বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সউদি আরবের পূর্ব প্রান্তে দাম্মাম জেলা শহর।এই জেলারই প্রায় ৩০কি;মি; দূরে দাহরান ও আলখুবার উপশহর।আল খুবার এই মরূর দেশে হাতে গড়া সবুজ সুন্দর একটি মডেল শহর।শহরের পুরো একটি পাশ ঘুরে শান্ত সমুদ্র রয়েছে।দাম্মাম থেকে হাফমুন সী বীচ প্রায় ৬০কি;মিঃ দীর্ঘ। এবং এই দীর্ঘ বীচ ঘেষে গরে তুলেছে নয়নাভিরাম সবুজ পার্ক যাকে আমরা কর্ণিশ বলি।আমরা বাংলাদেশী আমাদের রয়েছে বারো মাসে তের পর্বণ।তাই প্রায়শঃ আমাদের কোন না কোন অনুষ্ঠান লেগেই আছে।আর অনুষ্ঠানগুলোর জন্য আমরা বেছে নেই কর্ণিশের এই সবুজ সুন্দর প্রান্তরটি।সেখানে খাই দাই গল্প করি ব্যস।কিন্তু বৈশাখী অনুষ্ঠান? আবার এই মাঠে ! কোথায় গান, কোথায় নাচ, আর মরূ ঝড় শুরূ হলেতো কথাই নেই।তাই ঠিক করলাম একটা কমিউনিটি সেন্টার নেয়া যাক। হাফমুন সী বীচের নিকটবর্তী একটি কমিউনিটি সেন্টার বৃহষ্পতিবার রাতে (৩রা বৈশাখ)ভাড়া নিলাম।কারন পরদিন আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি।সারা রাতের অনুষ্ঠান সূচী শেষ করে পরদিন দুপুর অব্দি ঘুম দেয়া যাবে।তাই আমাদের আয়োজন ছিল এমনঃ
সন্ধ্যা রাতে সবাই চলে আসবে।অভ্যার্থনা জানাবেন জনাব মাহমুদুল আজিজ।তিনি ওয়াটার প্রজেক্ট সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান।আবহ সংগীতের দায়িত্তে ছিলেন জনাব ইকবাল হোসেন তিনি নিউ সান ইলেক্ট্রিক ফ্যাক্টরির প্রতিষ্ঠাতা জিএম।মঞ্চ সাজানোর দায়িত্ত নেন জনাব মোস্তফা ওল্টু এবং সাইফেম সৌদি শাখার ফাইনান্স কোঅর্ডি্নেটর জনাব রাশেদুল ইসলাম।সাংষ্কৃতি অনুষ্ঠানটির সার্বিক দায়িত্ত নেন ইঞ্জিঃকামরুজ্জামান টোকন এবং মিসেস সফিউল্লাহ।খাবার পরিবেশনের দায়িত্ত দেয়া হয় যথাক্রমে জনাব মোশাররফ হোসেন তিনি সৌদি আরামকো জোয়াইমা প্রজেক্ট কোর্ডিনেটর,সাঈদুর রহমান তিনি সিডা লজিস্টিক কার্গোর ব্রাঞ্চ একাউন্ট্যান্ট,ক্যাড রাইটার জনাব জহুরুল হক এবং ব্যবসায়ী সহিদুল ইসলাম।আমাদের এই অনুষ্ঠানটি আর্থিক বিষয়টি দেখেছেন নাম্মা কার্গোর সিনিওর একাউন্টান্ট জনাব খালেদুর রাহমান।আর সম্পুর্ন অনুষ্ঠানটি আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্তে ছিলেন ইঞ্জিঃমোজাম্মেল হক যিনি দীর্ঘদিন যাবত বাত্তাল আল দোসারী কোম্পানীতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন।
সন্ধ্যা থেকেই টুং টাং রবীন্দ্র সংগীতের আওয়াজ ভেসে আসছিল।সেই সঙ্গে অতিথীরা একে একে আসতে থাকে।উঠতি বয়সের মেয়েরা এবং তাদের মায়েরাও সৌদির নিয়ম ভেংগে,বোরখা খুলে যেন তাদের বৈশাখী শাড়ীর প্রদর্শনী শুরূ করে।ছোট বাচ্চা ছেলে ও মেয়েরাও ফতোয়া,পাঞ্জাবী ও শাড়ী পড়ে ঈদের মতো আনন্দে মেতে ঊঠে।সেই সাথে শুরু হয় বড়দের জমানো আড্ডা।তবে আয়োজকগণ আগেই টানিয়ে রেখেছিল “ রাজনৈতিক কথাবার্তা না বলা ভালো “ স্কুল পলিটিক্স এখানে নয় ” ইত্যাদি; তাই আড্ডা জমে উঠে পুরানো দিন নিয়ে।