আমার রবীন্দ্র শিক্ষার অভাব ভয়াবহ। ফলে কোন গুনী যদি আমার এই রবীন্দ্র জ্ঞানের পরীক্ষা নেয় এবং তার পাশ নম্বর যদি ৩৩ এর বদলে ২০ ও নির্ধারণ করে তবু আমি পাশ করবো না। বড় জোর ৭ থেকে ১৩ এর মধ্যে কিছু একটা পাবো। খারাপ ছাত্ররা যেমন প্রাইমারি ও উচ্চ বিদ্যালয়ে না-পড়া, না-লেখা দায়ে নানা নিপিড়ন নির্যাতন অবহেলা অবজ্ঞার সম্মুখীন হয় তেমনি রবীন্দ্র বিদ্যালয়ে ছাত্র হিসাবে আমি লাস্ট বেঞ্চির। ফলে রবীন্দ্র শিক্ষালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ভালোবাসা আমি তেমন পাইনি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে নির্যাতিত হয়েছি। ফলে আমার রবীন্দ্র শিক্ষা তেমন ভালো না, ভয় মিশ্রিত। আমার মনে ভেতর রবীন্দ্রনাথ নামক যে কাল্পনিক বিদ্যালয় সে বিদ্যালয়ের খারাপ ছাত্র আমি। তবে খারাপ ছাত্রদের চোখ থাকে মাঠের দিকে, ব্লাকবোর্ডের কৃষ্ণত্বে তাদের মন ছিলো না কোনদিন। তাই এই বিদ্যালয়ের খোলা যে বিশাল মাঠ সেখানে আমি সন্ধ্যা অব্ধি হৈ চৈ করতে পেরেছি মনের সুখে। আমার মনে ভেতর রবীন্দ্রনাথের খোলা মাঠের কথা কেউ জানে না। রবী বাবুর সাথে আমার খেলাখেলা সম্পর্ক, ফলে কেউ প্রশ্ন তুলবেন না একাডেমিক্যালি আমি তাকে কতটা জানি কতটা বুঝি। কারন আগেই বলেছি আমার মাপ ৭ থেকে ১৩ এর মধ্যে। সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য এই দৈর্ঘ্য প্রস্থের পরিসীমার মধ্যে আমার রবীন্দ্র আভিজ্ঞতা। তেমন দুএকটি অভিজ্ঞতার কথাই না হয় বলি। ক্ষমা করবেন।
১.
এই জীবনের যত মধুর গানগুলি:
স্কুল জীবনের চরম অত্যাচারের নাম এসেম্বিলি। চৈত্রে এই অত্যাচার ভয়াবহ। আমদের স্কুলের নিয়ম ছিলো জাতীয় সংগীত খুব জোরের সাথে গাইতে হবে। শুধু চলচ্চিত্র নায়িকাদের মত মুখ মিলালেই হবে না। তো আমি ছোট বেলা থেকেই নায়িকাদের দলে। আমার কাছে জাতীয় সংগীত মানেই এসেম্বিলিতে দাড়িয়ে মুখ মিলিয়ে যাওয়া। এই চৈত্রের রোদ্দুরে ভেতর আমার গলা দিয়ে স্বর বের হতে চাইতো না। '' আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'' কিছুতেই আমি বলতে পারতাম না। মাত্র আমার মুখ গান গাওয়ার যে ভঙ্গি তাকে অন্ধ ভাবে অনুকরন করে যেতো। কিন্তু বেশি দিন এভাবে টিকে থাকা যায় নি। একদিন ধরা খেলাম। জোড়া বেতের মারও খেলাম এবং জানলাম গানটির রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবং তিনি যাতা কেউ নয়, বিশ্বকবি। এবং এভাবেই জোড়া বেতের মার খাওয়ার ভেতর দিয়ে আমার রবীন্দ্র শিক্ষার শুরু, এবং এই শিক্ষাদান কর্মকান্ডের গুরু ছিলেন বেশ কয়েকজন শিক্ষক। দর্শক হিসাবে ছিলো আমার সহপাঠিরা। আর যারা সেদিন জাতীয় সংগীত না গাওয়ার দায়ে বেঁচে গিয়েছিলো শুনেছি পরবর্তী জীবনে তাদের
কারওই আর রবীন্দ্র রচনা পড়ে ওঠা হয় নি। আমি যৎসামান্য পাঠ করেছি পরবর্তী সময়ে। এভাবেই আঘাতের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্র ভালবাসার শুরু। সূচনাটা বেদনাদায়ক ছিলো।
আমার জ্বলে নি আলো অন্ধকারে
দাও না সাড়া কি তাই বারে বারে।
তোমার বাঁশি বাজে বুকে কঠিন দুখে, গভীন সুখে,
যে জানে না পথ কাঁদাও তারে।
২.
