গোপালপুরে গণহত্যা
১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:৩৭
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানা সদর থেকে আনুমানিক নয় কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তর দিকে গোপালপুর বাজারের অবস্থান। এরই পশ্চিমপার্শ্বে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে গোপালপুর মির্জানগর পরগণার এক সময়ের প্রভাবশালী জমিদার বাড়ী। এছাড়া বাজারের কোলঘেঁষে গোপালপুর আলী হায়দার উচ্চ বিদ্যালয়। পশ্চিম-উত্তর মাথায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাংক ও পোস্ট অফিস।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবু কায়েস মাহমুদ, মোঃ মোহসীন দুলাল, জাকির হোসেন, মাহমুদুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এ এলাকার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ আনিছুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নিম চন্দ্র ভৌমিক, সাহাবউদ্দিন মিন্টু ও স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খসংগঠিত করার কাজ শুরু হয়।
এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী নোয়াখালীতে প্রবেশ করার কিছুকাল পরও গোপালপুর রয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের দূর্জয় ঘাঁটি হিসাবে; পরিণত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং সেন্টারে। চলতে থাকে যুদ্ধের প্রাথমিক কলাকৌশলের ট্রেনিং। সময়ের সাহসী সন্তানেরা দলে দলে প্রাথমিক ট্রেনিং সমাপ্ত করে চূড়ান্ত ট্রেনিং গ্রহণের জন্য গোপনে চলে যেতো বজরার বগাদিয়া আফানিয়া হয়ে ভারতের দিকে। গোপালপুর এভাবেই পালন করে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এক অগ্রণী ভূমিকা। এ খবর পৌঁছে যায় জামাত, মুসলীম লীগ ও শান্তি কমিটির মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছে। তারা কয়েক দফা চেষ্টা চালায় এ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের খুঁজে বের করার জন্য। দেখতে দেখতে চলে আসে বর্ষা।
সময়টা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। প্রচুর বৃষ্টি হয় সেবার ১৮ আগস্ট রাতে। ভোররাতে বেগমগঞ্জ লক্ষীপুর সড়কের কাছে বাংলাবাজার শামসুননাহার হাইস্কুলে এসে অবস্থান নেয় বেশ কিছু পাকিস্তানী মিলিশিয়া ও রাজাকার। ১৯ আগস্ট সকাল বেলা - সূর্য তখনো মেঘের আড়ালে ঢাকা। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল আনুমানিক আটটা নাগাদ গোপালপুর বাজারে পৌঁছে যায় প্রায় কয়েকশ পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার। তারা দুভাগে বিভক্ত হয়। রাজাকারদের কুড়ি/পঁচিশ জনের একটি দল বাজারের পশ্চিমদিক দিয়ে এবং বাকীরা মূল রাস্তা দিয়ে এসে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সকাল থেকেই বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান অগণন মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত ছিলো। কেউ চা পানে রত। আবার কেউ গতরাতে আশেপাশের কোন কোন এলাকায় গোলাগুলি হয়েছে তার অবস্থান নির্ণয় নিয়ে বিতর্করত। এমন সময় অতর্কিত হানা দিলো পাকিস্তানী হায়েনার দল। যারা পালাতে পারলো তারা বাঁচলো। যারা পারেনি এরকম অর্ধশতাধিক দূর্ভাগা নিরীহ গ্রামবাসী ও দোকানী শিকার হল নির্মম হিংস্রতার। একে একে ওদের সবাইকে ধরে এনে এক লাইনে দাঁড় করানো হয় বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট খালটির পাড়ে। এ দলে ছিলেন ঐ এলাকার শান্তি কমিটির নেতা। তার অপরাধ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন। তাঁর কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার জানতে চায়- আনিস ডাক্তার, সুবেদার মেজর জবেদ আলী কোথায়? কোনো দেশপ্রেমিক মুক্তিপাগল মানুষ তাদের এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয় এবং তারা এর কোন জবাব কোনদিনই পায়নি। বাজারের দোকানে দোকানে তল্লাশি করে খুঁজতে থাকে স্বাধীন বাংলার পতাকা। জনৈক ছিদ্দিকউল্যাহর দোকানে ওরা পেয়ে যায় স্বাধীন বাংলার একটি পতাকা।