হুলিয়া ।। নির্মলেন্দু গুণ
২০ শে মে, ২০০৮ রাত ১১:৪১
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ্দুর--;
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল,
একজন পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল।
আমি সবাইকে মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন, কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কি আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনলো না।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি।
সেই একই ভাঙা পথ,
একই কালোমাটির আল ধরে গ্রামে ফেরা,
আমি কতদিন পর গ্রামে ফিরছি।
আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।
অনেক বদলে গেছে বাড়িটা,
টিনের চাল থেকে শুরু করে পুকুরের জল,
ফুলের বাগান থেকে শুরু করে গরুর গোয়াল;
চিহ্নমাত্র শৈশবের স্মৃতি যেন নেই কোনোখানে।
পড়ার ঘরের বারান্দায় নুয়ে পড়া বেলিফুলের গাছ থেকে
একটি লাউডুগী উত্তপ্ত দুপুরকে তার লকলকে জিভ দেখালো।
স্বতঃস্ফূর্ত মুখের দাড়ির মতো বাড়িটির চতুর্দিকে
ঘাস, জঙ্গল, গর্ত, আগাছার গাঢ় বন গড়ে উঠেছে অনায়াসে;
যেন সবখানেই সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে
এখানে শাসন করছে গোঁয়ার প্রকৃতি।
একটি শেয়াল একটি কুকুরের পাশে শুয়েছিল প্রায়,
আমাকে দেখেই পালালো একজন,
একজন গন্ধ শুঁকে নিয়ে আমাকে চিনতে চেষ্টা করলো
-- যেমন পুলিশ-সমেত চেকার তেজগাঁয়
আমাকে চিনতে চেষ্টা করেছিল।
হাঁটতে হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,
অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে যাওয়া অশোক,
একসময় কী ভীষণ ছায়া দিতো এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারতো এর ছায়ায়।
আমরা ভালোবাসার নামে একদিন সারারাত
এ গাছের ছায়ায় লুকিয়েছিলুম।
সেই বাসন্তী, আহা, সেই বাসন্তী এখন বিহারে,
ডাকাত স্বামীর ঘরে চার সন্তানের জননী হয়েছে।
পুকুরের জলে শব্দ উঠলো মাছের, আবার জিভ দেখালো সাপ,
শান্ত-স্থির-বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে
একটি প্লেন তখন উড়ে গেলো পশ্চিমে...।
আমি বাড়ির পেছন থেকে শব্দ করে
দরোজায় টোকা দিয়ে ডাকলুম, ‘মা’৷
বহুদিন যে দরোজা খোলেনি,
বহুদিন যে দরোজায় কোন কন্ঠস্বর ছিল না,
মরচে পরা সেই দরোজা মুহূর্তেই ক্যাচক্যাচ শব্দ করে খুলে গেলো।
বহুদিন চেষ্টা করেও যে গোয়েন্দা বিভাগ আমাকে ধরতে পারেনি,
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে, অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম;
সেই আমি কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম।
মা আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে
লুকিয়ে রেখে, অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে
পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন।
আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম,
দেখলুম দু’ঘরের মাঝামাঝি যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল,
সেখানে লেনিন, বাবার জমা খরচের পাশে কার্ল মার্কস;
আলমিরার একটি ভাঙ্গা কাচের অভাব পূরণ করছে
ক্রুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি।
মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহকুমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি।
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন,
পুনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে।
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য।
রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস।
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:
-- আমাদের ভবিষ্যত কী?
-- আইয়ুব খান এখন কোথায়?
-- শেখ মুজিব কি ভুল করেছেন?
-- আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?
