ভালবাসার সুখ-দুখ! - পর্ব ৬
কৃঞ্চচুড়া গাছটার নীচে এসে দাড়াল আকাশ। কখন, কিভাবে এসে দাড়িয়েছে সে নিজেও জানে না। চোখ বুজে থম ধরে রইল খানিকক্ষন। এক সময়ের পরিচিত গন্ধটা অনুভবে নেওয়ার চেষ্টা করল। তারপর গাছটায় আলতো হাত বুলাতে লাগল পরম মমতায়। কত দিনের চেনা গাছটা, স্পর্শ নেয়া হয় না অনেক দিন। ফুলেফুলে পুরো গাছটাই ভরে গেছে। রক্তবর্ণের সব ফুল, মনে হচ্ছে গাছটায়ই আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। একটা কালোমত পাখি ফুলের মধ্যে কি যেন খুজে ফিরছে। তারপরই আরেকটা পাখি এসে তার সাথে যোগ দিল। দুটো পাখিই দেখতে একই রকম। পাখিগুলোর নাম জানেনা আকাশ। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগল সব। ডালপালাগুলো আগের চেয়ে অনেক প্রসারিত হয়েছে। আশে পাশের সব গুলো গাছেও একটা পরিপক্কতা এসেছে। চোখ বুলাতে লাগল চারিদিকে সে নিবীড়ভাবে।
খানিক দুরেই একটি জুটির দিকে চোখ গেল তার। প্রেমিক প্রেমিকাই হবে হয়তো। মেয়েটির উরুতে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছেলেটি। বর্তমানে যুগের সাথে প্রেমের ধরনটাও বেশ বদলেছে মনে হয়। অনেক দিন এরকম কোন জায়গায় যায়নি আকাশ। যুগলটির ভঙ্গিমায় একটা নির্লজ্জ ভাব দেখে অসহ্য! লাগছে আকাশের কাছে। বিরক্তিতে তার কপাল কুচকে যাচ্ছে। অসহ্য বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। তারপর একটা সিগারেট ধরাল। লম্বা করে একটা টান দিয়ে ধুয়া উপরের দিকে ছেড়ে দিল। রিং এর মত কুন্ডলী পাকিয়ে ধুয়া উপরে উঠে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আনমনেই তা নিয়ে খেলা করল কিছুক্ষন। নিকটেই তার সামনে দিয়ে একটা কাঠবিড়ালী দৌড়ে গিয়ে একটা গাছে উঠে তার দিকে খানিক ফিরে তাকাল। তারপরেই সাই সাই করে উঠে গেল খুব উচুতে, মগডালে।
কাঠবিড়ালীটা কি আকাশকে চিনতে পেরেছে?
কথাটা মনে হতেই একটা মুচকি হাসি ঠোটের কোনায় এসে নিমিষেই হারিয়ে গেল।
কাঠবিড়ালী!, খুব পছন্দ করত বৃষ্টি। তা দেখলেই আর স্বস্হিতে থাকতে পারতনা সে। দৌড় লাগাত তার পিছু পিছু। কি অপুর্ব! কি আনন্দ যে সে পেত। তখন আকাশ তন্ময় হয়ে দেখত বৃষ্টির উচ্ছলতা, চঞ্চলতা। আবার মাঝে মাঝেই নিজেও দৌড় লাগাত পিছু পিছু। একবার একটা কাঠবিড়ালী প্রায় ধরেই ফেলেছিল বৃষ্টি কিন্তু খামচি মেরে পালিয়ে গিয়েছিল সেদিন, সেই মুহুর্তে। লম্বা আছড় ফেলে দিয়েছিল হাতে। আকাশ উৎকন্ঠিত হয়ে দৌড়ে এসে মৃদু বকে দিয়েছিল বৃষ্টিকে। তারপর খুজে খুজে তানকুনি পাতা এনে এর রস লাগিয়ে দিয়েছিল পরম মমতায়। আকাশের উৎকন্ঠা আর মমতা ভরা পরিচর্যা দেখছিল বৃষ্টি মুগ্ধভরে। মনে আছে তার সব, খুবই স্পষ্ট।
বৃষ্টির খুশিতে আহ্লাদিত হয়ে যেত আকাশ অতিমাত্রায়। এই অতি আহ্লাদে তাকে কেমন যেন বোকা বোকা মনে হত মাঝে মাঝেই। তারপরও বৃষ্টির প্রতিটি খুশিতেই সে আহ্লাদ দেখিয়ে যেত প্রায় ইচ্ছে করেই। ভালবেসে বোকামী করার মধ্যে যে সুখ নিহীত, সেই সুখই বারাবার আকাশকে বোকা হতে উৎসাহিত করত সেদিন গুলোতে।
একবার কচুরীপানার ফুল দেখে বৃষ্টির জেদ হল তাকে সেটা এনে দিতে হবে। আশ্চর্য রকমের জেদ....
