ভালবাসার সুখ-দুখ! - পর্ব ৭
অসহ্য! মনোকষ্ট নিয়ে আকাশ বসে আছে একই জায়গায়। মনের ঝড়টা থামছে না যেন কিছুতেই। মাঝে মাঝেই কৃঞ্চচুড়ার পাপড়ি ঝরে পড়ছে তার উপর। গাছ কি তার পাপড়ি ছিটিয়ে তাকেই জয়োধ্বনি দিচ্ছে? ভালবাসায় কি আকাশেরই জয় হয়েছে? কথার রেশে মৃদু হাসি খেলে গেল তার ঠোটের কোনায়।
সত্যিই কি ভালবাসার কোন জয়! পরাজয়! আছে? না জয়! পরাজয়! হয়? আকাশের মাথায় কেবলই চিন্তাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে।
চিন্তায় ছেদ পড়ে আগুন্তুকের কথায়।
কিমুন আছেন ভাইজান? ভালানি?
হ্যা, তুই কেমন আছিস? তোর নাম জসিম না?
হ ভাইজান, ভুইলা গেলেন! ঐ যে আফার জন্যে কাঠবিড়ালী ধরতে গাছে উঠেছিলাম, মনে নাই?
হ্যা, মনে আছে। তুই কেমন আছিস?
হ ভাইজান ভালাই আছি, তয় এখন খারাপ পোলাপাইন অনেক বাইড়া গেছে। খালি ফাও খায়।
হুম
ভাইজান আফায় কই? আফায় আসে নাই?
নারে সে আসে নাই, সে এখন খুবই ব্যস্ত।
ভাইজান আফার লায় একটা কাঠবিড়ালী ধরেছিলাম। কিন্তু হেই যে গেলেন আর আইলেন না।
তারপর, খানিক চিন্তা করে আবার জিঙ্গেস করল...
আফার কি অন্য জায়গায় বিয়া অইয়া গেছে? ভাইজান
হ্যারে, তার বিয়ে হয়ে গেছে?
আফায় কাজটা ঠিক করে নাই ভাইজান, ভালা করে নাই হে কাজটা!
বাদাম খাইবেন ভাইজান? মমতা ভরে জিঙ্গেস করে জসিম আকাশকে।
জসিম কি তাকে করুনা দেখাচ্ছে! সে কি দেখতে পাচ্ছে তার ভিতরের ক্ষতটা? কি জানি হতেও পারে। এখনকার দিনে মানুষ মানুষের জন্যে তেমন করে সহানুভুতিও দেখায় না। সবাই নিজেকে ব্যস্ত রাখে, অনেকে ব্যস্ত থাকার বান করে। ভাল লাগল ছোট ছেলেটির মমতাটুকু দেখে।
ইচ্ছে না থাকা সত্বেও আকাশ বলল..........
দে, একশ গ্রাম বাদাম আমাকে দে আর একশ গ্রাম তুই নে
না ভাইজান আমার বাদাম খেতে ভালা লাগে না।
কেন? তাহলে, তোর কি খেতে ভাল লাগে?
কোক খেতে খুব ভালা লাগে, খাইলে কিমুন ঢিকুঁর আসে চোক্কে পানি আইসা পড়ে। খুব ভালা লাগে। একবার তিনজনে মিইল্লা কিইন্না খাইছিলাম। তয় আমারে হেরা ঠগাইছিল ভাইজান।
তারপর আর কথা বাড়ায় না আকাশ। পঞ্চাশ টাকার একটা নোট জসিমের হাতে দিয়ে বলল, নে এখানে তোর বাদামের দাম আছে আর বাকী টাকায় তুই কোক খাবি। ঠিক আছে জসিম, এবার তুই যা।
টাকাটা হাতে নিয়ে জসিম চলে গেল কফি হাউজটার দিকে। হয়ত এক্ষুনি সে কোক কিনে খাবে বন্ধুদের দেখিয়ে দেখিয়ে। বিচিত্র সব মানুষ, বিচিত্র তাদের চাহিদা।
আনমনেই কয়েকটা বাদাম খেল আকাশ। তারপর এক ঝটকায় উঠে দাড়াল। এদিক ওদিক চেয়ে ছোট পাতা কুড়ানী মেয়েটাকে হাত ইশারায় কাছে ডাকল। তার হাতে বাদামের প্যাকেটটা দিয়ে হাটতে লাগল ধীর লয়ে। মনে হচ্ছে তার কোন তাড়া নেই, নেই কোন পিছুটান।
হাটতে হাটতেই পরক্ষনে মনে হল জসিমের কথা।
'আফার কি অন্য জায়গায় বিয়া অইয়া গেছে ভাইজান ? '
কথাটি কানে বাজতে লাগল ডং ডং করে। একটা বিরক্তি নিয়ে লাথি দিল সামনে থাকা শুকিয়ে যাওয়া ছোট তালে।
কি অন্যায় ছিল বৃষ্টি আমার? কেন আমায় নিয়ে এমন নিঠুর খেলা খেললে তুমি? আমিতো তোমার কাছে বেশী কিছু আশা করিনি। ভালবাসার একটা প্রচন্ড শক্তি থাকে, থাকে নির্মল স্নিগ্ধ একটা রুপ। আমি বিভুর ভরে তোমার কাছে সেই রুপটিকে, সেই শক্তিটিকেই শুধু খুঁজে ফিরছিলাম। তোমাকে নিয়েই স্বপ্ন সাগরে ডুব সাতারে নিমগ্ন ছিলাম। কখনও গুনাক্ষরে কোনদিন ভাবিনি ভালবাসার সমস্ত বিষাদটুকু শুধু আমার জন্যেই অপেক্ষা করছে। ভালবাসার সমস্ত গ্লানি শুধু আমায় বহন করতে হবে। কি আশ্চর্য খেলা খেললে তুমি। খেলার মোহ কাটতেই তুমি নিজেকে আড়াল করে নিলে এক লহমায়।
