ভালবাসার সুখ-দুখ! - পর্ব ৮
দীর্ঘ দিনের লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্টটা উদগিরিত হওয়ায় বুকের জমাট ভারটা নেমে গেছে অনেক। তবে মন আর শরীর ধকল সয়েছে বিস্তর। ধকলে ধকলে খানিক বিধ্বস্ত দেখালেও এখন এক ধরনের প্রশান্তির মধ্যেই আছে আকাশ। মনের দিক থেকে এখন অনেক পরিছন্ন লাগছে নিজের কাছে। নিয়তির করাল থাবায় এলামেলো হয়ে গিয়েছিল জীবনের কিছুটা সময়। মানসিক ভাবে অনেক বিপর্যস্ত হলেও একবারে বিলীন হয়ে যায়নি কখনও। প্রচন্ড রকমের দুঃখ আর শোকে নিজেই নিজের উপর অযাচিত জুলুম করেছে শুধু। তারই শেষ নিদর্শন, রাত থেকে অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারীতায় এখন খানিক দুর্বল লাগছে তার।
ফোনে তখন নীলার আকুতি ফেলতে পারেনি আকাশ। তাই বিকাল বেলা সে আসছে বলে জানিয়েছিল নীলাকে। বেশ কিছুদিন দেখাও হয় না দুজনের। বিচ্ছেদে কিছুটা ব্যথিতও মনে হচ্ছে এখন নিজেকে। অতীতে নীলার প্রতি আকাশের ভালবাসার অনুভুতি প্রখর না হলেও অবহেলা দেখা যায়নি কখনও। নীলার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আর ব্যক্তিত্ব আকাশকে দিনে দিনে মুগ্ধ করেছে অনেক। কাছে টেনেছে, আকর্ষিত করেছে আপন মহিমায়। প্রকারন্তে আকাশ দায়িত্ব আর কর্তব্যে ছিল বেশ সচেতন। তাতেই পুষিয়ে দিয়েছে ঘাটতিটুকুন। কখনও ঘুনাক্ষরে নিজের দুর্বলতাটুকু বুঝতে দেয়নি নীলাকে। জীবনের কালো অধ্যায়টির অশুভ ছায়া কখনও ফেলতে দেয়নি নীলার মাঝে। বিগত দিনগুলোতে ভিতরে ভিতরে অপ্রকাশ ভাবে খানিক প্রতারিত করলেও এখন আর আকাশের মননে কোন দ্বিধা নেই। সমস্ত কালিমা ধুয়ে মুছে লীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকুন রয়ে গেছে তাতে প্রভাব ফেলতে পারবে না কখনও। ভালবাসা তার গতিমুখ পরিবর্তন করে একমুখী হয়েছে। তাতে স্বস্তিই পাচ্ছে আকাশ। ভালবাসা স্হির নয়, স্হায়ীও নয়, তবে আপেক্ষিক হবে হয়ত অবশ্যই। ভালবাসা স্হান, কাল, পাত্র ভেদে পরিবর্তিত হয়। এই চরম সত্যটি আজ আকাশ নিজের জীবন দিয়ে শিখল।
নীলাদের বাসায় যেতে খানিক দেরী হবে আকাশের। সে সংবাদটুকু জানানোর জন্যেই ফোন করল নীলাকে। ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেল। দ্বিতীয় বারও একই অবস্হা। ধরছে না কেন নীলা! কি করবে বুঝতে পারছে না আকাশ। একটু দ্বিধান্বিত হয়ে আবার রিং করল। এবার আর দেরি হয়নি। সাথে সাথেই নীলা রিসিভ করল, সুমিষ্ট কন্ঠের আওয়াজ পেল আকাশ.........।
হ্যালা
কোথায় ছিলে তুমি! প্রতিউত্তরে আবেগী কন্ঠে জানতে চাইল আকাশ
এই, একটু রান্না ঘরে..
হুম, কি করছিলে?
আমার জানের জন্যে রান্না করছিলাম
কি রান্না করছিলে?
বলা যাবে না..... আসলেই দেখতে পারবে
প্লিজ, বলোনা
না, তবে সব গুলোই তোমার ফ্যাবারেট ম্যানু
হুম, এইবার বুঝেছি......
পারলে বলতো দেখি!
বলব? অবশ্যই পারব
ঠিক আছে, বল
এ্যাই...........সর্ষে ইলিশ?
আর
চিংড়ীর দুপেয়াজো
আর
মাংসের কাবাব
আর, আর কি?
আর, আর, আর দুজনের ফেবারেট ফিন্নি! ....ওকে?
হুমম, একশতে একশ
আর তোমাকে একশতে একশ দশ বলে আবেগে হঠাৎ বলে উঠল আকাশ, আই লাভ য়্যু জানু। আমি তোমাকে ভালবাসি নীলা, খুব ভালবাসি।
হা...হা...হা... খুব জোরে হেসে উঠল নীলা।
হাসতে হাসতেই বলল, হ্যা আমিতো সেটা জানি, আমার জান। আর আমাকে ছাড়া তুমি আর কাকে ভালবাসবে মিষ্টার! আর কেউ আছে নাকি! আচ্ছা, তুমি আসছ কখন?