এখানে বিডিয়ার প্রসংগ ,খালেদা জিয়ার বাড়ী , ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ,শেখ হাসিনার সউদি সফর বা উপজিলা চেয়ারম্যান নিয়ে কোন কথাবার্তাই হয়নি।যাহা প্রবাসী জীবনে এমনটি আর দেখা যায়না।তবে গল্প আর আড্ডার সংগে রবীন্দ্র সংগীতের মূর্ছনায় আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম দেশে নয় আমরা রয়েছি দূরদেশ সৌদি আরবে।আমাদের এই আড্ডায় আরো ছিলেন বিশিষ্ঠ শিশু চিকিৎসক মারুফ হোসেন,বাংলাদেশ স্কুলের চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ মফিজুল ভূইয়া, ভাইস প্রিন্সিপাল জনাব আবুল কালাম আযাদ , এরামেক্স মেইলের সেলসম্যানেজার জনাব শাহ আলম,সুদূর জ়েদ্দা থেকে আগত জনাব মোকাম্মল হোসেন সহ আরো অনেকে।আর এই জমানো আড্ডার রসদ জোগানোর দায়িত্তে ছিলেন জনাব মঈনুদ্দীন আহম্মেদ যিনি ঢাকা ভার্সিটির ফার্মাসি বিভাগের ছাত্রনেতা ছিলেন।
ঘড়ির কাটা ১০টা ছুতেই মোশারফ সাহেব খাবারের জন্য হাক দিলেন।খাবারের মেনুতে ছিলঃ ভাত, আলুভর্তা, ডালভর্তা, বেগুনভর্তা, শুটকীমাছ, চিংড়ীভর্তা, কাচকিমাছ, মলামাছ, মুশুরডাল, মুরগীর মাংস এবংতিন প্রকারের ইলিশমাছ রান্না।আর এর সব রান্নাই করেছেন আমাদের প্রিয় ভাবীগন।কারন এই সকল রান্না হোটেল ওয়ালারা পারবে কিনা আমাদের সন্দেহ ছিল।এছারাও আমরা চেয়েছিলাম সেরা রাধুনীর পুরষ্কার ঘোষনা। কিন্তু আমরা খাওয়া দাওয়ার পর ঢেকুর গুনতে গুনতে সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম সব খাবারই দারুন মজার হয়েছে অতএব সব ভাবীরাই সেরা রাধুনী।যদিও অনেক ভাবীকে পুরষ্কার হাত ছারা হয়ে যাওয়ায় মনক্ষুন্ন হতে দেখা গিয়েছে!ওদিকে খাওয়া দাওয়ার পর পরই অঞ্চলভিত্তিক(!) কিছু অতিথী চলে যাওয়ার জন্য নড়া চড়া শুরু করলে আমাদের সংস্কৃতি অনুষ্ঠান চালু করার ঘোষনা দেন সফিউল্লাহ ভাবী।তিনি তার সুন্দর কবিতা শুনিয়ে যখন অনুষ্ঠান শুরু করেন তখন অন্যান্য ভাবীরা তাদের রুম থেকে এখানে এসে বসেন।বাচ্চা ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কবিতা,ছড়া ও গান পরিবেশন করেন।এছারা মালীহা,খালেদভাবী,আজ়িজভাবী,মোস্তফাভাবী তাদের সুন্দর সুন্দর গান ও টোকনভাবীর কবিতা সবাইকে মুগ্ধ্য করে।
গান চলাকালীন হঠাৎ করেই কামরুজ্জামান সাহেব কিছু বাথরুম সিংগারের নাম ডাকা শুরু করেন।তাদের মধ্যে প্রথমেই ধরা দেন ইঞ্জিঃমোজাম্মেল; মঞ্চে এসে তিনি ভয়ে ঘেমে গিয়ে গান শুনান।তবে দর্শক শ্রোতাদের নাকি গানটা ভালোই আনন্দ দিয়েছে।এরপর মোশারফ সাহেবও একটি পল্লীগীতি গেয়ে শুনান।অনুষ্ঠান গড়াতে গড়াতে কখন যে গভীর রাত হয়ে গিয়েছে টেরই পাওয়া যায়নি।বিদেশের মাটিতে এমন একটি খাটি বাংলা অনুষ্ঠান উপহার দেয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিন আমরা সবাই যার যার ঘড়ে ফিরতে রওইয়ানা দিই। আর গুনগুনিয়ে গাইতে থাকি এসো হে বৈশাখ এসো এসো----
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




