somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘পূর্বপ্রান্ত লাল’

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘পূর্বপ্রান্ত লাল’
মৃণালকান্তি দাস

‘সাম্রাজ্যবাদ কেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তার আন্তর্জাতিক তাৎপর্য আছে। কারণ গত ৫০ বছর আগে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে চীন যে বীরত্ব দেখিয়েছিলো তা মেনে নিতে পারেনি সাম্রাজ্যবাদীরা। চীনের ঐ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজেছে। পরবর্তীতে মার্কিন ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে প্রতিবাদ মিছিলের ঘটনার সূত্রপাত। যে ঘটনা চীন বিরোধিতার প্রসঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীরা বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করে। অথচ, সাম্রাজ্যবাদ দেবত্ব আরোপ করেছে যে ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র ওপর সেই প্রতীকটি আজ গোটা বিশ্বের স্বাধীনতা হরণের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
চীন ৫৫টি সংখ্যালঘু জাতি গোষ্ঠীর অধিকার ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখার অঙ্গীকারে আইন পাস করেছে। একই সঙ্গে চীন তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে খুবই অনুভূতিশীল। তিব্বতকে কেন্দ্র করে চীনের বিরুদ্ধে যে প্ররোচনার গান গাওয়া হচ্ছে তা বিউগলের এমন এক সুর যা দেশটির কষ্টার্জিত সাফল্যের ওপর আক্রমণ।’ চীনের সাফল্য প্রসঙ্গে ‘গ্রানমা’য় এমনই কথা লিখেছেন ফিদেল কাস্ত্রো।
ফিদেল লিখছেন,‘ট্রয় গড়ে ওঠার আগে কিংবা গ্রীক নগর রাষ্ট্রগুলো ইলিয়াড এবং ওডিসি’র ব্যাপারে অবগত হওয়ার আগেই পীত নদীর দীর্ঘ উপত্যকায় একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। প্রশ্নাতীতভাবেই ঐ সভ্যতা ছিল মানবপ্রজ্ঞার বিস্ময়কর ফল। তেমনি চীনের সংস্কৃতির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ঝাও রাজবংশে, যীশুখ্রীষ্টের জন্মের ২হাজার বছর আগেও যার অস্তিত্ব ছিল। খোঁজ পাওয়া গেছে কয়েক হাজার চিত্র প্রতীকের। যা সাধারণভাবে ভাষায় শব্দকে প্রতিনিধিত্ব করে। আধুনিক ভাষাবিদরা একে অভিহিত করেছেন ‘মরথিমস’ হিসাবে। যদিও তা সাধারণের কাছে বোধগম্য নয়। ওই ভাষার রহস্য আমাদের উপলব্ধির বাইরে। চীনের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক বৃদ্ধির মাধ্যমেই তা লিখতে পারে। বারুদ, দিক নির্ণয় যন্ত্রের মতো বহু জিনিস যখন চীনে প্রথম ব্যবহার শুরু হয় তখন গোটা বিশ্বের কাছে তা ছিলো অজানা। কলম্বাস অনুসৃত পথটির বিপরীতে যদি বাতাস বইতো তাহলে সম্ভবত চীনের মানুষই প্রথম ইউরোপ আবিষ্কার করতো।’

ষাট বছর আগে অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ১লা অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় গণ-সাধারণতন্ত্রী চীন। মাও জে দঙ সেদিন ঐতিহাসিক ঘোষণা করে‍‌ছিলেন, চীনের মানুষ জেগে উঠেছেন। গত ছয় দশকে ঐ ঐতিহাসিক ঘটনার প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।
চীনের বিপ্লব এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
চীন সে সময় ছিলো সবচেয়ে বড় দেশ, তখন জনসংখ্যা ছিলো ৪৭কোটি ৫০লক্ষ। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এশিয়ার বৃহৎ দেশ চীন ছি‍‌লো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে পশ্চিমী দেশগুলি ও জাপান ঐ দেশকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানকার সামন্তপ্রভুদের সঙ্গে যোগসাজশে ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান চীনকে বিভিন্ন অংশে দখল করে। সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-ঔপনিবেশিক শাসনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন চীনের মানুষ। ১৯২১সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সি পি সি) সামন্ততন্ত্র ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিলো। চীনের জনগণের মুক্তির লড়াই চলেছিলো টানা তিনদশক ধরে। তীব্র সংগ্রাম চলেছে সামন্তপ্রভু এবং ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে। দুর্নীতিবাজ, দক্ষিণপন্থী কুওমিনটাং-কে উচ্ছেদ করে জাপানী দখলদারির বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করে সি পি সি। চীনের বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্বে ছিলো জাপানীদের আত্মসমর্পণের পর চীনের গণফৌজ এবং কুওমিনটাংয়ের মধ্যে যুদ্ধ।
