প্রাচ্যের অক্সফোর্ড থেকে ফাট্টাফাট্টি রেজাল্ট নিয়ে পাশ করে মুশতারী এখন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে। নতুন চাকুরীতে ঢুকল মাত্র, তাই একটু অগোছালো অবস্থায় আছে; সবকিছু বুঝে নিতে সময় লাগছে বেশ। সারাদিনের পরে রাতে ফিরে এসে এত ক্লান্ত থাকে ইদানীং যে বাসার কাউকে সময় দিতে পারছে না, সময় পাচ্ছে না নিজের ব্যক্তিগত কাজ-কর্ম বা চিন্তাভাবনার জন্যেও। এর মাঝখানে মা সাহেরা খান শুরু করেছে যন্ত্রণা-
চাকুরী তো হয়েছে, এবার বিয়ে কর। আর কতদিন অপেক্ষা করব আমি?
পাস করার পর থেকে মায়ের একটাই কথা- বিয়ে কর। দেশের বাইরে মাস্টার্সের জন্যে এপ্লাই ই করতে দিল না, একা যেতে দিবে না কিছুতেই শুধু ঢাকায় একা চলাফেরায় সাহেরা মুশতারীকে বাধা দেন না এখন আর।
মাঝে কিছুদিন সাহেরা খান চুপ ছিলেন, মেয়ের হতাশা দেখে যখন রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে বাঘা বাঘা মামা-চাচার অভাবে ওর চাকুরী হচ্ছিল না, অথচ ওর থেকে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা ওরই চোখের সামনে নানা জায়গায় ঢুকে যাচ্ছিল সরকারী উচ্চমহলে জানাশোনার কারণে। মামুর জোর না থাকার কারণে বা থাকলেও সেই ইচ্ছেটা না থাকার কারণে চাকুরী পাওয়ার আগে একটা বছর ওকে সার্টিফিকেট বোঝাই ফাইলটা নিয়ে এ অফিস থেকে ও অফিস দৌঁড়াতে হয়েছে, ইন্টারভিউতে বসতে হয়েছে পোশাক-আসাকে ফিট ফাট হয়ে- ভাল রেজাল্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন'স এওয়ার্ড কোন কাজে আসে নি।
যা হোক, অবশেষে সবুরে মেওয়া ফলল; এখন মুশতারী সামনের দিনগুলো নিয়ে ভাবতে চায়, প্ল্যান করতে চায় সুন্দরভাবে। জীবন যদিও পরিকল্পনামাফিক চলে না, কিন্তু একটা উদ্দেশ্য না থাকলে তো সামনে আগানো যায় না। এর মাঝে বিবাহ নিয়ে মায়ের সাথে চিল্লা-পাল্লা হয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এমন না যে ও বিয়ে করতে চায় না, শুধু একটু সময় নিয়ে ভাবতে চাচ্ছিল। এর মাঝেই একদিন ওর বড় খালা আর খালু এসে বাসায় হাজির, ওর চাকুরীর খবরে গিফট নিয়ে- সাথে ওর জন্যে কেমন বর খুঁজবে সেই পছন্দ-অপছন্দের তালিকা নিতে।
ছুটির দিনের হাজারটা খুটিনাটি কাজ বাদ দিয়ে ও বসল ইন্টারভিউ প্রদানে- এক ধরনের সাক্ষাৎকারই বটে!
খালা-খালু মিলে বিবাহের উপকারিতা এবং এই বয়েসটাই যে বিবাহের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এই বিষয়ের উপর একটি নাতিদীর্ঘ উপক্রমণিকা দেওয়ার পর বললেন-
খালাঃ তোর কী রকম ছেলে পছন্দ বল- ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, কর্পোরেট অফিসার? তোর খালু কে তো চিনিস, যে রকম বলবি ফিট করে দেবে।
মুশঃ (মানুষ কেন জিজ্ঞেস করে না সৎ পাত্র না ঘুষখোর? সাংবাদিক বা চিত্রশিল্পী এরাও বাদ যায় দেখি লিস্টি থেকে
খালাঃ (বিরক্ত হয়ে) দেখ মুশ, ফাজলামো করবি না। অনেক হয়েছে- এবার মা-বাবাকে একটু শান্তি দে। ছোট বোনটার বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে সে খেয়াল আছে?