হ্যা, এজন্যেই ফোন করেছিলাম। আমার আসতে একটু দেরী হবে। বাসায় যেয়ে ফ্রেশ হয়ে তারপর আসব। তাছাড়া আগামীকাল অফিস যাব না। চিন্তা করেছি ছুটি নেব। কয়েকদিন ধরে শরীরটা ভাল লাগছে না, খুব ক্লান্ত লাগছে।
সত্যি!! সত্যি তুমি কাল এখানে থাকবে? ইউ আর স সুইট। ঠিক আছে লক্ষীটি, দেরী করো না। তাড়াতাড়ি চলে এসো।
বাই
বাই, বলে ফোনটা রেখে তন্ময় হয়ে রইল আকাশ অনেকক্ষন। প্রচন্ড রকমের ভাল লাগায় চোখ ছলছল করছে। খুব ভাল লাগছে আজ তার। সত্যিকার অর্থেই জীবনকে অর্থবহ লাগছে। আজ নিজেকে খুব সুখী মনে হচ্ছে। তবে এখন নিজেকেই নিজের কাছে খানিক অপরিচিত লাগছে। মাঝের কিছুটা সময় একটা অযাচিত অচেনা কাল আবরনে ঢাকা পড়েছিল। আজ সেই আবরন খসে পড়েছে। আজই প্রথম প্রকাশ্যে ভালবাসার কথা জানাতে পেরেছে সে নীলাকে। তাতে ভাল লাগছে, খুবই ভাল লাগছে আকাশের। গুন গুন করে করে গান গাইতে গাইতেই তাড়াতাড়ি শাওয়ার করল। তারপর হ্যান্ডব্যাগটায় কিছু কাপড় ঢুকিয়ে দ্রুততার সহিত বের হল ঘর থেকে। রিক্সা নিয়ে ফুলের দোকানে গিয়ে ঢুকল। বেছেবেছে বিভিন্ন রং এর গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধার আর গোলাপের কলি দিয়ে তোড়া বানাতে দিয়ে এরই মধ্যে নীলার পছন্দের কিছু কেনাকাটা করল। তারপর একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
ট্যাক্সি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। তারপরও মনের গতির সাথে যেন পেরে উঠছে না কোন মতেই। মিলনের আকুতিতে অস্হির আকাশের তর সইছে যেন কিছুতেই। অস্হিরতা নিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। টানতে লাগল আয়েসী ভঙ্গিতে আর চিন্তা করছে আকাশ। এই মুহুর্ত থেকে হয়ত নীলা বেলকুনিতেই আছে তারই অপেক্ষায়। এটা নীলার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। অফিস থেকে ফেরার সময় হলেই নীলা বসে থাকত আকাশের অপেক্ষায়। মনে হতেই ভাল লাগার আবেশে চোখ বুঝে আসল আকাশের।
তারপর....................তারপর আবেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই চোখ আর খোলার সময় পায়নি আকাশ। আচমকা রাস্তা পার হতে যাওয়া মাঝ বয়সী এক মহিলাকে বাচাতে গিয়েই আকাশের ট্যাক্সি ব্রেক কষেছিল হঠাৎ। আর তাতেই ঘটল চরম বিপত্তি। পেছন থেকে দ্রুত ধেয়ে আসা একটা ট্রাক প্রচন্ড বেগে আঘাত করল আকাশর ট্যাক্সিকে। আঘাত প্রাপ্ত হয়ে ট্যাক্সি পুল্টি খেয়ে আছড়ে পড়ল আইল্যন্ডের ল্যাম্পপোষ্টে। সামনের দিকটা ল্যাম্পপোষ্টে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে মুচড়ে গেছে। কাত হয়ে পড়ে আছে আকাশের দেহ। দরজার একদিকে রক্তাক্ত মাথা বের হয়ে আছে। ক্ষত দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসছে। ড্রাইভারের অবস্হা আশান্কাজনক। হইহই করে কিছু উৎসাহী লোক ধেয়ে গেছে ট্রাকের দিকে। তবে এর আগেই চম্পট দিয়েছে ঘাতক ড্রাইভার। তাকে না পেয়ে খানিক ভাংচুর চালাল অতি উৎসাহী জনতা।
একজন মধ্য বয়সী লোক কোন দিকে ভ্রক্ষেপ না করে এগিয়ে গিয়ে তুলে নিল আকাশের নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহটা। দেখাদেখি তার সাথে হাত লাগাল আরও বেশ কয়েকজন। দ্রুততার সহিত আকাশকে পাশে পার্ক করা গাড়িতে উঠিয়ে নিল। অন্য একজন পড়ে থাকা ছড়ানো ছিটানো জিনিস পত্রগুলো দ্রুত কুড়িয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিল। সেই সাথে আছে রক্তে রন্জিত ফুলের তোড়াটিও। সেখান থেকে আর সুবাস বের হচ্ছে না। তাতে শুধুই রক্তের গন্ধ। বাতাসে রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি এগিয়ে চলছে আকাশের নিথর দেহ নিয়ে।
(চলবে.....)
পর্ব গুলো দেরীতে দেরীতে প্রকাশিত হওয়ায় আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। অবশ্যই নিজ গুনে সবাই মার্জনা করিবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