রুশ বিপ্লবের তিন দশক পরের চীন বিপ্লব বিশ্বে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। সেই ধারা এখনও নানাভাবে বিকশিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নিরিখে চীন এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জি ডি পি)-র হিসাব করলে চীন হলো এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, চীন দারুণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে। যে চীন তার মুক্তির সময়ে শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে ছিলো।
ভাবুন একবার, আমাদের দেশ স্বাধীন হবার দু’বছর পরে, মাও জে দঙ এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জনগণতন্ত্র চালু করে। প্রকৃত অর্থে ভারতের চাইতেও পেছিয়ে ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে। আয়তনে ভারতের চেয়ে বড়, কিন্তু চাষযোগ্য জমি ভারতের চেয়ে কম। রেল লাইন ভারতের চেয়ে কম। ’৪৭সালে ভারতে যতটা শিল্প গড়ে উঠেছে, ’৪৯সালে চীনে তাও হয়নি। অথচ জনসংখ্যা ভারতের চেয়ে বেশি। এই নিয়ে শুরু করে ভারত আজ কোথায় আর চীন-ই বা কোথায়? দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, খাদ্যশস্য উৎপাদন, শরীর স্বাস্থ্য ইত্যাদি সব বিষয়ে চীন এগিয়ে।

জনগণতান্ত্রিক চীন মানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, চীনের সাধারণ মানুষ ও চীনের সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি।
১৯৭৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর, এক শীতের মরসুমেই এগিয়ে চলার পথে অত্যন্ত ঝুঁকিপুর্ণ বাঁক নিয়েছিল চীন। সেই দিন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বহির্বিশ্বের কাছে চীনের অর্থনীতির দরজা খুলে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আজ যা চীনের ‘সংস্কার’ প্রক্রিয়া বলে সুপরিচিত এবং অবশ্যই বহুল আলোচিত।
দু’টি দিক থেকে চীনে এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রয়োগ করা হয়েছিল। একদিকে অর্থনীতির দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সেই সূত্রে উৎপাদনশীল শক্তিগুলির সম্ভাব্য বিকাশের পথ প্রশস্ত করা হয়। পাশাপাশি চারটি মৌলিক নীতিতে দৃ‌ঢ়তার সঙ্গে অবিচল থাকার অবস্থান ঘোষিত হয়। এই চারটি মৌলিক নীতি হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও জে দঙ চিন্তা, সমাজতান্ত্রিক পথ, জনগণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব।
এগিয়ে চলার পথে গত তিন দশকে নজিরবিহীন বিকাশের হার অর্জন করেছে চীন, গড়ে প্রতি বছর ৯.৮শতাংশ। আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অন্য কোন দেশ বিকাশের এমন ধারাবাহিক উচ্চ হার অর্জন করতে পারেনি। ১৯৭৮ সালে চীনের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫২০০ কোটি ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩লক্ষ ৬০হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ বেড়েছে ৭০গুনেরও বেশি। এই সময়ে চীনে মাথাপিছু আয় ৩৪৩ইউয়ান থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৭৮৬ইউয়ান এবং চীনের মাপকাঠি অনুযায়ী ১২০কোটি জনসংখ্যায় দরিদ্রের সংখ্যা ২৫কোটিরও বেশি থেকে নেমে এসেছে ১কোটি ৪০লক্ষে। আজ চীন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার এবং বিদেশী মুদ্রার সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের অধিকারী দেশ। এখানেই শেষ নয়। চীনে এখন সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১লক্ষ কোটি ডলার।
রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ নির্মাণের প্রক্রিয়াকে যুদ্ধ হিসাবে আখ্যা দিয়ে লেনিন বলেছিলেন, ‘‘বর্তমান যুদ্ধে বিষয় হলো কে জিতবে, কে সবার আগে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করবে, পুঁজিপতিরা (যাদের আমরা দরজা দিয়ে আসতে দিচ্ছি, এমনকি এমন অনেক দরজা দিয়ে যেগুলি সম্পর্কে আমরাও অবহিত নই, যেগুলি আমাদের ছাড়াই খুলে যায়) অথবা প্রলেতারীয় রাষ্ট্রশক্তি?