- ক্রোধে ফেটে পড়ে ওরা। লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন মুসল্লিকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকী প্রায় পঞ্চাশজন নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে ব্রাশফায়ার করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ব্রাশফায়ারের পরও যারা বেঁচেছিলো তাদেরকে বেয়নেট চার্জ করে পৈশাচিক উল্লাস প্রকাশ করার পর পাকিস্তানী পশুরা হত্যা করে। মানুষের তাজা রক্তে সয়লাব হয়ে যায় খালের পানি। রক্ত আর পানিকে পার্থক্য করা যায়নি। এই হতভাগ্য মানুষদের অপরাধ ছিলো- তারা বলেনি কারা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কারা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অপরাধ, দোকানে পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
এই হত্যাকান্ড জঘন্য বর্বরতা। মানবতাবিরোধী। নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গোপালপুরের এই গণহত্যা এক কালো অধ্যায়। এই ঘটনায় যারা শহীদ হন তাদের পঁচিশ জনের নাম পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়:
১. মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী [নশা মিয়া] (গোপালপুর)
২. দীন ইসলাম (তুলাচরা)
৩. হাবিব উল্যাহ (তুলাচরা)
৪. ইসমাঈল মিয়া (তুলাচরা)
৫. অহিদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৬. মোহাম্মদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৭. মোহাম্মদ উল্যাহ (সাহাদাপুর)
৮. দুলাল মিয়া (সাহাদাপুর)
৯. সামছুল হক মাস্টার (আটিয়াকান্দি)
১০. মজিবউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১১. বশিরউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১২. আবুল কাশেম (মির্জানগর)
১৩. আবুল বশর ছিদ্দিক (মির্জানগর)
১৪. হারিছ মিয়া (দেবকালা)
১৫. ছিদ্দিক উল্যাহ মিয়া (সিরাজউদ্দিনপুর)
১৬. মমিনউল্যাহ মিয়া (মুহুল্লাপুর)
১৭. মন্তাজ মিয়া (মহল্লাপুর)
১৮. নূর মোহাম্মদ (মহল্লাপুর)
১৯. আবদুল মন্নান (মহল্লাপুর)
২০. মোবারক উল্যাহ (পানুয়া পাড়া)
২১. মোহাম্মদ উল্যাহ দর্জি (চাঁদ কাশেমপুর)
২২. আবদুর রসিদ (আমিরাবাদ)
২৩. আবদুল সাত্তার (বারাহীনগর)
২৪. আবদুল করিম (হীরাপুর)
২৫. ডা: মোহাম্মদ সুজায়েত উল্যাহ (দশঘরিয়া, চাটখিল)
১৯৭১ সালের ১৯ আগস্টের এই নিষ্ঠুর গণহত্যার স্মরণে গোলাম ছাত্তার নোমান, তপন কুমার ভৌমিক প্রমুখের প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে শহীদদের নাম খোদাই একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও শহীদ স্মৃতি সংসদ গড়ে উঠে। প্রতি বছর এই দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
[লেখক: গোলাম আকবর, সদস্য সচিব, নোয়াখালী মানবাধিকার জোট]
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): মুক্তিযুদ্ধে নোয়াখালী ;
প্রকাশ করা হয়েছে: নোয়াখালী'র সংবাদ বিভাগে ।
মুকুল বলেছেন:
লেখাটি নোয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত রবিউল হোসেন কচি সম্পাদিত "নোয়াখালী" স্মারকগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।
নাভদ বলেছেন:
ধন্যবাদ
আমি কে বলেছেন:
৫
ভাস্কর চৌধুরী বলেছেন:
৫
কায়েস মাহমুদ বলেছেন:
মুকুল ভাই ,ধন্যবাদ আপনাকে সব সময় নোয়াখালীর সংবাদ লিখেন।একজন নোয়াখালীর মানুষ হিসেবে আমার ও ভাল লাগছে।৫
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
কায়েস মাহমুদ তোমার জাকির নায়েক সম্পর্কে আসতাসে লেকা। হালায় একটা গিদ্দর
কায়েস মাহমুদ বলেছেন:
আইজউদ্দিন তোমার ইমেজ তো আগের চেয়ে ও ভয়ংকর লাগছে।
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
ক্যান?
