সেদিন বড় বিপদে পড়েছিলেন সি আই এ’র একনিষ্ঠ সেবক অফিসারটি। রীতিমতো গলদঘর্ম হবার জোগাড়। কর্তাদের নির্দেশে একজনকে হত্যা করা হলো। আর তারপর তার দেহ নিয়ে কি করা হবে তাই-ই জানা গেল না। এরপর নিজের গাড়ির পিছনে মৃতদেহ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। শেষ পর্যন্ত কোনো আদেশ আসেনি —কারণ মৃতদেহ সবার সামনে আসলে সকলের বিপদ আবার গোপন করতে গিয়ে ধরা পড়লেও বিপদ। এরপর কি হয়েছিল তা আর জানা না গেলেও হত্যা পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার বিবরণ রয়েছে সি আই এ’র আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ জন স্টফওয়েলের বইতে। তারপরের খবর আর দেননি স্টফওয়েল। তবে সে মৃতদেহ কেউ দেখেনি। তবে ইতিহাস লিখে রেখেছে ঐ দিনই কঙ্গোর জনপ্রিয় জননেতা প্যট্রিক লুলুম্বা নিহত হন ঘাতকের হাতে। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ১৭ই জানুয়ারি ১৯৬১।
ঐ দিন সকালে কঙ্গোর তৎকালীন সামরিক শাসক মোবতু লুলুম্বাকে তুলে দেন কাটাঙ্গার নেতা মোসে টোসেম্বের হাতে। কারণ মোবতু’র উপর চাপ আসছিল এই জনপ্রিয় জননেতাকে মুক্তি দিতে হবে। না হলে অন্তত মানবিক ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু যে সি আই এ লুলুম্বাকে হত্যা করতে নিরাময়হীন এক রোগের বিষ লুলুম্বার দেহে প্রবেশ করাতে দেশের নামজাদা রাসায়নিক বিশেষজ্ঞ ডাঃ সিডনি গটলিবকে দায়িত্ব দেয়, তাদের ইশারায় পরিচালিত এক পুতুল সরকারের নেতা মোবতু কিভাবে মানবিক ব্যবহার করতে পারে? সি আই এ’র তৎকালীন প্রধান অ্যালেন ডালাস নিজে লুলুম্বার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশে সই করেছেন। ১৯৭৫-এ অনুসন্ধানে আরও জানা যায় যে, ডালাস নয় — এই নির্দেশের পেছনে ছিল খোদ মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইজেন হাওয়ার। আর তাই ডালাসের ভাষায় লুলুম্বার হত্যা ছিল ‘‘একটি জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’’ সেই কাজ সমাপ্ত করেছিলেন কাটাঙ্গার নেতা মোসে টোসেম্বে।
জরুরী এই কাজ করে টোসেম্বে কি পুরস্কার পান? ১৯৬৩-তে কাটাঙ্গা প্রদেশে তার নেতৃত্বে চলা বিদ্রোহ দমনে মার্কিন সেনাবাহিনী কঙ্গোর পুতুল সরকারকে বিশেষ সাহায্য করে। কাটাঙ্গাতে টোসেম্বে’র শাসন শেষ হয়। বলা হয় দেশে অনৈক্যের যুগ শেষ করা দরকার। ১৯৬৪-তে লুলুম্বার অনুগামীরা যখন বিদ্রোহ করে তখন আবার টোসেম্বেকে সরকারের প্রধান করা হয়। টোসেম্বেকে আফ্রিকার সবচেয়ে কুখ্যাত আফ্রিকান বলা হয়। লুলুম্বার হত্যার জন্য সারা দেশের মানুষ তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছেন।
