একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি-কে তুলনা করা যেতে পারে রেলগাড়ির ইঞ্জিনের সাথে - রাজনীতি যেদিকে ধাবিত হয়, পুরোটা দেশ ও সমাজ সে পথেই চলতে বাধ্য হয় ৷ আর রাজনীতি নামক এই ইঞ্জিনের চালক ও বাহক হচ্ছেন রাজনীতিবিদরা - জনগণ যাত্রীমাত্র ৷ তাই আমরা জাতি হিসাবে কোন দিকে যাচ্ছি, আর আমাদের ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আমাদের আজকের রাজনীতিবিদরা কেমন তার উপর ৷
এখন আপনারা চিন্তা করুন, বর্তমানে রাজনীতিবিদদের যে আচার-আচরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তাতে কি মনে হয় আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটা সত্য ও ন্যায়-পরায়ন সমাজ আমরা রেখে যেতে পারব যেখানে আমাদের উত্তরসুরীরা কোনো বিশেষ ব্যক্তিবর্গের করুনার পাত্র না হয়ে কিংবা অহেতুক তোষামদির আশ্রয় না নিয়ে শুধু নিজেদের যোগ্যতা-বলে নিজ নিজ স্থান করে নিতে পারবে, যেমন করে নিয়েছিলেন দরিদ্র কৃষকের ছেলে, বাল্যকালের কাঠুরিয়া আব্রাহাম লিঙ্কন তত্খালীন সমাজের অতি ধনী ও প্রভাবশালীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে দেড় শত বছর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়ে, কিংবা আজকের কৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামা যেভাবে নিজ যোগ্যতার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ট শ্বেতাঙ্গ সমাজে অতি পরাক্রমশালী শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জয়ী হয়ে?
আমাদের দেশের অনেক পণ্ডিতকে খুব সহজেই বলতে শুনেছি যে, আমেরিকায় গণতন্ত্রের চর্চা বহুদিনের; সুতরাং তাদের সাথে আমাদের এই নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার তুলনা ঠিক নয় ৷ কিন্তু যারা একথা বলেন, তারা অনেকেই হয়ত জানেন না যে, আমেরিকায় গণতন্ত্রের শুরু থেকেই সততা ও যোগ্যতাই উন্নতির মাপকাঠি হয়ে আসছে এবং এখনো মুটামুটি তাই হচ্ছে -এখানে ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির স্বার্থ সবসময়ই প্রাধান্য পায়, তাই যোগ্যতা ছাড়া শুধু ব্যক্তিপূজা করে কেউ খুব একটা সুবিধাজনক স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়না এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ব্যক্তিপূজা তেমন কোনো গুরুত্ব পায় না ৷ কিন্তু আমাদের শুরুতেই গলদ - রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের উপরে ব্যক্তি, পরিবার ও দল বেশি প্রাধান্য পায়, এবং দিনে দিনে গণতন্ত্রের চেয়ে পরিবারতন্ত্রের দিকে এমনভাবে অগ্রসর হচ্ছি যে, আমরা যেন রাজতন্ত্রকেই সুচতুরভাবে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছি ভোটের মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে ৷
এখানে আমেরিকার স্বাধীনতার জন্মলগ্নের একটা উদাহরণ দিচ্ছি - সবাই জানেন যে, জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু তা স্বত্তেও শুধু তাকে এককভাবে জাতির জনক হিসাবে সকল কৃতিত্ব না দিয়ে বরং প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যারা নিজ নিজ নাম স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের সবাইকেই সমষ্টিগতভাবে অতি স্রধাভরে বলা হয় Founding Fathers, আর এ ব্যাপারে কোনই বিতর্ক নেই আমেরিকার রাজনীতিবিদদের মাঝে ৷ আবার জর্জ ওয়াশিংটনের প্রায় সত্তর বছর পরে রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার জন্য যে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং সেই সাথে আমেরিকার সংকটময় গৃহযুদ্ধের সময় যেভাবে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার জন্য দলমত-নির্বিশেষে সকল আমেরিকানরা তাকে আমেরিকার আদর্শ এবং শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসাবে সদা স্বীকৃতি দেয় ৷
এখন চিন্তা করুন, আমাদের দেশে দলীয় স্বার্থে কি করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ? আমাদের রাজনীতিবিদরা কি কখনো কিছু শিখবে বলে মনে হয় ? আর ওই দুই পরিবার (মুজিব-জিয়া) থেকেই যদি সব সময় আমাদের রাজনৈতিক দল-প্রধান এবং সরকার-প্রধান নির্বাচন করতে হয়, তাহলে এটা কি ধরনের গণতন্ত্র আমরা চর্চ্চা করছি, তা ভাবার দরকার অবশ্যই আছে ৷ আমাদের গণতন্ত্র ভ্রুনেই যদি মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে পড়ে, তবে যত দিন যাবে তার বিকলাঙ্গ রূপ ততই আরো জটিল আকার ধারণ করবে যা আর কোনমতেই শুধরানো যাবে না - আমরা চিরকাল এই বিকলাঙ্গকে বহন করতে হবে, এর কোনো গত্যন্তর নেই ৷ আমাদের এই রাজনৈতিক পচনশীলতা এখন শিক্ষাঙ্গন-সহ সকল ক্ষেত্রে এক মারাত্মক ব্যাধির মত ছড়াচ্ছে যা জাতিকে ধংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে ৷