মুকুল বলেছেন:
ধন্যবাদ @ নাভদ, আমি কে, ভাস্কর চৌধুরী, কায়েস মাহমুদবিশেষভাবে ধন্যবাদ পাবেন মূল লেখক গোলাম আকবর। লেখাটি দৈনিক ভোরের কাগজে ছাপা হয়েছিল। সালটা ঠিক মনে নেই।
ব্যক্তিগত পরিচয়ে লেখক আমার ভাই।

বুঝলাম না @ ডঃ আইজউদ্দিন
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
মুকুল না তোমারে কইনাই, কায়েসের লগে একটা হিসাব আচে। ৫ দিসি তোমারে। কেমিকাল মেইল চেক কর
মঙ্গল বলেছেন:
থ্যাংকু
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
নো প্রবলেম
কায়েস মাহমুদ বলেছেন:
আইজউদ্দিন তোমার চেহারা তো আগের চেয়ে ও ভয়ংকর লাগছে।আমার সাথে কি হিসাব আছে?
থাকলে শুরু কর।
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
করুম পড়তাসি জাকির নায়েক লইয়া পড়াটা কালকা বা পরসু সেষ হইবো তারপর হিসাব কিতাব
মুকুল বলেছেন:
এবার বুঝছি কেমিকেল ভাই।
মঙ্গল বলেছেন:
কায়েস দাদার জন্য শুভ-কামনা
কায়েস মাহমুদ বলেছেন:
ঠীক আছে হনুমান(আইজউদ্দিন)।@ আইজউদ্দিন, হাতি ঘোড়া গেল তল,ছাগলে বলে কত জল।
Dr. William Campbell (of USA) ও হেরেছেন,ভারতের অরুনসুরি হেরেছেন,পোপ ভেনেডিক্ট XVI ও হেরেছেন।আর তুমি হনুমান???
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
হ হারসেন বইলা প্রচার চলতাসে সুনলাম মাগার হেরা কোরান সম্পর্কে কতা কইলে তর্ক তামায় দেয় সুনলাম আর বেনেডিক্ট রে লগে কোন তর্ক হয়না। আর ত্রিভূজ কখন জলে নামল?
এস্কিমো বলেছেন:
ডাক্তার, বিতর্কটা এখানে না করলেই ভাল হতো।মুকুল,
উপরে যাদের নাম দিলেন, তাদের নাম খোদাই করে একটা ছোট খাট মনুমেন্ট বানানো যায় কিনা ভাববেন। সহায়তার দরকার হলে আছি। খুব বড় কিছু না হলেও একটা স্টোনের উপর করতে পারেন। আর কোন রাস্তার মোড়ে স্থাপন করা গেলে ভাল হয়।
এস্কিমো বলেছেন:
একটু সংশোধন - এই স্টোনটা কোন একজন নিহতের বাড়ীর রাস্তার মোড়ে বা সামনে বসানো যায় কিনা ভাবুন।
ডঃ আইজউদ্দিন বলেছেন:
সরি এস্কিমো
এস্কিমো বলেছেন:
ঠিকাছে!
মুকুল বলেছেন:
এস্কিমো ভাই, [১৯৭১ সালের ১৯ আগস্টের এই নিষ্ঠুর গণহত্যার স্মরণে গোলাম ছাত্তার নোমান, তপন কুমার ভৌমিক প্রমুখের প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে শহীদদের নাম খোদাই একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও শহীদ স্মৃতি সংসদ গড়ে উ
বিপ্লব রহমান বলেছেন:
শহীদদের আন্তরিক শ্রদ্ধা। মুকুল আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মুকুল বলেছেন:
আপনাকেও ধন্যবাদ @ বিপ্লব রহমান
রাশেদ বলেছেন:
শহীদদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল।
ডাক্তাড়' বলেছেন:
আবার ৫
বিষাক্ত মানুষ বলেছেন:
শহীদদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল। তাঁরা আত্মত্যাগ করেছিলো বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক ।
"সারসাইভুজ" বলেছেন:
শহীদদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল।


