বেলজিয়ামের হাত থেকে কঙ্গো স্বাধীন হয়েছিল ৩০শে জুন, ১৯৬০-এ। কঙ্গোর এর আগের ইতিহাস বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক হানাহানি আর রক্তপাতের ঘটনায় পরিপূর্ণ। একদিকে বেলজিয়াম চাইছিল খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ উপনিবেশটি নিজের হাতে রাখতে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভয় ছিল কমিউনিস্টদের নিয়ে। সে আইজেন হাওয়ার, জনসন কিংবা কেনেডি —কেউই এই ভয় থেকে মুক্ত ছিলেন না। সি আই এ’র নির্দেশক এলেন ডালাস সতর্ক করেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে দেশটা কমিউনিস্টরাই দখল করবে। তা সত্ত্বেও যখন লুলুম্বার মতো নেতা গোটা কঙ্গোর ভাঙাচোরা অবয়ব থেকে উঠে এলেন তখন সি আই এ’র হাত দিয়ে দেশে এলো এক লক্ষ ডলার। উদ্দেশ্য লুলুম্বার অপসারণ। লুলুম্বা যে একজন কমিউনিস্ট তা জানিয়ে দিল ওয়াশিংটন পোস্ট।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল — ‘‘কূটনীতিকরা ধরে ফেলেছেন যে, লুলুম্বা কমিউনিস্ট শিবিরে পা ফেলছেন। যেভাবে প্রধানমন্ত্রী নীতি গ্রহণ করছেন তাতে কমিউনিস্টদের প্রভাব স্পষ্ট তা সামান্য ছাত্ররাও ধরে ফেলবেন। এই যে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রধানের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন এটা তো কমিউনিস্টদের চাল। এর প্রভাব তো নিরক্ষর কঙ্গোবাসীর জীবনে পড়ছে। ১৯৭৮-এ কঙ্গোর ঘটনা নিয়ে গঠিত চার্চ কমিটির সামনে সে সময়ের সহ পররাষ্ট্র সচিব ডগলাস ডিলন বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ার মনে করতেন লুলুম্বা বশে আনার মতো মানুষ নন। আর তাই শান্তি ও নিরাপত্তা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের) পক্ষে বিপজ্জনক ব্যক্তি। অথচ এই প্যাট্রিক লুলুম্বা কিন্তু গায়ের জোরে কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী হননি।
১৯৬০-এ রীতিমতো নির্বাচনে তাঁর দল দেশের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তিনি দাবি করেছিলেন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আর তাই চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব। দেশের স্বাধীনতা দিবসে তাঁর ভাষণ ছিল সময়ের নিরিখে রীতিমতো বৈপ্লবিক। ‘‘আমরা ৮০ বছরের পরাধীনতার ইতিহাস জানি। আমরা জানি কিভাবে আমরা কাজ করেছি অথচ ন্যায্য বেতন পাইনি, আমাদের খিদে মেটেনি। নিগ্রো বলে সকাল থেকে রাত আমাদের যে অত্যাচার, মারধর, গালিগালাজ সহ্য করতে হয়েছে তা কখনই ভোলা যাবে না। যারা সে সময় রাজনৈতিক মতপ্রকাশ করেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ঘোষণা করেছেন তাদের কাউকে দেশ থেকে তাড়ানো হয়েছে, বাকিদের সঙ্গে কি অত্যাচার চলেছে তাও অজানা নয়। আমরা এটাই জানতাম যে শহরের বড় বড় বাড়িগুলো তৈরি হয় শ্বেতাঙ্গদের জন্য। আর আমাদের জন্য তৈরি হয়েছে সামান্য ঝড়ে ভেঙে পড়তে পারে এমন সব কুঁড়েঘর।’’ ১৯৬০ সালে এ জাতীয় উচ্চারণ শ্বেতাঙ্গদের ভালোলাগার কথা তো নয়।
আর তাই শুরু হয়ে গেল আগ্রাসন। কঙ্গোর মধ্যে একটা ছোট প্রদেশ কাটাঙ্গা, সেখানে পাওয়া যায় তামা, কোবাল্ট, ইউরেনিয়াম, সোনা এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ। বেলজিয়ামের ইচ্ছা ছিল কাটাঙ্গা একটি স্বাধীন দেশ হোক। তবে সেই সম্পদ সহজেই হাতানো যাবে। তাই কাটাঙ্গাতে মোসে টোসেম্বেকে নেতা হিসাবে হাজির করা হলো। তারা দাবি করলো যে কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনো কর দেবে না। বেলজিয়ামের বাহিনী কাটাঙ্গার বিদ্রোহীদের সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপ করলো। তাকে সমর্থন জানালেন আইজেনহাওয়ার। ইতিহাস প্রমাণ করেছে লুলুম্বার কমিউনিস্ট হওয়াটা যেমন একটা অপরাধ ছিল তেমনি কাটাঙ্গার খনিজ পদার্থের ব্যবসাতে বেশ কিছু প্রথম সারির মার্কিন আধিকারিকদের অংশীদারী ছিল। তাই তাদের একটা প্রভাব বিশেষ কাজ করছিল।