প্রথম যে গান আজও মনে আছে:
রবীন্দ্রনাথের গান হিসাবে যে গানটিকে প্রথম চিনতে শিখেছিলাম সেটি হেমন্তের কন্ঠে
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই ঘাটে,
আমি বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে গো
...তখন আমায় নাই বা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।
তখন বিটিভি এর নাটক দেখা হতো। ঘটনাটা বোধ হয় ৯২/৯৩ দিকাকার। আমার বয়স তখন বড়জোর ৮/৯। কিন্তু নাটক থেকে শেষ দৃশ্যের এই গানটিই সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো। পুরো নাটকে তৌকিরের বেদনাবোধ থেকে এই গানটির বেদনাই অসীম। আজও এখনও আমাকে ছুঁয়ে আছে। তবে শিল্পীর যে হেমন্ত তা অনেক পরে বুঝতে শিখেছি, অন্তত ৫ বছর পর বুঝেছি ঐ গানটি হেমন্তই গেয়েছিলো। কারণ কন্ঠ নাচেনা শিল্পীর কন্ঠ চিনতে সময় লেগেছে। তবে কিন্তু তার সেই কণ্ঠ আর সে গানের বাণী ঠিক চিনে ফেলেছি পরবর্তীতে। এই অসীম বেদনা এখনো কোন গানের বাণীর মধ্যেই খুঁজে পাইনি। এই অসীম হাহাকারের রচয়িতা সেই, আমার রবীন্দ্রনাথ যার গান না গাওয়ার অপরাধে আমাকে মার খেতে হয়েছিলো। সেই আমার ররীন্দ্রনাথ চিনতে শেখার সূচনা।
৩.
যে মেয়েটি সব থেকে ভালো রবীন্দ্র সংগীত গাইতো তাকে কেউই চিনলো না:
নানা সময়ে নানাজনের কন্ঠে রবীন্দ্র সংগীত শুনেছি। অনেকের কন্ঠের রবীন্দ্রনাথের গানকে, গায়কীকে মনে হয়েছে বিড়ালের গোঁফে মত অধিক্য। অযথা টান বেশি, অস্পষ্ট উচ্চারন বিশিষ্ট,গান শুনে মনে হয় কি যে বলে গেলো,গেলো না বুঝা তার কিছু। ছোটবেলায় আমার একটা বিড়াল ছিলো। বিড়ালেরতো আবার গোঁফ থাকে। আমি মেনে নিতে পারি নি আমার বিড়ালের আবার গোঁফ কেন থাকবে। ফলে কেঁচি দিয়ে তার গোঁফ ছাটা আমার একটা অভ্যাস ছিলো, যা আমি অতি প্রয়োজনীয় একটা কাজ মনে করতাম। একবার নেলকাটার দিয়ে তার নখও আমি কাটতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। ফলে সেই বিড়াল দৃষ্টিভঙ্গি আমার ভেতর ছোটকাল থেকেই ছিলো। তাই অতি অভিনয়ে ভরা টান-প্রধান রবীন্দ্র সংগীত আমার ভালো লাগে নি। স্পষ্ট উচ্চারণের গায়কীই আমার পছন্দ। যাক সে কথা।
রুমার সাথে আমার পরিচয়ের গভীরতা ওর রবীন্দ্র সংগীতের জের ধরেই। রুমা রাণী সাহা। সে ছিলো আমার স্কুলের সহপাঠিনী। তার সাথে কত রাস্তায় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। সেভাবে মনযোগ দিয়ে আকুতি দিয়ে কথা হয়নি বললেই চলে। একদিন দেখি এক অনুষ্ঠানে সে গান গাইছে। আজ আমি ছিলাম দর্শক। আমি জানতামই না যে আমার পুরনো সহপাঠিনী এমন গাইতে পারে। আমি জানলাম না সে একা একা আমার অজান্তেই কবে যে এতো গান শিখে গেলো। আমি ওর গানে মুগ্ধ ছিলাম। রবীন্দ্র ভক্তি যে কি জিনিস তা আমি শিখলাম ওর গানের কাছে। আর কারও কাছে এমন শেখার সুযোগ হয়নি। রবীন্দ্র সংগীত আর এর গায়িকা দুটোই ভক্তি দাবি করে। এটা শিখলাম। শিখলাম এই গানের ভেতর যে কত কানাগলি, অন্ধকার, অন্ধত্ব, প্

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