নিয়তির কাছে, জীবনের কাছে আমি কখনও পরাজিত হইনি কিন্তু তুমিই আমার বিশ্বাসের সেই ভীতটুকু প্রথম বারের মত নড়বড়ে করে দিয়েছিলে বৃষ্টি। খেলার ছলে আমার ভালবাসার বিশ্বাসকে আতুড় ঘরেই গলা টিপে ধরেছিলে।
জানো বৃষ্টি, কি নিদারুন কষ্ট আর শুন্যতায় আমি কাটিয়েছি পরবর্তী একটি বছর। তোমার শূন্যতায় কি প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে বুকের ভেতর। সেই ঝড়ে লন্ডবন্ড হয়ে গিয়েছিল জীবনের সমস্ত বোধটুকু। মরতে মরতে বেচে গিয়েছিলাম সেদিন আমি। ভালবাসায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম তখন। তোমার অবয়ব প্রায়ই দেখতে দিত না অন্য কিছু। কখন যে কিভাবে গাড়ি উপড়ে উঠে গিয়েছিল সেইদিন টেরই পাইনি। তারপর কাতরিয়েছি হসপিটালের বিছানায়। এক নজর দেখতে চেয়েছিলাম তোমাকে। তুমি আসনি। সেই দিনের নিষ্টুরতার মাত্রাই আবার আমাকে বাচতে শিখিয়েছে। আমি বেচে আছি বৃষ্টি, খুব ভাল ভাবেই বেচে আছি।
___________________________________________
ছদ্মবেশে বৃষ্টি একদিন আশ্রয় চেয়েছিল আকাশের বুকে । আকাশও তার সমস্ত ভালবাসার সত্ত্বা দিয়ে বুক পেতে বরন করে নিয়েছিল মেঘরূপী বৃষ্টিকে। সেই সরলতার সুযোগে আকাশের বিশাল বুকে লুকোচুরী খেলেছে আপন মনে। উদার আকাশ মুগ্ধতা ভরে দেখেছে সেই নিঠুর খেলা।
খেলতে....খেলতে....ছদ্মবেশী বৃষ্টি একদিন শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে আকাশের বুকের উত্তাপ নিয়ে টুপ করে ঝড়ে পড়ে ধুলির ধরায়। সেই ক্ষনে, বিরহে কেদেছিল আকাশ।
বড়ই বিচিত্র! নিয়তির খেলা। পরম মমতায় সেই নিয়তিই একদিন নীলার নীল এন ছড়িয়ে দিয়েছিল আকাশের সারা গায়। উদার আকাশ সেই নীলকেই সাদরে ধারন করে নিয়েছে তার .........বুকে।
_____________________________________________
ভাবতে ভাবতেই আকাশ হারিয়ে গিয়েছিল রঙ্গীন-ধুসর অতীতে। হঠাৎ করেই ধ্যান ভঙ্গ হল সেলফোনের আওয়াজে। অলস ভরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল ফোনটি। সিসিভ করার আগেই কেটে গেল লাইন। এর আগেও একবার কল হয়েছে, টের পায়নি সে। দুটো কলই নীলার। হাত ঘড়িটা এক নজর দেখে নিল। চারটার উপরে বাজে। কখন কিভাবে জীবন থেকে সময়টুকু কেটে গেল, টেরই পায়নি। সেলফোনটা হাতে নিয়ে রিং করল নীলা কে। রিং বাজছে, ধরছে না সে। বাজতে বাজতে রিং কেটে গেল। তারপর আবার করল, দ্বিতীয় বার রিং বাজতেই নীলার স্নিগ্ধ কন্ঠের আওয়াজ। কয়েক মিনিট কথা বলল প্রশান্তি ভরে এবং অজানা এক খুশিতে টগবগ করছে আকাশের হৃদয়।
তারপরই মনে মনে বলল, এখন থেকে শুধু তোমাকেই ভালবাসব নীলা। কখনও কোনদিন তোমাকে প্রতারিত করব না। শুধু নীলার নীলের মাঝেই বেচে থাকব আমি। নীলকে নিয়ে বেচে থাকার জন্যেই শুধু জন্ম আকাশের। এই মুহুর্ত থেকে বিষাক্ত কালো অধ্যায়ের অনুপ্রবেশ আর কখনও ঘটবে না আমার নীলের মাঝে। আমি শুধু নীলের মাঝেই বেচে থাকতে চাই। এখন থেকে শুধুই নীলাকাশ, ভালবাসার, জন্ম জন্মান্তরের।
(চলবে....)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