বেলজিয়ামের হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রতিবাদে সরব হয়েছিল কঙ্গো। পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর আফ্রো এশিয়ান ব্লকের অন্য দেশগুলিও। কাজেই রাষ্ট্রসঙ্ঘ সিদ্ধান্ত নিলো বেলজিয়াম নয়, গোটা এলাকায় শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব নেবে খোদ রাষ্ট্রসঙ্ঘের বাহিনী। আর এতেই মার্কিন প্রশাসনের সুদিন ফিরলো। কারণ তৎকালীন রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রধান দাগ হ্যাামারকোল্ডের মার্কিন প্রীতি গোপন ছিলো না। হ্যামারকোল্ড লুলুম্বাকে অপছন্দ করতেন। তাই একাজে মার্কিন বাহিনীর প্রাধান্যে গঠিত তথাকথিত নিরপেক্ষ শান্তিরক্ষকরা একাধারে বিদ্রোহীদের সাহায্য ও অন্যদিকে কঙ্গোর সরকারী বাহিনীকে দমনে লিপ্ত হলেন। সোভিয়েত বাহিনী কোনো কাজের সুযোগ পেলো না। এমনকি কাটাঙ্গাতে আটক কঙ্গো বাহিনী নিজেদের এলাকায় ফেরার সুযোগ পেলো না। জবাব পেলেন না। সোভিয়েত সাহায্য এলেও তিনি রণাঙ্গনে পরাজিত হলেন।
কিন্তু তাতে তো মার্কিন প্রভুদের শান্তি হলো না — তাই শুরু হলো নতুন চক্রান্ত। ৫ই সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জোসেফ কাসাবু লুলুম্বাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কোনো আইনের তোয়াক্কা না করে বরখাস্ত করলেন। লুলুম্বা বেতার ভাষণ দেবার চেষ্টা করলে গোটা বেতারকেন্দ্র রাষ্ট্রসঙ্ঘের বাহিনী ঘিরে রাখলো। লুলুম্বা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সমস্ত নির্বাচিত সাংসদদের সঙ্কটের বর্ণনা দিলেন। বিপুল ভোটাধিক্যে জয়ী হলেন। জনগণের এই জয় মেনে নেয়নি মার্কিন প্রভুরা। তাই তাদের তাবেদার কাসাবুকে দিয়ে কোনো কাজ হলো না দেখে সামরিক বাহিনীর নেতা মোবতুকে দিয়ে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান করিয়ে ক্ষমতা দখল করলো। এটা ১৯৬০-এর সেপ্টেম্বরের ঘটনা।
লুলুম্বা ছিলেন মানুষের নেতা। মানুষই ছিল তার ধর্ম। তাই এর পরের তিনমাস তাকে হত্যা করার নানা পরিকল্পনা বারবার ব্যর্থ হলো। বক্তা হিসাবে লুলুম্বার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তাই আত্মগোপন করা অবস্থাতেও মাঝেমধ্যে ভাষণের মধ্যে দিয়ে দেশের জনতা ও বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মধ্যে তার প্রভাব বাড়তে থাকলো। তাই এলো রাসায়নিক অস্ত্র। তাও প্রয়োগ করা গেল না। ২৪শে নভেম্বর মোবতু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ’র সাহায্যে গ্রেপ্তার করলো লুলুম্বাকে। তারপর বৃদ্ধি হলো মার্কিন চাপ। এবারে তাঁকে হত্যা করা হলো।