মুশঃ তুমি ভাবছ কেন আমি ফাজলামী করছি। পাত্র বলতেই তোমরা কেন শুধু ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ারই বোঝ? আমি তোমাদের মতো করে বুঝতে পারি না।
খালাঃ (একটু হতাশ) আচ্ছা যা, তুইই বল তোর কেমন পাত্র চাই- ফর্সা না শ্যামলা? তুই নিশ্চয়ই বাট্টু ছেলে পছন্দ করবি না। তোর তো আবার মুছিয়াল একদমই পছন্দ না।
মুশঃ (হাসতে পারছে না যদিও ওর প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে) ধর, আমি কালো-বাট্টু-মেছো চ যা তা দেখতে একটা ছেলেকে পছন্দ করলাম, তোমাদের আপত্তি হবে না তো?
খালাঃ (একটু টাশকি খেয়ে) তোর পছন্দ আছে না কি? থাকলে বল, কিন্তু এ কেমন কথার ছিরি! বালাই ষাট, তুই তো দেখতে খারাপ না।
আসলেই তো ভাবার বিষয় মুশতারী কেমন ছেলে চায়! ভার্সিটি লাইফে যে কয়বার হৃদয়ে দোলন লেগেছিল তারা কেমন ছেলে ছিল! মুশতারী কাউকে পছন্দ করলেই কি ওর বাবা মা মেনে নিত?- নিত না; তখন তো সাহেরা খানের সব কিছুতেই কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল- ভার্সিটিতে ছেলে বন্ধুদের সাথে বেশী আড্ডা দেওয়া যাবে না, রিকশায় চড়া যাবে না, বাসা থেকে মুখ গুঁজে বই নিয়ে যাবে, ক্লাশে ঢুকবে আর বের হয়ে সোজা বাসায় চলে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যে ছেলেটির প্রেমে পড়েছিল বলে ওর মনে হয়েছিল- সে রজত, খুব ভালো বন্ধু ছিল ওর, সারাক্ষণই একসাথে ঘুরত; তাই রাতে বাসায় ফিরে নানান কিছুতে রজতকেই মনে পড়ত। রজতের সাথে অনেক কিছুই শেয়ার করত- ও বলেছিল,
তুই অহনার সাথে ঘুরলে তোর অহনার কথাই মনে পড়ত; তার মানে কি তুই অহনার প্রেমে পড়েছিস? এটা সাময়িক একটা ইনফ্যাচুয়েশন; ঠিক হয়ে যাবে আর ঠিক না হলে পরে দেখা যাবে।
রজত খুব সুন্দর করে কথা বলত আর প্রচুর বই পড়ত বলে ওর যে কোন বিষয়ে দখল ছিল খুব ভালো, ব্যাপারটা আর গড়ায় নি বেশীদূর- আসলেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল কিছুদিন পরেই, ওরা এখনো ভালো বন্ধু।
দ্বিতীয় ঘটনাটি অবশ্য অনেকদূর গড়িয়েছিল- সারাদিন ভার্সিটির পর সারা রাত জেগে সেই ভার্চুয়াল কথোপকথন, নেশা হয়ে গিয়েছিল ওর। একদিন অতুল অনলাইন না হলেই ওর মাথা খারাপ লাগত, অস্থির হয়ে কোন কাজই করতে পারত না। অতুল খুব কম কথা বলত কিন্তু ওর সেন্স অব হিউমার ছিল খুব ভালো, বেশী কথা বলত মুশতারীই আর ওকে রাগিয়ে খুব মজা পেত অতুল। ওদের দুজনের জীবন দুই দিকে প্রবাহমান নদীর মতো - মেরিন এঞ্জিনিয়ার অতুল একজন গৃহিনী বউ চেয়েছিল যে তার অনুপস্থিতিতে তার বাবা-মায়ের সাথে থাকবে, খুব সুন্দরী না হলেও ক্ষতি নেই, খুব ব্রিলিয়ান্ট মেয়েও চায় নি। আর অন্যদিকে লেখাপড়ায় দুর্দান্ত মুশতারীর জীবনে চাওয়া অন্যরকম, একাডেমিক লাইনে সে সুউচ্চ জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে- ভাবে পি এইচ ডি টা করবে বাইরের ভালো একটা ভার্সিটি থেকে- জানত অতুল। মুশতারী কোন দিন জানতে পারে নি অতুলের মনে ওর জন্যে কোন জায়গা ছিল কী না, যে অনুভূতির কোন পরিণতি নেই সে অনুভূতি প্রকাশ করে নি ওরা কেউই। তবে ভার্চুয়াল জগতের অতুলের সাথে সামনাসামনি দেখা অতুলকে মেলাতে কষ্টই হয়েছে ওর; হয় তো অতুলেরও হয়েছে- তাই সে দেখা করার ঘটনার পর থেকে আর যোগাযোগ করে নি ওর সাথে শুধু ও বাসায় ঠিকমতো পৌঁছুল কি না সেটা জানতে চাওয়া ছাড়া।
এখনো ভুলতে পারে নি মুশতারী অতুলকে, হয় তো হঠাৎ করে কিছু না বলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার কারণেই আরো বেশী মনে পড়ে ওকে। বিষন্ন মুশতারীর হুশ ফিরে এল বড় খালার চিৎকারে।
খালাঃ কী ব্যাপার! বড়দের তোরা ইদানীং কালের ছেলেমেয়েরা একদমই পাত্তা দিতে চাস না; আমি যে এতক্ষণ ধরে এত কথা বললাম- জবাব দিচ্ছিস না কেন?
