সেঃ কেমন আছ?
আমিঃ সত্যি সত্যি জানতে চাও কেমন আছি, না কি দায়সারা ভালো-মন্দ উত্তরটা চাও?
সেঃ এ আবার কেমন কথা! বেশ কদিন পর কথা হচ্ছে- সত্যিই জানতে চাই কেমন ছিলে এ কদিন?
আমিঃ তাহলে বলো কোনটার কথা বলব- মন? না শরীর?
সেঃ দুটোই (মাথা গরম না করে যথাসম্ভব নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে উত্তরটা আসল মনে হয়!)।
আমিঃ শরীরের কথাই আগে বলি- সপ্তাহখানেক ধরে একটু সর্দি-জ্বরের উপদ্রব, গত দুতিন দিন ধরে কন্ঠে চন্দ্রবিন্দুর আধিক্য বাদে ভালোই আছি।
আর ম-ন? ওটা ঠিক এমনভাবে বলা যায় না।এই যেমন একটু আগেও ভালো ছিলাম না- যদি দেখি নরসিংদীতে রেল দুর্ঘটনায় বার জনের মৃত্যু, আমি কি ভাল থাকতে পারি? আবার ধরো, এই যে তোমার দেখা পেলাম বেশ কিছুদিন পর- মনে তো ভালোই লাগছে, হয় তো তোমার সাথে কথা বলতে বলতেই আবার কোন এক জানা বা অজানা কারণে মনটা খারাপ হয়ে যাবে, আরো বেশী ভালোও হয়ে যেতে পারে।
আমার ছোটবেলার এক বান্ধবী (লোকে তাকে বলত বহুরূপী- তার না কি মন বোঝা যেত না!) আমায় বলতো-
আকাশের তারা আর মানুষের মন
মিনিটে মিনিটে হয় পরিবর্তন
ছোটবেলায় আমি বিশেষ গবেট ছিলাম তাই এই কথাটার মানে তখন বুঝতাম না, আসলে নিজেকে তখনো বুঝতে শিখি নি, মন নামক জিনিসটা কী জানতাম না। যেদিন মনটাকে শরীর থেকে আলাদা করে বুঝতে শিখেছি, অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি- 'কেমন আছ?' প্রশ্নটা খুব সহজ কিন্তু এর জবাব দেওয়াটা খুবই কঠিন, উত্তর দিতে গিয়ে বার বার থমকে গিয়েছি; কয়েক মুহূর্ত ভেবেছি অনেকের মতো চট করে মুখে হাসি এনে বলতে পারি নি- ভালো আছি, খুব সহজে 'ভালো নেই'ও বলা যায় না; কখনো কুল-কিনারা না পেয়ে বলেছি- জানি না! হয় তো একটা সহজ 'ভালো আছি' অনেকগুলো 'ভালো নেই' বা 'জানি না' এর জবাবদিহিতা থেকে মুক্তি দিতে পারত!
যাই হোক, মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাওয়ায় দুঃখিত। হ্যা, গত কয়েকদিন কেমন ছিলাম মনের দিক থেকে!- ওই যে বললাম মনের পরিবর্তন হয় মিনিটে মিনিটে তাই কয়েকদিনের হিসেব দেওয়া একটু কষ্ট।
সাধারণভাবে বলা যায়- একদিন তো খুব পার্টি করে আসলাম বন্ধুদের সাথে, মনটা ভালোই ছিল অথচ বাসায় এসেই সামুতে একটা পোস্ট দেখলাম বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস নিয়ে- মনটা খারাপ হয়ে গেলঃ কী দুর্ভাগা জাতি আমরা বলো! দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই দেশের রত্নদের হারিয়ে এতীমের মতো যাত্রা শুরু করলাম, পদে পদে হোঁচট খেতে খেতে এখন যেন আর উঠে দাঁড়ানোরই শক্তি নেই।
আর সেদিন ভাবলাম- ভালো থাকব, ভালো থাকব আর তাই শাহরুখ নিয়ে যত ক্যাঁচাল সব কিছু থেকে কান সরিয়ে রেখেছি, ভুলেও মাথায় ঢুকতে দিই নি শাহরুখের এক কণাও- তারপরেও দিন শেষে মন খারাপ হয়েই যায় যখন ভাবি শীতবস্ত্রের অভাবে প্রচ্চন্ড শীতে এই একই দেশের উত্তরদিকের মানুষগুলো মারা যায়!
তারপর একদিন বন্ধুদের সাথে বেরুলাম রাতের ঢাকা ঘুরতে, গাড়ীতে উচ্চস্বরে রেডিও এফ এম- সব্বাই কত্ত খুশী, আমিও কিন্তু এরি মাঝে রেডিও জকির বাংরেজী কথা শুনে আমার আবার মন খারাপ! আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসই করে যাবো আমরা কিন্তু বাঙ্গালী বাংলাকে ভালবাসতে ভুলে গেছে, শহীদ মিনারে পোষাকী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাঝেই বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে সীমাবদ্ধ রেখেছে!
তবে পরিসংখ্যান বলছে, আমার মন এ কদিন বেশীর ভাগ সময়ই খারাপ ছিল, শরীরের মতোই!
সেঃ ডাক্তার দেখিয়েছ? (আমার জন্যে উদবিগ্ন বোঝা যায়!)
আমিঃ কীসের ডাক্তার? শরীরের না মনের?
সেঃ উফফ! (এবার মনে হয় রেগে গেছে!)
আমিঃ (পাত্তা না দিয়ে) শরীর আর মন দুইই যেহেতু খারাপ ছিল- ডাক্তার তো দুটোরই দেখানো দরকার ছিল- কী বলো? কিন্তু ব্যাপার দেখ, বাঙ্গালী যত তাড়াতাড়ি শরীরের অসুখটা বোঝে, মনেরটা বোঝে না! তাই এ দুর্ভাগা জাতির মনের ক্যান্সার একদম অনিরাময়যোগ্য পর্যায়ে চলে গেছে।
আবার দেখ, মনের সাথে শরীরের সম্পর্কটা কী সাংঘাতিক! মনটা ভালো না থাকলে শরীরটাও কেমন যেন চলতে চায় না! অথচ এ দু জিনিসের নিরাময় দুই আলাদা ডাক্তারের কাছে, দেখানোটা কঠিনই বটে!
যাই হোক, তুমি বলো- কেমন ছিলে এ কদিন?
সেঃ ...............
(অপর প্রান্ত চুপ, হয় তো উত্তর দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে, ভাবছে কেমন ছিল তার শরীর-মন! তবে আমি জানি সেও ভালো নেই, এ দুর্ভাগা জাতির কারোরই তো ভালো থাকার কথা নয়!)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