লুলুম্বার হত্যা গোপন থাকেনি। গোটা এশিয়া ও আফ্রিকাতে মুক্তিকামী মানুষের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে গেলেন লুলুম্বা। যে মোবতু কায়দা করে তাকে হত্যা করে তাকেই শেষ পর্যন্ত তৈরি করতে হলো শহীদবেদী।
এদিকে দেশের পরিস্থিতি কি হবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় তখন কেনেডি। ১৯৬১-র ২০শে জানুয়ারি লুলুম্বা হত্যার তিনদিন পরে কেনেডির ক্ষমতা দখল। কিন্তু কঙ্গোনীতির বদল হলো না। কাটাঙ্গা নিয়ে শুরু হলো বিতর্ক। লুলুম্বাকে হটাতে জরুরী ছিল কাটাঙ্গার বিদ্রোহ। এখন তো আর কোনো প্রয়োজন নেই। তাই কঙ্গোর অখণ্ডতা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে সেই বিদ্রোহ দমিয়ে দেওয়া হলো। মজার ঘটনা ঘটলো যে বিদ্রোহ দমনে মার্কিন বিমান বাহিনীর সি-১৩০ বিমান বিদ্রোহ দমন করতে গেল। আর বিদ্রোহীদের সাহায্য করলো সি আই এ। এভাবেই একটা নিজেদের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ শেষে কাটাঙ্গার বিদ্রোহীদের পরাজিত করা হলো।
এদিকে লুলুম্বার সহকারী অ্যান্তনিও গেজিঙ্গা আর পিয়েরে মুলেলের গতিবিধি মার্কিন প্রশাসকদের পক্ষে অস্বস্তিকর হয়ে পড়ছিলো। তাই মোবতুকে নির্দেশ দেওয়া হলো লুলুম্বা জামানার উপপ্রধানমন্ত্রী গেজিঙ্গা ও সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুলেলেকেও হত্যা করতে হবে। গেজিঙ্গা একবার গ্রেপ্তার হলেও ঘানায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের বাহিনীর প্রধান কাউমে নাকরমার হস্তক্ষেপে মুক্ত হয়েছিলেন। লুলুম্বার অবর্তমানে গেজিঙ্গা গোটা কঙ্গোতে একটি নিজস্ব সরকার তৈরি করলেন। গেজিঙ্গা নিজেকে লুলুম্বার উত্তরসূরি হিসাবে দাবি করলেন। গেজিঙ্গার পাশে দাঁড়ালো সোভিয়েত ইউনিয়ন।
গেজিঙ্গাকে সামরিক ও আর্থিক দুই সাহায্যই পাঠালো সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু সি আই এ’র নজরে এ খবর আসলে রেড ক্রশের বাক্সে থাকা জাহাজভর্তি কালাশিনোকভ রাইফেল লুঠ হলো। আর সুদানের খাতুম বিমানবন্দরে কঙ্গোর প্রতিনিধির হাতে গেল না সোভিয়েত অর্থসাহায্য। এবারে আর মোবতু নয়। গেজিঙ্গাকে দমন করতে মার্কিন প্রশাসনের ঘুঁটি হলেন সেরিল আডুলা।
সেরিল আডুলাকে নির্দেশ দেওয়া হলো গেজিঙ্গাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। সি আই এ পাঠালো সামরিক সাহায্য, আডুলার সঙ্গে আমেরিকার ও ব্রিটিশ গুয়েনার শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের একটা যোগ ছিল। তাই সংসদে সাংসদদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে গেলেন আডুলা। সি আই এ পরে স্বীকার করে যে এর জন্য সাংসদ কেনার কাজে টাকার জোগান দিয়েছিলেন তারাই।
১৯৬২-র জানুয়ারিতে আডুলার সমর্থনে এলো বিরাট সংখ্যক মার্কিন বাহিনী। স্ট্যানলিভিলে থেকে অপসারিত হলেন গেজিঙ্গা। সি আই এ কর্তা অ্যালেন ডালাস জানালেন আপাতত কঙ্গোতে সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধ করা গেছে।
কিন্তু দেশের মানুষ —তারা পুতুল সরকারের শাসন ও অত্যাচারে বিরক্ত। ১৯৬৪-তে আবারও লুলুম্বা ও গেজিঙ্গার অনুগামীরা একত্রিত হতে শুরু করলেন। মার্কিন বাহিনী এলো পুতুল সরকারকে রক্ষা করতে। এবারে শুধু বাহিনী নয়, এলো মার্কিন প্যারামিলিটারির দল। এরা দেশের পূর্বপ্রান্তে শুরু করলো অভিযান — লক্ষ্য বিদ্রোহীদের দমন করা।