আমি কিছুই বলবো না।
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখবো।
উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে
কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলবো:
‘আমি এ-সবের কিছুই জানি না,
আমি এ-সবের কিছুই বুঝি না’।
(কাব্যগ্রন্থ: প্রেমাংশুর রক্ত চাই, ১৯৭০ )
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): নির্মলেন্দু গুণ, হুলিয়া, নির্মলেন্দু গুণ, হুলিয়া ;
প্রকাশ করা হয়েছে: প্রিয় কবিতা বিভাগে ।
লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
নাজিম উদদীন বলেছেন:
খুব পছন্দের কবিতা। রফিজ নামে সত্যি একজন চা দোকানদার আছে। কিছুদিন আগে তাকে নিয়ে খবর দেখলাম।মুভিটাও খুবই ভাল লেগেছিল। লিন্ক থাকলে জানাবেন।
লেখক বলেছেন: তানভীর মোকাম্মেলের "হুলিয়া" শর্টফিল্মটাতে আমার বড় ভাই খুব ছোট্ট একটা দৃশ্যে ছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছিলাম। এখন পুরোপুরি মনে নেই।
লেখক বলেছেন: প্রতিদিন কি নিজের লেখা দেয়া যায় না কি!!! আমি অত লিখতে পারি না! ![]()
দ্বিধা বলেছেন:
"আমি কিছুই বলবো না।আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখবো।"
অসাধারণ...
লেখক বলেছেন: আমার খুবই প্রিয় কবিতা এটি। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
হনলুলু বলেছেন:
অসম্ভব প্রিয় কবিতা , অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম ......... সরাসরি প্রিয় পোস্টে .........
কিন্তু মুকুলদা, প্রথম প্যারায় -----
''আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ্দুর--;''
........ এরপরে ----- ''শনশন করছে হাওয়া ''.........
এই অংশটুকু কি আছে ? আমার কেমন যেন কনফিউশন হচ্ছে ..........
কবিতাটি দেয়ার জন্য আবারো ধন্যবাদ
লেখক বলেছেন: এই অংশটুকু ৫ম প্যারায় আছে।
"আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
আমার চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ,
শোঁ শোঁ করছে হাওয়া।"
নিলা বলেছেন:
মায়ের ভালোবাসা......পুরুনো ভালোবাসার সাক্ষি সেই গাছ......না জানা সেই ভবিষ্যত......পড়তে পড়তে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম। অনেক অনেক ভালো লাগলো কবিতাটা
লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ। সবার ভালো লাগলে কষ্ট করে টাইপ করাটা সার্থক মনে হয়। ![]()
ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক বলেছেন:
এই নির্মল বাবু একজন বড় ফ্যাতাড়ু। তারে আমরা বড় পেয়ার করি।তিনিও আমাদের মত ভাতের মাড় গেলেন।
আমরা এক কাতারের মানুষ।
- ফাঁৎ ফাঁৎ সাঁই সাঁই।
লেখক বলেছেন: আপনি বুঝি ভাতের মাড় গিলেন? পঁচাটা না কি!!! ![]()
লেখক বলেছেন: তুমারেও পেলাচ ![]()
একরামুল হক শামীম বলেছেন:
আমি কিছুই বলবো না।
আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে চেয়ে দেখবো।
উৎকন্ঠিত চোখে চোখে নামবে কালো অন্ধকার, আমি চিৎকার করে
কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলবো:
‘আমি এ-সবের কিছুই জানি না,
আমি এ-সবের কিছুই বুঝি না’।
লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ শামীম ![]()
লেখক বলেছেন: তানভীর মোকাম্মেলের "হুলিয়া" শর্টফিল্মটাতে আমার বড় ভাই খুব ছোট্ট একটা দৃশ্যে ছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছিলাম। এখন পুরোপুরি মনে নেই।
রাশেদ বলেছেন:
থ্যাঙ্কস।
লেখক বলেছেন: থ্যাঙ্কু রাশু ![]()
লেখক বলেছেন: আপনারেও থ্যাঙ্কু ব্রো ![]()
আশরাফ মাহমুদ বলেছেন:
কিযে ভালো লাগল...... জল এসে গেল চোখে।
লেখক বলেছেন: আমারও খুবই প্রিয় কবিতা এটি
লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ ![]()
সুলতানা শিরীন সাজি বলেছেন:
হাঁটতে হাঁটতে একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম,অশোক গাছ, বাষট্টির ঝড়ে ভেঙে যাওয়া অশোক,
একসময় কী ভীষণ ছায়া দিতো এই গাছটা;
অনায়াসে দু’জন মানুষ মিশে থাকতে পারতো এর ছায়ায়
......................।
ভীষন প্রিয় একটা কবিতা।
এই লাইন গুলো মাঝে মাঝেই আওড়াই।
কি অদ্ভুত যে !
