প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার দায়ীত্ব কালের অভিজ্ঞতার আলোকে বললেন, আমরা দুটি বড়দলের যাঁতাকলের/গেড়াকলের/মাইনকা চিপার মধ্যে পড়ে গেছি।এই যাঁতাকল ক্ষমতা দখলের জন্য দুইটি হিংস্র ডাইনোসর দৌড়। এই যাঁতাকলের ভেতরই শিকড় গেড়ে বসে আছে দলীয়করণ, দুর্নীতি, অবিচার অন্যায়, অত্যাচার সহ সকল অনৈতিক প্রকল্প। অথচ নীচে ছোট ছোট দলগুলো কিলবিল করছে যেগুলো কখন মাথা সোজা করে দাড়াতেও পারছে না। তিনি মনে করেন নির্বাচন কমিশনের এদের সাহায্য করা উচিত যাতে এরা বিকশিত হতে পারে।
নির্বাচন হচ্ছে জুয়াখেলা। এই জুয়ার বোর্ডে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি বিপুল অর্থ লগ্নি করে। ছোটখাট ভোট ব্যাংক থাকায় আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চেপে জাতীয় পার্টি আর বিএনপির ঘাড়ে চেপে জামায়াত জয়-পরাজয়ের সঙ্গী হয়।বলাবাহুল্য জুয়ার বোর্ডে অর্থলগ্নির ক্ষমতা আওয়ামী লীগ-বিএনপির পর কেবল জাতীয় পার্টি আর জামায়াতের আছে। বাকি সবাই ঢাল-তলোয়ারহীন নামমাত্র রাজনৈতিক দল।
নির্বাচনে ভোট বেচাকেনা এতোই সক্রিয় ঘটনা যে কোন নির্দলীয় একক প্রার্থীর পক্ষে ভোটে জিতে সংসদে আসা প্রায় অসম্ভব।নির্বাচন কমিশন তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে যতই চেষ্টা করুক না কেন, নির্বাচনে কালো টাকা আর পেশী শক্তি মুক্ত রাখা কমিশনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।এমনকি ‘না’ ভোটের অপশন দিয়েও নির্বাচন কমিশন অযোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনী জুয়ায় জিতে আসা ঠেকাতে পারেনি।
নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম চালুর সাধু প্রস্তাব রেখেছেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী যেহেতু এর প্রশংসা করেছেন, বিএনপি নেত্রী তাই বেঁকে বসেছেন।এটি যাঁতাকলের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে বাকী দলগুলো কী মতামত রাখলো না রাখলো তা বিবেচনায় নেয়াও যেন সময়ের অপচয়।বিএনপির এই গোঁএর কারণে নির্বাচন কমিশন ইভিএম চালু করতে পারবেন না তা এখনি বলে দেয়া যায়।
১৯৯৬ সালে কেয়ার টেকার সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগ যখন হরতাল করেছে বিএনপি তখন না বলেছিল। এখন ২০১১ সালে বিএনপি যখন কেয়ারটেকার সরকারের জন্য হরতাল করছে আওয়ামী লীগ তখন না বলছে।গত পনেরো বছরে হরতাল সংস্কৃতি একি জায়গায় রয়ে গেল।কারণ ঐ একটাই ক্ষমতার দৌড়।এই দৌড়টি এতোই জনপ্রিয় যে আগে ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলকে দূর থেকে চাঁদা দিয়ে নির্বাচনী জুয়া সচল রাখতো। আর এখন তারা নিজেরাই নির্বাচনের টিকেট কিনছে। বর্তমান সংসদেও ৬৫ ভাগ ব্যবসায়ীদের দখলে এবং বাকিরাও কোন না কোন ভাবে ব্যবসায়ীর আত্মীয় ও ব্যবসায় জড়িত। রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণের বিষয়টি এখন তুঙ্গে, নির্বাচন এখন লাভজনক ব্যবসায় অর্থ লগ্নী।আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়েই এখন টাকাওয়ালা লোকদের নমিনেশান দেয় যারা ভোট কিনতে পারবে।গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা তৃণমূলের কর্মীদের ভোটে জিতলেও নমিনেশান পাননি।কারণ তারা টাকাওয়ালা নন।এর পরিবর্তে নমিনেশান পেয়েছেন রাজনীতির অভিজ্ঞতাশূণ্য ব্যবসায়ীরা। আর বিএনপি ব্যবসায়ীদের সংসদে নিয়ে এসেছে ২০০১ সালেই।ফলে দৃশ্যত সংসদটি একটি জুয়ার আসরে পরিণত হয়েছে।ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী শাসনের প্রচ্ছায়া খুঁজে পাওয়া যায় শেয়ার বাজার সহ শাসন যন্ত্রের সর্বত্র।
গত তিনটি সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে লক্ষ্য করা গেছে বিরোধী দল জয়ী হচ্ছে।বিশেষ করে মন্ত্রীরা ভোটে হারছেন।নির্বাচনে টাকা খরচ দুই দলই করছে। কিন্তু সরকারী দলের ব্যর্থতা যেহেতু ভোটারদের স্মৃতিতে জলজল করতে থাকে ফলে ফ্লোটিং ভোট চলে যাচ্ছে বিরোধীদলে।খুব অল্পসংখ্যক নেতাই নিজের এলাকার জনপ্রিয়তার মানদন্ডে টেকসই ভোট ব্যাংক তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন।
এভাবে এই যাতাকলে গণতান্ত্রীক বাংলাদেশ একটি ইজারাতান্ত্রীক বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে।
ইজারাদার হাওর ইজারা নিয়ে যা করে এই দুই রাজনৈতিক দলও বাংলাদেশকে ৫ বছর করে ইজারা নিয়ে তাই করে !
ইজারাদার একটি হাওর বা বিল ইজারা নিয়ে প্রথমে জাল দিয়ে মাছ ধরে। পরে পানি কমে গেলে পাম্প লাগিয়ে হাওরের পানি সেঁচ করে পানি শূন্য করে বিলের সমস্ত মাছ ধরে।এরপর ঐ বিলের মাঝখানে বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলা বাঁশের খুটি গেরে হেজাকলাইট জ্বালিয়ে রাখে, হেজাকের আলোতে যখন পোকামাকড় ভীর করে তখন যে মাছ যেগুলো কাঁদার ভিতর লুকিয়েছিল সেগুলো ঐ পোকামাকড় খাওয়ার জন্য কাঁদার উপর উঠে আসে। আর এবার ইজারাদার তখন সেই মাছগুলো ধরে। শেষে চৈত্রমাসের খড়ার শুকনো বিলের মাটি কেটে বিক্রি করে।বাংলাদেশের গণতন্ত্রও এই ইজারাদারী প্রথায় চলছে। এখানে দুইটি রাজনৈতিক দল ৫ বছর অন্তর অন্তর দেশ ইজারা নেয়।
বিলে যেমন বড় বড় খন্দ/গর্ত থাকে দেশে তেমন মন্ত্রনালয়/সেক্টর থাকে যেগুলি ইজারাদার পরিবারের সদস্যদের ভাগ করে/সাব ইজারা দেয়া ৫ বছরের জন্য। মন্ত্রনালয়/সেক্টরগুলো বিভিন্ন মন্ত্রী/ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব নিয়ে মাছ ধরে ইজারার মেয়াদ কালে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