সরকারের প্রধান তখন সেই লুলুম্বার হত্যাকারী তোসেম্বে। মার্কিন প্রশাসন বুঝে গেছে নৃশংস তোসেম্বে ছাড়া আর কেউ বিদ্রোহ দমন করতে পারবে না। হোক না সারা আফ্রিকাতে সবচেয়ে কলঙ্কিত আফ্রিকান— তোসেম্বে তখন মার্কিন সরকারের প্রিয়জন। ভাড়াটে সৈন্য, বে অফ পিস, রোডেশিয়ান কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ সেনারা এলো কঙ্গোয় নেতা তোসেম্বে, পিছন সি আই এ। সি আই এ নিজস্ব বিমানবাহিনী তৈরি করলো। যে কোনো সময়ে তারা হামলা চালাতো কঙ্গোর আকাশে, মাটিতে। সি আই এ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে প্রশংসিত হলো।
নিন্দায় সরব হলো চীন। সে সময় অবশ্য সরাসরি অস্বীকার করলো আমেরিকা, জানালো তারা কাজ করছে কঙ্গো সরকারের নির্দেশে। আর কাদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ? বিদ্রোহীদের কোনো স্বীকৃত নেতা নেই, নেই কোনো মতাদর্শ। রয়েছে হাজারো বিতর্ক। আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ ক্রফোর্ড ইয়ং জানিয়েছেন সে এক হতাশার সময়। চারদিকের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন দেশের উঠে দাঁড়াবার শক্তি তখন শেষ। এর সঙ্গে যুক্ত হলো কুসংস্কারগ্রস্ত কিছু ব্যক্তি। এরা ধর্মের নামে নানা বুজরুকি, ডাইনী প্রথা, প্রেতচর্চাকে জনপ্রিয় করতে উদগ্রীব। কেউ কেউ এমন বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে ম্যাজিক দিয়ে বুলেট ঠেকানো যায়। মুলেলের অবস্থা এক পথভ্রষ্ট নেতার চেয়েও করুণ। নিজের মূত্র পান করিয়ে তিনি সেনাদের দীক্ষা দিতেন। এতে তারা নাকি বুলেট-এর আঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। এহেন হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়ে দিলো বিদ্রোহীদের মতাদর্শ ও কর্মসূচী সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও অন্তঃসারশূন্যতার কথা। এটাই তো চাইছিল তারা।
এরমধ্যে বিদ্রোহীদের এলাকায় বন্দী ছিলেন ৩ হাজার শ্বেতাঙ্গ সেনা। বিদ্রোহীদের নেতা ক্রিস্টোফার গিবেনে চুক্তি করে মার্কিন বোমাবর্ষণ বন্ধ করার শর্তে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। হঠাৎ করেই ১৯৬৪-র ২৪শে নভেম্বর সকালে কয়েকটি মার্কিন সামরিক বিমান থেকে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার উপর নেমে এলো ৫০০ বেলজিয়ামের প্যারাট্রুপার সৈন্য। এরপরের ঘটনাক্রম সম্পর্কে কেউ পরিষ্কার কোনো কথা বলতে পারেননি। তবে জানা যায় যে, ২০০০ শ্বেতাঙ্গ বন্দী সৈন্য মুক্ত হয়। ১০০ জন নিহত হয়, মার্কিন প্রচার মাধ্যম অত্যন্ত মানবিক প্রয়োজনে সংগঠিত এই অভিযানের খবর ফলাও করে প্রচার করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রচারে বিদ্রোহীদের অত্যন্ত কদর্য ভঙ্গিতে নিন্দা করা হয়েছিল। কিন্তু প্যারাট্রুপারদের বাহিনী বন্দী সেনাদের মুক্তির পাশাপাশি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিল তা প্রচারের আলো দেখেনি। সেটি হলো বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বহিরাগত সৈন্যরা নিজেদের দখল কায়েম করে ও সেই পথে তোসাম্বের ভাড়াটে গুণ্ডার দল দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে। তারা যখন স্ট্যনলিভিলা শহর দখল করে তারপরের পর্ব ভয়াবহ রক্তাক্ত। অবাধ লুণ্ঠন ও নৃশংস হানাহানির সে পর্ব অবশ্য পশ্চিমী প্রচারমাধ্যম প্রচার করেনি।