ধন্যবাদ শেয়ার করবার জন্য।
শুভেচ্ছা নাও।
লেখক বলেছেন: সাজি'পু, এর আগের পোস্টে নতুন একটা কবিতা দিয়েছি। পড়েছো?
অক্ষর বলেছেন:
(আমিরুজ্জামান)
লেখক বলেছেন: হা হা হা। (আমিরুজ্জামান) ![]()
আরিফুর রহমান বলেছেন:
হুমমম... মনে পড়ে গেল!
লেখক বলেছেন: হু ম ম। ধন্যবাদ। ![]()
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ রাতিফ ![]()
রেটিং বলেছেন:
কবিতাটা আমআর খুব পছন্দের। *****
লেখক বলেছেন: নিজের ছবি দিলেন!!! সুন্দর ছবি। ![]()
উত্তরাধিকার বলেছেন:
মুকুল,এই কালজয়ী কবিতাটা শেয়ার করার জন্য নিরন্তর শুভেচ্ছা।
সামনে একটা প্রোগ্রাম আছে।
আমি মনে মনে কবিতাটা খুঁজছিলাম। হাতের কাছে বইটাও নাই।
আর আপনার বাড়ী এসে দেখি আপনি তাই নিয়ে হাজির।
আরে মশাই, কি করে জানলেন সে খবর...?
আন্তরিক ধন্যবাদ।
শুভেচ্ছা নিন।
লেখক বলেছেন: হু ম ম। এবার বুঝছেন, পীর কারো গায়ে লেখা থাকে না। ভাবে বুঝে নিতে হয়! ![]()
প্রণব আচার্য বলেছেন:
সেই বাসন্তী, আহা, সেই বাসন্তী এখন বিহারে,ডাকাত স্বামীর ঘরে চার সন্তানের জননী হয়েছে।...
লেখক বলেছেন: ব্যাপার কি? দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলাম মনে হলো! ![]()
রাতমজুর বলেছেন:
৫+, শোকেসে
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। ![]()
পথিক!!!!!!! বলেছেন:
এ কবিতার পরই মেডিক্যাল পড়া বন্ধ হয়ে গেল কবি গুণের .......ডাক্তার হওয়া হলো না আর ..........
বাস্তব চিত্র তার সে সময়ের স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এ কবিতায়
লেখক বলেছেন: নতুন তথ্য জানলাম। আপনাকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। ![]()
আশরাফ মাহমুদ বলেছেন:
নতুন কবিতা কই। দাবি মানতে হবে।
লেখক বলেছেন: নতুন কোন লাইন মাথায় আসছে না। আমি মনে হয় আর লিখতে পারবো না! ![]()
(কুট্টিকালের একটা কবিতা পাইছি। দিয়া দিমু ভাবতেছি)
আজহার ফরহাদ বলেছেন:
এককালের তোলপাড় করা কবিতা।
লেখক বলেছেন: এখনো ভালো লাগে ভীষণ...
লেখক বলেছেন: আপনাকেও ধন্যবাদ...
হ্যারি সেলডন বলেছেন:
বেশিরভাগ কবিতাই বুঝিনা। এটা বুঝলাম এবং ভাল লাগল।
লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ...
হমপগ্র বলেছেন:
কতবার পড়েছি!
লেখক বলেছেন: আবারও পড়ার জন্য ধন্যবাদ ![]()


















