somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নস্টালজিয়া_রোজ্‌নামচা

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলা থেকেই আমার (অন্য অনেকের মতোই ;)) ডায়রী লেখার অভ্যেস । বাবা-মা ছাড়া তেমন কোন বন্ধু ছিল না আমার। স্কুলে শিক্ষক বকা দিলে বা বন্ধুরা মনে দুঃখ দিলে বাসায় আসলে মুখ দেখেই মা মনের কথা বুঝে যেত আর বিশেষ কিছু ঘটলে (বিতর্ক করে আমার দল জিতলে বা শ্রেষ্ঠ বক্তা হলে) কখন তা বাবাকে বলব সে ভেবে আমি অস্থির হয়ে যেতাম। মোদ্দা কথা- সুখ-দুঃখ ভাগ করার একমাত্র আশ্রয় ছিল বাবা-মা। কিন্তু বিবাদটা যদি হতো বাবা-মায়ের সাথে (বাবা আমাকে হয়তো রাগ রাগ গলায় একটা কথা বলল অথবা মা বলল, এখন রেডিও শোনা যাবে না) অথবা আমার ভিতরের 'আমি' এর সাথে (স্বভাবত আমি ফাকিঁবাজ হওয়ার পরও বাবা-মা আমাকে কখনোই পড়াশোনার কথা বলতেন না, মা হয়ত মনে করিয়ে দিতেন- এখন যে পড়ছ না পরীক্ষার আগে যেন আবার কেঁদো না। খুবই স্বাভাবিকভাবে সারা বছর না পড়ে পরীক্ষা আসলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যেত/:)- মাকে তখন কিছু বলতেও পারছি না :((:((আর পরীক্ষায় খারাপ করলে বাবা বকা দিবে না কিন্তু মন খারাপ করবে) তখনই গোল বাঁধত, আর ডায়রী হতো আমার আশ্রয়। ডায়রীতে আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে অনেক নালিশ করতাম আর লম্বা লম্বা চিঠি লিখতাম এই বলে যে, হে আল্লাহ্‌! এবারে মতো আমার মান রক্ষা কর প্লিইইইইইজ:((, আর কক্ষণো এমন করবো না, এবার থেকে নিয়মিত পড়াশোনা করব।:D বলাই বাহুল্য একই ঘটনার পুনারাবৃত্তি ঘটত প্রত্যেক পরীক্ষায়।;)/:)

ডায়রী আমার বন্ধু হল সেই তখন থেকে, সেজন্যেই হয়ত স্কুল-কলেজে এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত আমার তেমন বন্ধু ছিল না। কলেজের সেই ভয়ংকর একা ( বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে প্রাইভেট হোস্টেলে থাকতাম) সময়গুলোতে ডায়রী ছিল আমার অনেক বড় এক আশ্রয়। ডায়রীর সাথে সব ভাগ করতাম বলেই হয়তো বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর জন্য কোন তাগিদ অনুভব করতাম না। ধীরে ধীরে আমার জীবনে সত্যিকারের (রক্ত-মাংসের) বন্ধুদের অনুপ্রবেশ ঘটতে লাগল :)(এমন বন্ধু যাদের কিছু বললে তার একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত, কাগজের বন্ধু যা দিতে পারত না/:)) আর আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল। প্রিয় বন্ধুর সাথে কাটানো সময়ে টান পড়ল- দিন-সপ্তাহ গড়িয়ে মাস হতে চলে আমি ডায়রীকে আমার কথা বলি না। যখন আমার রক্ত-মাংসের বন্ধু আমাকে কষ্ট দেয়, তখনই কেবল মনে পড়ে পুরনো কিন্তু সত্যকার অর্থেই যথার্থ বন্ধু ডায়রীর কথা।

ছোট বেলায় একটা ডায়রী পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম, নানা প্রতিযোগিতায় ডায়রী পুরস্কার পেতাম, খুব সুন্দর না হলেও কাজ চলে যেত। সুন্দর হস্তাক্ষরে সেগুলোর পাতাগুলো ভরে উঠত। আর এখন নানা জায়গা থেকে কত্ব সুন্দর সব ডায়রী পাই, লিখব ভেবে রেখে দেই, লেখা আর হয়ে উঠে না, শুধু ডায়রীর পর ডায়রী জমে পাহাড় হয়ে উঠে। প্রত্যেক বছর শেষে যখন হিসেব মেলাতে বসি, কী করলাম সারাটা বছর- বার বার আফসোস হয় কেন দিনগুলোর যথাযথ ব্যবহার করি নি, কেন সময় নষ্ট করে জীবনের আর একটি বছরের অপচয় করলাম- মনে হয় রোজনামচা লেখার কথা। বছর শেষে হিসেব না করে যদি প্রতি দিনের শেষে জমা-খরচের কথা ভাবতাম ডায়রীর পাতায়- তাহলে হয়তো সময়গুলোকে ধরে রাখা যেত একটুসখানি করে হলেও। অনুতপ্ত এবং একই সঙ্গে উদ্দীপ্ত হয়ে নতুন বছরের নামাংকিত ডায়রীর পাতায় লিখি বছরের প্রথম কিছু দিন, তার পর যে কে সেই। ফেব্রুয়ারীর পর আর তা এগোয় না।:|/:) বছর ঘুরে নতুন বছর আসে, নতুন আর একটা ডায়রী দিয়ে আবার শুরু হয় এবং এক ই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হয় /:):((X(X((

