতে থাকে। এক ছাত্রী প্রতিবাদ করলে অপহরণ করার হুমকি দেয়। এক শিক্ষক ঘটনাস্থলে এলে বখাটেরা চলে যায়। ওই স্কুলের দশম শ্রেণীর এক ছাত্রী জানায়, স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় এলাকার বখাটেরা পথরোধ করে আজেবাজে কথা বলে। তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করা যায় না। তারা এমন কুরুচিপূর্ণ কথা বলে যা মা-বাবাকে পর্যন্ত বলা সম্ভব হয় না। বখাটেদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতার সন্তান হওয়ায় পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না। শান্তিনগরের টুইন টাওয়ার ও ইস্টার্ন প্লাস বিপণিবিতানের সামনেও দেখা গেছে বখাটে যুবকদের ভিড়। মার্কেটে আসা তরুণীদের আজেবাজে কথা বলছে বখাটেরা। ওই সময় পুলিশ বা র্যাবের কোন গাড়ির টহল ছিল না।
উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল নুরনবী জানিয়েছেন, সামাজিকভাবে বখাটেদের রুখতে হবে। তাদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাছাড়া কঠোর আইন প্রয়োগ করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তরায় নবাব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক ছাত্রী জানায়, গত সপ্তাহে জনি নামে এক সন্ত্রাসী তাকে প্রেম নিবেদন করে। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় আমাকে অপহরণ করার হুমকি দেয়। প্রায় সময় সে কলেজের সামনে দলবল নিয়ে জড়ো হয়। পুলিশকে মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ বা র্যাবের টহল থাকে না। বখাটের ভয়ে কলেজেও ঠিকভাবে যাওয়া হচ্ছে না। টঙ্গী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের দুই ছাত্রী জানায়, ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের নামধারী ক্যাডার স্বপন ও সাইফুল তাদের দলবল নিয়ে মেয়েদের বেশি উত্ত্যক্ত করে। তাছাড়া পাড়া-মহল্লায় বখাটে তো রয়েছেই।
কিছুদিন আগে শান্তিনগর এলকায় বখাটে যুবকদের আড্ডা ভাঙতে গিয়ে নাজেহাল হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা। বখাটে যুবকরা প্রকাশ্যেই তার স্কুলগামী দুই মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। মানসম্মানের ভয়ে তিনি ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়েছেন। এর আগে তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সেলুন, চায়ের স্টল, ফুটপাতের দোকান ও অলিগলিতে বখাটেরা নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের দেখে বখাটেরা অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছে। অনেকেই আবার মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তাদের ছবি তুলে তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বেশ ক’জন অভিভাবক অভিযোগ করেন, স্কুলের আশপাশ ও এজিবি কলোনির সামনের রাস্তায় দল বেঁধে এলাকার উঠতি বয়সী যুবকরা নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে। স্কুলগামী অনেকেই প্রতিদিন তাদের ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে।
বখাটেদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ার কথা স্কীকার করে র্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যাওয়া হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। তাছাড়া বাড়ানো হয়েছে ফুট ও কার পেট্রোল ডিউটি। প্রতিদিন রাত ৯টার পর মহল্লার অলিগলিতে আড্ডারত বখাটেদের ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
৫০৯ ধারায় সংশোধনী আসছে : পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইভটিজিং প্রতিরোধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রেখে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় সংশোধনী আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এ ধারার সংশোধন করার জন্য আইন কমিশন কিছু সুপারিশ করেছে। এছাড়া যৌন হয়রানিমূলক কার্যকলাপ দ্বারা কোন নারীকে আÍহত্যা করতে প্ররোচিত করার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। গত ছয় মাসে সারাদেশে ২১ তরুণী আÍহত্যা করেছে। তার মধ্যে পাবনার ভাঙ্গুরায় স্কুলছাত্রী তাসলিমা খাতুন কাকলী, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সুফিয়া খাতুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফারহা নাজ রুহি, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রী সায়মা সুলতানা অ্যানি, গাইবান্ধার নিশ্চিন্তপুরে মাদ্রাসা ছাত্রী নুরানী আক্তার, বগুড়ার কেশবপুরে রেশমা আক্তার, পাবনার ঈশ্বরদী বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী বৃষ্টি ও ফাহিমা, ঢাকার ইলোরার আÍহত্যার ঘটনায় তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ইভটিজিং তথা যৌন হয়রানির কারণে কোন নারী আÍহত্যা করলে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির কোন ব্যবস্থা নেই। যার ফলে বখাটেদের গ্রেফতার করার পরও তাদের আটক রাখা যাচ্ছে না। গত ছয় মাসে ৪১৭ বখাটেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ২৯৪, ৩৫৪ ও ৫০৯ ধারা ইভটিজিং ও যৌন হয়রানি দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি বা অশ্লীল গান ব্যবহার করে রাস্তায়, পথে-ঘাটে বা লোক চলাচলের স্থানে কাউকে বিরক্ত করলে ২৯৪ ধারা প্রয়োগ করে তিন মাস জেল, বল প্রয়োগ বা উৎপীড়ন করে মেয়েদের শ্লীলতাহানি করা হলে ৩৫৪ ধারা প্রয়োগ করে দুই বছর জেল। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, অশ্লীল মন্তব্য বা শব্দ ব্যবহার করে মেয়েদের বিরক্ত করলে ৫০৯ ধারায় এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মূলত এ আইনগুলোই সংশোধন করা হবে বলে জানান তিনি।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে অক্টোবর, ২০১০ সকাল ৮:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