এখন সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বর্তমান রাজনীতির নীতিহীনতার জন্য তো কোনো মাথা ব্যথা নেই-ই; এমনকি আমাদের তথাকথিত বুধিজীবিরা ও এব্যাপারে হয় উদাসীন, না হয় যে যেভাবে পারেন নিজের আঁখের গুছানোতে ব্যস্ত ৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তো এখন সাদা আর নীল প্যানেল নামক রাজনৈতিক সুবিধাবাদী-তে পরিনত হয়েছেন ৷ আর দেশের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিক, সম্পাদক এবং নীতি-নির্ধারকদের অবস্থা তো সবাই দেখতেই পাচ্ছেন ৷ অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্য ও পক্ষ-বিপক্ষের খেলায় সবাই এমনভাবে মেতেছে যে, তাদের হিতাহিত জ্ঞান আছে কিনা সন্দেহ হয় ৷ একটা দেশের প্রধান সম্পদ যে চিন্তাশীল জনগোষ্ঠী তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার লোকজন বোধ হয় আর থাকবে না; সবাই দলীয় চশমা দিয়েই সবকিছু বিচার করছে, আর চাটুকারিতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ হিসাবে ৷
এমতাবস্থায় শেষ অবলম্বন হিসাবে থাকে শুধু দেশের তরুণ সমাজ ৷ কিন্তু এই তরুণ সমাজের প্রধান অংশ যে ছাত্র-সমাজ, যারা অতীতে জাতির কঠিন সংকটে সব সময় এগিয়ে এসেছে এবং প্রয়োজনে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছে দেশের জন্য, আজ তারা সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে পদদলিত করছে রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে ৷ দেশের নেতৃত্ব দানকারী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহের ছাত্রদের একাংশ এখন হীন-স্বার্থে একে অপরের সাথে কুন্দল, মারামারি, হানাহানি, খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এসব নিয়েই সময় কাটাচ্ছে এবং যে যেভাবে পারে তাড়াতাড়ি লুটতরাজের মাধ্যমে সম্পদ আহরণে অধিক ব্যস্ত ৷ আর অপর অংশ অতি নিরীহ গো-বেচারার মত কোনমতে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি-বাকরির চেষ্টায় আছে, তাদেরকে বরং প্রসংশাই করতে হয় ৷
তবে আশার ব্যাপার হলো এই যে, তরুনদের মধ্যে যারা দলীয় কুন্দলের মধ্যে খুব একটা নেই, তাদের অনেকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেশের রাজনীতিকে অবলোকন করছে, এবং এদের কেউ কেউ ব্লগের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা ও মতামত ব্যক্ত করছে ৷ আমার মতে, যারা নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে ভালোকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলার মত সাহস রাখে, তারাই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন এবং দেশপ্রেমিক, আর বাকিরা স্বাধীন ভূমিতে বাস করলে ও পরাধীনতার সৃন্কলে বাঁধা, যাদের থেকে জাতির তেমন কিছু পাবার মত নেই ৷
তাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী দেশবাসী, আপনারা নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হোন দেশের ভেতরে এবং বাইরে, যেন দেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় সূস্থ রাজনীতির শূন্যতা পূরণে একসময় আপনারা এগিয়ে আসতে পারেন ৷ অনেকে মনে করেন, রজনীতির “নোংরামিতে” কখনো জড়াবেন না, কিন্তু ভেবে দেখুন, প্রত্যক্ষ অথবা পরক্ষভাবে দেশের রজনীতি আপনার জীবনের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাবান্বিত করছে৷
একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবন কখনই রাজনীতির নাগালের বাইরে নয় ৷ তাই আমদের সামনে এখন দু'টি পথ খোলা আছে - হয় দেশে সূস্থ রাজনীতির ধারা সৃষ্টি করে নিজেরা এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মরা এর থেকে লাভবান হবো, নতুবা আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যত বংশধর-রা অসুস্থ রাজনীতির শিকার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরব ৷ আমার মনে হয় এটা পরিষ্কার, আমরা কোন পথটা বেছে নেওয়া জরুরি ৷ আর এই পদক্ষেপ আমাদের সমষ্টিগত দায়িত্ব, যাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই ৷
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