নতুন বন্ধু পাওয়াই শুধু দায়ী নয় ডায়রী না লেখার পেছনে, সবচেয়ে বড় কারণ হলো ব্যস্ততা (স্থাপত্য বিভাগে পড়ার কারণে অমানবিক পরিশ্রম), ক্লাশ চলাকালীন সময়গুলোতে দুনিয়ায় যে স্থাপত্য বিভাগ ছাড়া আর কোন জায়গা আছে তা ভাবার অবকাশ ছিল না (মাই বাবা-মা- ভাই-বোনই ভুলে থাকতাম) আর পি এল এর সময় তো সীমাহীন মাস্তি :):D , এভাবেই স্থাপত্য পড়া শেষে যখন পেশাগত জীবনে ঢুকলাম, বন্ধুরাও ব্যস্ত হয়ে দূরে সরে যেতে লাগল ধীরে ধীরে, হল ছেড়ে কোয়ার্টার এ এসে উঠলাম, ছাত্রজীবনের অমানসিক stress (এর ভাল বাংলা আমি জানি না) নেই, কিন্তু ব্যস্ততা আছে সাথে আছে খানিকটা হতাশা- ডায়রী লেখার তাগিদ অনুভব করলাম প্রচন্ডভাবে, কিছু দিন লিখলামও। এবার ডায়রী না লেখার পেছনে কাজ করল ব্যস্ততা আর তার সাথে আলসেমী। সারাদিন অফিস করে, ছাত্র পড়িয়ে রাতে মাস্টার্সের কাজ আর ফাকঁ পেলেই খোমাবই (৫ম বর্ষ থেকে হয়েছে অন্তর্জাল রোগ, ডায়রী লেখার আলসেমীর পেছনে বড় ইন্ধনদাতা আর সময় নষ্ট করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার )।

কিছুদিন আগে পা কেটে শয্যাশায়ী হয়ে অনেক দিন পর ফিরে পেলাম নিজেকে, ডায়রীর কাছ থেকে যত দূরে যাচ্ছিলাম তত যেন নিজের সাথেই দূরত্ব বাড়ছিল। মনে হল, net freak হয়ে যেহেতু laptop দূরে থাকতে পারছি না- তাহলে কেন না আমি ভার্চুয়ালীএই ডায়রী লেখাটা চালাই (রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই হবে), সে চিন্তা থেকেই ব্লগীং করা (লেখা পড়েই নিশ্চয় পাঠক বুঝতে পারছেন- এ কোন আনাড়ী লেখকের ডায়রীর পাতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না, টানাটানি করে লম্বা করা এক বিশাল বক-বকানি ছাড়া তো এ আর কিছুই নয়;):P:(()। কিন্তু অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখলেও ডায়রী লেখার সেই আনন্দটা আর পাচ্ছি না। যে অনুভূতি আর ভাবনা থেকে কাগজের উপর কলম দিয়ে লেখা হয়, ডিজিটাল মিডিয়ায় টাইপ করা অক্ষর সেই অনুভূতি ধরে রাখতে পারে না তেমন করে। 'tactile quality' টা যেন স্পষ্ট হয় আমার কাছে - ডায়রীর পাতা উল্টিয়ে নিজের লেখা দেখা, ওই বিশেষ মুহূর্তটাকে অনুভব করা যায় না ব্লগে নিজের পোস্ট দেখে- কখনোই সম্ভব নয়। ডায়রীর পাতার প্রতিটা অক্ষর যেন আমার সাথে কথা বলে, তাকে হাত দিয়ে ছুঁলে যেন সে কয়েকবছর আগের আমাকে একটু করে হলেও ফিরে পাই।

কিন্তু তারপরেও 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো' এই কনসেপ্ট এ ব্লগিং করে যাই, নিজের মনের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত উলটা পালটা চিন্তা ভাবনাকে অগোছালো ভাবেই ছুঁড়ে দেই এই জালে। কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, কারো ভালো লাগুক বা না লাগুক আমি লিখে যাই নিজের মতো করে নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য (ডায়রীর মতো একনিষ্ঠ শ্রোতা তো কখনো পাওয়া যায় না, মনকে এমন করে উন্মুক্তও করা যায় না আর কারো কাছে), আমার সবচেয়ে প্রিয় আর ভাল বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আশায়।

(ব্লগে আমার একদম প্রথম দিককার লেখা এটা, তেমন কেউই পড়ে নি বলা যায়। তাই এক ব্লগার বন্ধুর পরামর্শে আবারো পোস্ট করলাম। যারা আগেই পড়েছেন তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:৪৪
৬১টি মন্তব্য ৬১টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×