এ্যাই
হুমম
দেখ, কি সুন্দর ফুল!
হ্যাঁ, কচুরীপানার ফুল। ছোট বেলায় আমরা এগুলো দিয়ে কত খেলা করেছি। এক সাথে অনেক ফুল ফুটলে, দেখতে কি যে চমৎকার লাগে! না দেখলে বিশ্বাসই হবে না।
ঠিক আছে, এ্যাই দাও না ফুলটা এনে.....
ওখানে নামব কিভাবে?!!
প্লিজ,
কি যে বল না!
বর্তমানে এই সময়ে চাঁদ আর ফুল, দুটোই হাসিল করা যে সমান কষ্টকর, সেটা কি জান?!
প্লিজ, প্লি......জ
কি করবে আকাশ বুঝে উঠতে পারছেনা। তারপরও এগিয়ে গেল, জুতো খুলল সময় নিয়ে যাতে এরই মধ্যে আগ্রহটা কিছু লাঘব হয়। প্যান্ট গুটিয়ে সন্দিগ্ধ প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাল বৃষ্টির পানে। তার উচ্ছাস আর আনন্দমাখা মাখা মুখখানি দেখে আর ইতস্তত করতে পারেনি সেদিন। মহাযজ্ঞ সাধনের জন্যে পা ভেজাল পানিতে। একটু একটু করে আগাচ্ছে কিন্তু পৌছতে পারছেনা ফুলের কাছে কিছুতেই। এদিকে আস্তে আস্তে প্যান্ট যাচ্ছে ভিজে। ভিজতে ভিজতে এক সময় প্রায় কোমর পর্যন্ত গেল ভিজে। তারপর, স্বগর্বে, স্বউল্লাসে, চাঁদ! হাতে এসে দাড়াল বৃষ্টির সামনে।
ঘটনাটা মনে হতেই মৃদু হাসল আনমনে, তারপরই শিরদাড়া বেয়ে একটা গরম নিশ্বাস বের হয়ে গেল অজান্তেই। ক্ষনিকের জন্যে ভারী হয়ে উঠল চোখ দুটি।
মনে পড়ছে তার সেই সব দিনের কথা, মনে পড়ছে...
হাঠতে হাঠতেই দুজন ভাগ করে নিত তাদের দুঃখ কষ্টগুলো, সুখেরা সব তখন পাখা মেলত বর্নিল সাজে। জীবনকে রাঙ্গাত স্বপ্ন সুখে। মাঝে মাঝেই আকাশের বাম হাতকে দুই হাতে আকড়ে ধরে, ঘাড়ে মাথা দিয়ে হেটে চলত বৃষ্টি আপন লয়ে। কথা বলে যেত আবেগতাড়িত হয়ে, কল্পনায় সাজাত ভবিষ্যতের বাস্তবকে। আর তখন আকাশ অপার সুখের আবেশে, অনুভবে আগলে রাখত, জড়িয়ে রাখত তার বৃষ্টিকে। চাওয়া পাওয়ার সব আকুতিকে ভাসিয়ে দিত কল্পনার সাগরে।
চোখ বুজতেই আকাশ দেখতে পেল সেই সব অতীত। সুখ দুঃখের, হাসি কান্নার, নানা বর্নের অতীত স্মৃতি। স্মৃতিরা সব যেন আকাশকে উপহাস করতে লাগল একযোগে। চিৎকার করে কেউ যেন বলছে,
মনে আছে আকাশ? মনে আছে তোমার?
'তুমি প্রায়ই বলতে,ভালবাসার প্রথম এবং প্রধানতম শর্তই হচ্ছে বিশ্বাস। আবেগে আপ্লুত হয়ে প্রায়ই বলতে, আমার বিশ্বাস, আমার ভালবাসার অমর্যাদা কখনও করো না বৃষ্টি।'
কোথায় তোমার সেই বিশ্বাস? কোথায় তোমার সেই ভালবাসা? আকাশ!
ভালবাসার বিশ্বাসে, ভালবেসে পুজার অর্ঘ্য তুলে দিয়েছিলে একসময় যার হাতে, যাকে ধ্যান জ্ঞান মনে করে সুখে বিভুর থাকতে নিত্যসময়, যাকে ছাড়া তোমার আকাশে ভোর হত না, পাখিরা গাইত না, ফুল তার সৌরভ ছড়াত না, সেই বৃষ্টি, তোমার সেই বৃষ্টি এখন কোথায়? কো থা য় ? আকাশ! কো... থা.....য় ?
একটা করুন মিহি কাপঁন তুলল বাতাসে। দুহাতে কান চেপে চোখ বুজে বসে আছে আকাশ।
(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