মুশঃ আমার কেমন ছেলে চাই জানলেই তুমি খুশী তো? কাগজ- কলম কই? বলছি, লিখে নাও। এক...
মুশতারীর লিস্টটা খুব ছোট, বড় নয়- ছেলের থাকতে হবে
১। গভীর জ্ঞান (তার মানে ভাল ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় সার্টিফিকেট নয়, যদিও পড়াশোনার ঊর্ধগতির সাথে মানসিকতার ঊর্ধগতির একটা সম্পর্ক আছে- বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তা কাজ নাও করতে পারে)
২। সুন্দর মানসিকতা (নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের কাজকে ও অন্যকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা- ভাল অঙ্ক জানা মানেই যে ভাল মেধা নয়, যে অঙ্কে ভাল সে যে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো ছবি আঁকতে পারে না সে ক্ষেত্রে তার ধী যে একজন চিত্রশিল্পীর চেয়ে কম এটা স্বীকার করা এবং যে কোন পেশার মানুষকে শ্রদ্ধা করা মাই কোন রিকশাওয়ালাকে ও)
৩। তীক্ষ্ণ সেন্স অব হিউমার (হাস্যরস বোঝার ক্ষমতা, মাঝে মাঝে তা করারও; জীবনটাকে জটিলভাবে না নিয়ে হালকা ভাবে তা নিতে পারার গুণ)
৪। লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট- সততা (সৎ চিন্তা, সত্য কথন,.........)
বাস এইটুকুই-
এই বলে মুশতারী ওর খালা আর খালুর দিকে তাকাল। হলি ফ্যামিলির ডাক্তার দুজনই, ওদের ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ওর শেষ কথা ছিল-
আর যদি এপেয়ারেন্স এর কথা বলো, তাহলে থাকতে হবে এটিচ্যুড- ভয় পেও না- পজিটিভ অর্থে, মানে নিজেকে ও নিজের চিন্তাভাবনাকে সুন্দর করে প্রকাশ করার ক্ষমতা যা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতে পারি আর নিজে যেন কম কথা বলি, দেখেছই তো আমার ইদানীং বেশী কথা বলতে ভালো লাগে না। অবশ্য এটা কম্প্রোমাইজ করা যেতে পারে আগে বলা চারটা থাকলে- আর শোন কালা-ধলা, ল্যাংড়া-লুলা, বাট্টু-লম্বা এসবে আমার কিছু আসে যায় না, তবে মোটা না হলে ভালো, মোটা মানুষ দেখলেই আমার গা গুলোয়।
এই বলে ও খালা-খালুর ঝুলে পড়া চোয়ালের সম্মুখ দিয়ে হেঁটে রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। অনেকটুকু সময় নষ্ট হয়ে গেছে এত্ত সাধের ছুটির দিনটার.........
বিঃদ্রঃ পাঠক ভাববেন না যে ও বিয়ে করতে চায় না বলে এরকমভাবে বলেছে, ও আসলে এরকম ভাবেই দেখতে চায় ওর লাইফ পার্টনারকে।
(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা আমার খুব কাছের এক জন বন্ধুর জীবনের ছায়া অবলম্বনে রচিত; নামগুলো এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাও কাল্পনিক। ছোটগল্প লিখতে চেয়েছিলাম, অথচ লিখতে গিয়ে একটা বিশাল গরু রচনা লিখে ফেললাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