একইরকমভাবে দেঙ জিয়াও পিঙ দক্ষিণ চীন সফরের সময়ে বলেছিলেন — মূল কথা হলো রাস্তাটি পুঁজিবাদী অথবা সমাজতান্ত্রিক? এ ব্যাপারে বিচার করতে গেলে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনশীল শক্তিগুলির বিকাশ ঘটছে কিনা, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামগ্রিক শক্তিবৃদ্ধিতে সহায়ক কিনা এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটাতে পারছে কিনা?
পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে দেঙ বলেছিলেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের মালিকানার প্রাধান্য থাকবে এবং কেন্দ্রীভবন ঠেকানো হবে। গত চারবছর ধরে আমরা এই লাইনগুলি ধরেই এগোচ্ছি। অর্থাৎ আমরা সমাজতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধ আছি।
সি পি সি-র কর্মসূচী রূপায়ণের মধ্যে দিয়ে এই চমৎকার অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো। এই কর্মসূচী অনুযায়ী চীনে আমূল ভূমিসংস্কার হয়েছে, স্থাপিত হয়েছে ভারীশিল্পের ভিত্তি, জনগণের জন্য মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে চীনের পথ হলো কৃষকের মুক্তি এবং আত্মনির্ভরশীল পদ্ধতিতে অর্থনীতি গড়ে তোলা। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির কাছে এই বিপ্লবের গভীর আবেদন ছিলো, এই দেশগুলির মধ্যে বেশিরভাগই ঔপনিবেশিকতার জোয়াল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশ হিসাবে সে সময় আত্মপ্রকাশ করেছিলো। যাঁরা চীনের বর্তমান অগ্রগতির পিছনে পুঁজিবাদ চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছে বলে চটকদারি প্রচারে ব্যস্ত তাঁরা কিন্তু যে ভিত্তির উপরে অগ্রগতি গড়ে উঠেছে সেই ভিত্তিকেই উপেক্ষা করার চেষ্টা করছেন। চীন ভূমিসংস্কার করেছে, রাষ্ট্রের উদ্যোগে শিল্পায়ন হয়েছে, সরকারী অর্থে সেখানে গড়ে উঠেছে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক ক্ষেত্র। তারপর সূচনা হয়েছে সংস্কারের। চীনের বর্তমান গতিশীল বিকাশের মূলে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং যৌথ উদ্যোগগুলির সংস্কারের পাশাপাশি ক্রমবিকাশমান বেসরকারী ক্ষেত্র।
নতুন চীনের গত ছয় দশকের ইতিহাসের গতিপথ মসৃণ ছিলো না। কখনও কখনও ভুল মোড় ‍‌ও চরাই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। যেমন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং বৃহৎ উল্লম্ফনের (গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড) সময়ে ভ্রান্তি। চীনের নেতৃত্বের তরফে জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে, উদ্ভূত সমস্যার মোকাবিলা করেই চীন সংস্কার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। দুর্নীতির মোকাবিলা, অর্থনৈতিক অসাম্য দূরীকরণ ও গ্রাম-শহরের ফারাক হ্রাসেই এখনও চীনের নেতৃত্ব বিশেষ নজর দিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে চীন দশটি নীতি গ্রহন করেছে। যা আগামী দিনে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে।
তার মধ্যে অবশ্যই সবার প্রথমে রয়েছে মার্কসীয় নীতিতে অবিচল থাকার অবস্থান। সংস্কারের নতুন পর্বে চীনের বাস্তবতা অনুযায়ী মার্কসবাদের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগই তাত্ত্বিক পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে। দ্বিতীয়ত, চারটি মৌলিক নীতি অনুসরণেই সংস্কার প্রক্রিয়ার অভিমুখ পরিচালনা করা হবে, যার ভিত্তিতে থাকবে অর্থনৈতিক ভোগ। তৃতীয়ত, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অদম্য উৎসাহের মেলবন্ধন ঘটানোয় গুরুত্ব দেওয়া হবে। চতুর্থত, সংস্কার প্রক্রিয়ায় নতুন গতি ও সমন্বয় আনতে মৌলিক সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাজার অর্থনীতির বিকাশের স‍‌ঙ্গে অবশ্যই সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হবে। পঞ্চমত, সমাজতান্ত্রিক আধুনিকীকরণকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনী সুরক্ষা দিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেবে। ষষ্ঠত, উৎপাদনশীলতার মাত্রার যা-ই বৃদ্ধি ঘটুক না কেন, তাকে অবশ্যই