তারা প্রচার করেছিল ‘মানবিক’ তোসাম্বের ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারে তোসাম্বের দাবি ছিল এক নতুন উন্নতির যুগের সূত্রপাত হয়েছে কঙ্গোর বুকে। বিনিয়োগকারীরা প্রচুর মূলধন নিয়ে এসে পড়েছেন। আর লন্ডনের দি টাইমস পত্রিকা যে দিন এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে সেদিনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানির সরকাররা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঙ্গোকে প্রাধান্য দেবার ঘোষণা করে।
কঙ্গোর গেরিলা যোদ্ধাদের পাশে ১৯৬৫ সালে এসেছিলেন শতাধিক কিউবার বিপ্লবীরা। কিন্তু মাসখানেক সে দেশে থাকার পর বিপ্লবীদের মধ্যে প্রকৃত মতাদর্শগত দিশা ও অন্তঃসারশূন্যতা প্রত্যক্ষ করে ফিরে যান চে গুয়েভারা স্বয়ং।
লুলুম্বা, গেজিঙ্গা কিংবা স্ট্যানলিভিলার বিপ্লবীদের রক্তে রাঙা তোসেম্বের পরিণতি নিয়ে নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে — ১৯৬৫-র নভেম্বর মাসে লুলুম্বাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানের নাটক করে মার্কিন মদতে কঙ্গোর ক্ষমতা দখলকারী মোবতু তোসেম্বে ও কাসাভুকে ক্ষমতাচ্যুত করে কঙ্গোর শাসক হন। এবারে আর তিনি সামরিক মুখোশ পরেননি একেবারে নাম বদল করে হন মোবতু সেসে সেকো।
এতসব লড়াই-এর পর জিতল কে? লুলুম্বা জিতেছিলেন মানুষের হৃদয়। কিন্তু ক্ষমতা দখলের লড়াইতে তিনি পরাজিত। পরাজিত গেজিঙ্গা কিংবা তারপরের বিপ্লবীরাও। তবে কি জয়ী মোবতু কিংবা তোসেম্বে? না তোসেম্বে বারবার ব্যবহৃত হয়েছেন ও স্বদেশে নিজের স্বজনকে হত্যা করতে তার হাত কাঁপেনি। আফ্রিকার মানুষের কাছে তিনি চরম ঘৃণার পাত্র হয়েছিলেন। তাই বলে মার্কিন প্রশাসনও তাকে আশ্রয় দেয়নি। প্রয়োজন শেষ হলেই তাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে তারা দেরি করেনি। মোবতু একবার নয়, দু’বার মার্কিন প্রশাসকদের অনুগ্রহভাজন হতে পেরেছিলেন — শর্ত ছিল দেশের বিষয়ে তাদের নীতিকেই নিঃশর্তভাবে মেনে চলতে হবে। তিনি পুতুল সরকারের বড় পুতুল হিসাবে শাসনক্ষমতা ভোগ করেছিলেন। তবে? জিতল কে?
জিতলো সি আই এ’র বলে বলীয়ান মার্কিন প্রশাসন। পুরস্কার ক্রম এক —একটা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ অবাধে লুঠ করার অধিকার। পুরস্কার ক্রম দুই — চিরতরে মতাদর্শগতভাবে বিরোধী এক সাম্যবাদী চেতনার কণ্ঠরোধ করতে পারা। কমিউনিজম প্রসার সে মহাদেশে আমেরিকার আনাগোনা এতোটা অবাধ হতে দিতো না। তাই তো রাষ্ট্রপতি বদল হলেও মার্কিন প্রশাসনের কঙ্গো দখলের মূল লক্ষ্য কখনই পরিবর্তিত হয়নি। এ জয় সি আই এ’র জয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



