শুরুটা কীভাবে করব বুঝতে পারছি না শুধু জানি 'স্পর্শ' ব্যাপারটাতে আমার একটু এলার্জি আছে- তা ছেলে-মেয়ে যে কেউই হোক না কেন। রিকশায় উঠতে কারো সাথেই আপত্তি নেই কিন্তু দেখা যায় দুজনের মাঝে কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা, তা সে আমার ভাই ই হোক বা প্রাণের বন্ধু প্রিয়াংকা। ভাবলে এখনো হাসি পায় সেই কয়েক ইঞ্চি ফাঁকাটা রাখে নি বলে এক বন্ধুকে রিকশা থেকে নামিয়ে দিয়েছিলাম
আমার ছোট্ট ভাগ্নেটাকে দেখলে আমার এত্ত আদর লাগে মনে হয় ওকে পাঁজরের সাথে মিশিয়ে ফেলি। ইচ্ছে থাকলেও আলতো করেই ওকে কোলে নিই, অনেক সময় ভয়ে নিইও না, যদি ফেলে দিই! অথচ এখন বুঝতে পারি ছোটবেলায় আমাকে বাবা তার পাঁজরের সাথে মিশিয়ে কেন আদর করতেন, মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম বাবার দাড়ির খোঁচাতে। আমি কান্না করলেই বাবা জোরে চেপে ধরতেন আমাকে তার বুকে, আর আমি আরো জোরে কেঁদে উঠতাম তার দাঁড়ির খোঁচা খেয়ে।
রক্তের সম্পর্কের কি আসলে কোন ব্যাপার আছে এই 'স্পর্শ' নামক ব্যাপারটার সাথে? আমার ভাই কি আমাকে মাথায় হাত রেখে আদর করেছে বা জড়িয়ে ধরেছে! একটা ঘটনা ছাড়া মনে পড়ে না, ওর সাথে আমার মনের দূরত্ব এত বেশী যে শরীরের দূরত্ব কমে নি। শুধু আমার মেজো দুলাভাই যখন মারা যায়, আমি ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম জীবনে প্রথমবার। একই রক্ত আমাদের কাছে আনতে পারে নি, কিন্তু তীব্র দুঃখের সেই অনুভূতি আমাদের মধ্যের দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল। অথচ আমার মেজো দুলাভাই ছিল সত্যিকার অর্থেই আমার বড় ভাই, মফস্বল থেকে ঢাকা শহরের হোস্টেলে থেকে পড়ার সময়ে নিয়মিত আমার খোঁজ-খবর রাখা আর তার কাছেই আমার বায়না থাকত- আমি হোস্টেলে থাকব না। একই রক্তের চেয়ে একই আত্মা মনে হলো বেশী স্পর্শের দাবীদার।
ক্লাশের কোন পার্টিতে যখন ফটোসেশন চলত- সবাই খুব কাছাকাছি হয়ে ছবি তুলছে আমি একটু অবাকই হতাম। কপাল কুঁচকিয়ে তাকাতাম শরীফ সজলের দিকে ক্লাশের প্রত্যেকটা মেয়ের কাঁধে হাত রাখা (আমি বাদে) যার ছবি আছে কারণ ওর সাথে ক্লাশের সবার সু-সম্পর্কটা আমার অবিদিত ছিল। অথচ সেদিন তো অবাক হই নি যেদিন ওর হাতে একটা দাগ দেখে ছোয়াচে রোগ আছে বলে ওর হবু বউ আর আমি ক্ষেপাচ্ছিলাম- বিদায় নেওয়ার সময় ও হাতের ওই দাগওয়ালা জায়গাটা আমার হাতে ঘষে নে, এবার তোরও হবে বলে আমার লাত্থি থেকে বাঁচার জন্যে আগেই দৌঁড় কারণ ততোদিনে আমরা খুব ভালো বন্ধু
ইট-কাঠের জঞ্জাল আর গাড়ীর কালো ধোঁয়া ভর্তি এই ঢাকা শহরে কাজের চাপে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, হাজারটা সাবমিশনের ঠেলায় যখন দিন-রাতের ফারাক ভুলে যাই, ছুটিগুলো মাঠে মারা যায়- মনে হয় একটুখানি শান্তি মিলবে মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে পারলে। ছোটবেলার দমবন্ধ করা পাঁজরে মেশানো বাবার আদরের জন্যে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে সেই ছোট্ট শহরটাতে। একই রুম নিয়ে আমাদের দু ভাই বোনের শীতল যুদ্ধের মীমাংসা না হওয়ায় ঢাকা থেকে দুজন একসাথে গেলে আমার ভাই বাবাকে আর আমি মাকে জড়িয়ে ঘুমাই দু রুমে, যদিও অন্য রুমগুলো খালিই পড়ে থাকে। কিছুদিন আগে আমার ভাই বিয়ে করায় তো আমার জন্যে আরো ভালো হয়েছে- অর্ধেক রাত মাকে আর বাকী অর্ধেক রাত বাবাকে জড়িয়ে ধরে তাদের মাঝখানে আমি শান্তির ঘুম ঘুমাই। আমার কাজিনকে দেখেছি বাবার সাথে অনেক দূরত্ব তার, আর সে দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে- খুব খারাপ লাগে আমার অথচ বাবাই আমার আর আমার ভাইয়ের অনেক কাছের বন্ধু। হয় তো শুধু বাবা বলেই নয়, বন্ধু বলেই আমরা বাবার এত কাছাকাছি।
ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদের নিরীহ বইগুলো পড়েও আমি ঘৃণায় মুখ কুঁচকে ফেলতাম। প্রেম ব্যাপারটা স্থূলভাবে যেসব ভারতীয় লেখকদের বইয়ে আসত তাদেরকে নির্বাসনে দিয়েছিলাম। অথচ কালবেলা- কালপুরুষ পড়ে অনিমেষ আর মাধবীলতার প্রেমে পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল ওদেরকে বিয়ের কথা বলা যেন ওদের ভালবাসাকেই অবমাননা করা।
বাবা-মা আর আমার ভাই-বোনগুলো আমায় খুব ভালভাবে চেনেন বলেই বিয়ের কথা কিছু বলেন না (মাঝে মাঝে আকার-ইঙ্গিতে কিছু বলার চেষ্টা করলে আমার হেসে উড়িয়ে দেওয়া বা গম্ভীর হয়ে যাওয়া দেখে চুপ করে যান), কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের জ্বালায় যখন ওদের বলি- দোস্ত, জামাই না প্রেমিক খুঁজে দিলে আমি রাজী (ওরা প্রথমে সিরিয়াসলিই নিয়েছিল- ভেবেছিল প্রেম করলে বিয়ে কি আর করব না! বোঝে নি যে এটা ওদের জন্যে একটা ফাঁদ ছিল)। শর্ত হলো- বিয়ে করব না আর জানিসই তো স্পর্শে আমার এলার্জি। বোকা ছেলেমেয়েগুলো তারপরও লাফালেও অনেকে ঠিকই বুঝেছিল- থিওরেটিক্যালী এটা সম্ভব হলেও প্র্যাকটিক্যালী কখনোই নয়। এরেঞ্জ করে 'কবুল' বলা সম্ভব হলেও ভালবাসার এজহার করা মনে হয় সম্ভব নয়- এতদিন প্রেম করেও এই ফাঁকটাই ওরা ধরতে পারল না! খুঁজে খুঁজে মিলিয়ে বর পাওয়া সম্ভব ওদের পক্ষে, কিন্তু আমি ভালবাসতে না পারলে ওরা আমার জন্যে ভালবাসার মানুষ খুঁজে এনে দিবে কী করে!স্পর্শ আর বিয়ে তো অনেক দূরের ব্যাপার। খুব ভালো বন্ধু না হলে হয় তো প্রেমিক/প্রেমিকাও হওয়া যায় না।
ইদানীং বন্ধুদের দেখছি বিয়ের জন্যে পাত্রী খুঁজছে, ছাত্রজীবনে প্রেম না করার খেসারত হিসেবে এখন এরেঞ্জড ম্যারেজ; মাথায় কিছুতেই আসে না কীভাবে সম্ভব এভাবে একই মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া। বিয়ে তো শুধু শারীরিক চাহিদা পূরণই নয় (ইদানীং অনেককে বলতে শুনি এই কারণেই তারা বিয়ে করবেন যেহেতু মনের সন্ধান এখনো তারা পান নি! যার মনের কাছে যাওয়া যায় নি তার............!!!), একজন মানুষকে আমৃত্যু ২৪ ঘন্টার সংগী করা, হরিহর আত্মা না হলে তা কীভাবে সম্ভব! কেউ মনের খুব কাছাকাছি আসলেই হয় তো তাকে ছুঁয়ে দেখা যায় বা সেই স্পর্শের মাঝে শান্তি পাওয়া যায়- যা মানুষ বাবা-মায়ের কাছে পায়, পায় বন্ধুর কাছে, ভালবাসার মানুষের কাছে, সন্তানের কাছে।
(হাজারটা কাজে অমানুষিকভাবে ব্যস্ত আমার কাজের চাপ যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, কোনটাতেই আর মনোনিবেশ করতে পারি না। ফলশ্রুতিতে উলটা-পাল্টা চিন্তাভাবনা এবং আবোল-তাবোল পোস্ট। পোস্টে মন্তব্য করলে খুশী হব- কিন্তু নেতিবাচক মন্তব্য ইতিবাচকভাবে নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা আমার এখন নেই, শুধু মাইনাস দিলেই বুঝব পছন্দ হয় নি।)
ছবির মানুষঃ আমার ভাগ্নী ও ভাগ্নে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