সর্বদা নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির (দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান) সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সপ্তমত, অর্থনৈতিক বিকাশকে সামাজিক সমতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে। অষ্টমত, বিশ্বায়িত আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলেও চীন দৃঢ়তার সঙ্গে স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখে চলবে। নবমত, সামাজিক স্থিতিশীলতা অটুট রেখেই সংস্কার ও বিকাশকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাবে চীন। দশমত তথা সর্বোপরি, চীনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমাজতন্ত্র অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সরকার পরিচালনা, দুর্নীতির মোকাবিলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সুনিশ্চিত করার দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেবে। ‘সম্প্রীতিমূলক উন্নয়ন’-এর যে স্লোগান চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দিয়েছিল, এই দশটি নীতি তার সঙ্গে পুরোপুরি সাযুজ্যপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সংস্কারের এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে চীনে। মতাদর্শগত প্রচার যেমন চালানো হচ্ছে, তেমনই আন্তঃপার্টি শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক পড়ুয়াকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও জে দঙের ভাবনা বিষয়ক অন্তত একটি পাঠক্রম নিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে পড়াশোনা করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে মার্কসীয় সাহিত্যের বিক্রিও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমান পুঁজিবাদী সঙ্কট চীনেও প্রভাব ফেলছে, বিশেষত চীনের রপ্তানি ক্ষেত্রে। কিন্তু চীন তার মোকাবিলা করার পদক্ষেপ নিচ্ছে সুদূরপ্রসারী ভাবনা নিয়েই। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে তার টের পাওয়া গেছে গত বছরের বিশ্ব আর্থিক মন্দার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। চীন তার অর্থনীতির জন্য সরকারী কোষাগার থেকে ৫৮৫০০ কোটি ডলার মঞ্জুর করেছিলো। চীনের অর্থনৈতিক বিকাশকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে সে সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ২০০৯ সালে মন্দার দরুন যখন বিশ্বে অর্থনৈতিক বিকাশের হার — ৩ শতাংশ দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা, তখন চীনের ক্ষেত্রে আশা করা যাচ্ছে যে এবছর বিকাশের হার ৭.৭শতাংশে দাঁড়াবে।
চীন উৎপাদনশীল শক্তিসমূহকে দ্রুত সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করছে। সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে সংহত ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তবে এমন কিছু প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে যা সমাজতন্ত্রকে দুর্বল, এমনকি ধ্বংস করতে উদ্যত। ফলে সমাজতন্ত্র বহির্ভূত ধারণা ও মূল্যবোধ মাথাচাড়া দেওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। চীনে যে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নীপুঁজি রয়েছে তা নিশ্চয় সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য মুনাফা লোটা এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করা। অতি মুনাফা অর্জন করার জন্য তারা নিশ্চয় সমাজতন্ত্রকে দুর্বল করা অথবা বানচাল করার চেষ্টা করবে। চীনে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে এটাই হলো লড়াই।
চীনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছি। সমাজতান্ত্রিক শক্তি চায় বিপ্লবী চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বের পয়লা নম্বর দুশমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিক। ভারতকেও শামিল করতে হবে সেই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শিবিরে। এটা আমাদেরও লড়াই।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×