সেনাবাহিনী থেকে বিদায় নিলেও জেনারেল মাসুদ উদ্দিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে বহাল:
এক-এগারোর ঘটনায় জেনারেল মইনের অন্যতম সহযোগী লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (বিএ নম্বর-১১৯৫) এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর অন্যতম পরিচয় তিনি বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা। এ পরিচয়টি চারদলীয় জোট সরকার আমলে তাঁর দ্রুত পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নে সহযোগিতা করে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা। এক-এগারোর ঘটনার সময় তিনি সাভারে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন এবং তিনিই তাঁর অধীন ব্যাটালিয়নের সহযোগিতায় বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এক-এগারোর পর মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী লে. জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে জরুরি অবস্থার শেষ দিকে ২০০৮ সালের ২ জুন তাঁকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার থেকে সরিয়ে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে বদলির ঘটনায় এ আভাস পাওয়া যায় যে, জেনারেল মইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। এরপর এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে দ্বিতীয়বার বদলি করে তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। এরপর তিনি অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান এবং পদে বহাল থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীতে তাঁর চাকরির মেয়াদ দুই দফায় ছয় মাস বাড়ানো হয়। সেনাবাহিনী থেকে লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার তারিখ ছিল গত ২৯ জুন। ওই দিন তাঁর বয়স ৫৭ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে সেনাবাহিনীতে তাঁর চাকরির মেয়াদ প্রথমে ২৯ সেপ্টেম্বর এবং পরে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ দিন তাঁর ৫৭ বছর ছয় মাস বয়সে সেনাবাহিনী থেকে অবসর দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সেনাবাহিনী থেকে অবসর পেলেও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসেবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজেও কালের কণ্ঠকে তাঁর চাকরিসংক্রান্ত এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ রয়েছে যে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর উপস্থিতিতেই তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এসব অভিযোগ সম্প্রতি উইকিলিকস যেসব মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করেছে, তার বাংলাদেশ অংশে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ অভিযোগ সত্য নয় বলে কালের কণ্ঠকে জানান। গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'তারেক রহমানকে নির্যাতন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। এ বিষয়ে আমার সম্পৃক্ততার প্রশ্নই আসে না।'
মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন :
এক-এগারো সংঘটনে জেনারেল মইনের আরেক সহযোগী মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন এখন দুবাইতে থাকেন। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক আসামি। সরকারি নথিতে এ টি এম আমিনের স্থায়ী ঠিকানা মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার ষোলঘর গ্রামে। কালের কণ্ঠের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধিকে তাঁরা জানান, ওই গ্রামে এ টি এম আমিনের নানার বাড়ি ছিল। বাবার বাড়ি সম্ভবত ফরিদপুরে। অস্থায়ী ঠিকানাটি ঢাকার বনানীর ন্যাম ভিলেজ অ্যাপার্টমেন্টের। এই অ্যাপার্টমেন্টের গার্ড শহীদুল ইসলাম গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, 'তিন বছর আগে জেনারেল আমিন এখানে যে ফ্ল্যাটে থাকতেন সেখানে এখন থাকেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু বকর সিদ্দিক।'
এদিকে উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ টি এম আমিনের অবস্থান প্রথাগত বাঙালি সংস্কৃতির বিপরীতে বলে ধারণা করতেন। ২০০৮ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাঠানো তারবার্তায় তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি শেখ হাসনিার এ ধারণার কথা উল্লেখ করেন। তারবার্তায় জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচারের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, আমিন চরম উগ্র ইসলামপন্থী। বিপজ্জনক লোক। তিনি ডিজিএফআইয়ের প্রধান হতে চান। উইকিলিকসের তথ্যে আরো আছে, জেমস এফ মরিয়ার্টি ২০০৮ সালের ১৬ অক্টোবর ওয়াশিংটনে গোপন তারবার্তায় জানান, এ টি এম আমিন ১৫ অক্টোবর তাঁর ও তাঁদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন 'হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ'কে আইডিপি বা ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে ডিজিএফআইয়ের উদ্যোগের পক্ষে নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এ টি এম আমিন জরুরি অবস্থার শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং আনসারের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হলে তিনি সে চাকরি গ্রহণ না করে অবসরে চলে যান।
বহুল আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় এ টি এম আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ওই মামলার আসামি মাওলানা তাজউদ্দিনকে বাদল পরিচয়ের পাসপোর্টের মাধ্যমে পাকিস্তানে পালানোর সুযোগ করে দেন। এ ছাড়া মাওলানা তাজউদ্দিনের বড় ভাই আবদুস সালাম পিন্টুকে গ্রেপ্তার করার কারণে এ মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি ফজলুল কবীরকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী :
এক-এগারোতে জেনারেল মইনের আরেক সহযোগী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী (বিএ নম্বর-২১৫১) এখন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারীর অবসরসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল। কিন্তু পরে জানা যায়, ওই আদেশ পরিবর্তন করে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক-এগারোতে বঙ্গভবনে জেনারেল মইনের সঙ্গে ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে সরাসরি হাজির ছিলেন বারী। জরুরি অবস্থার মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ছিলেন রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীদের কাছে আতঙ্কিত একটি নাম। বর্তমান সরকার আমলে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের ওপর বোমা হামলার ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি লে. কর্নেল (অব.) আবদুর রশীদের মেয়ে মেহনাজ গ্রেপ্তার হলে বারীর সে সময়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরো অনেক নতুন তথ্য উন্মোচিত হয়। মেহনাজের দাবি অনুযায়ী বারী তাঁকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছিলেন। মেহনাজকে বিয়ে করাকে কেন্দ্র করেই টানাপড়েন শুরু হয় ব্রিগেডিয়ার বারীর সংসারে। এ ব্যাপারে বারীর বিরুদ্ধে তাঁর প্রথম স্ত্রী অভিযোগ করেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের কাছে। মেহনাজ গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে সময় আরো জানান, ওয়ান-ইলেভেনের পর 'মাইনাস টু' ফর্মুলা বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বারী ফ্রিডম পার্টিকেও পুনর্গঠনের পরামর্শ দেন। মেহনাজকে বারী বলেন, 'মাইনাস টু' ফর্মুলা কার্যকর হলে দেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগ বলতে কিছু থাকবে না। ফ্রিডম পার্টি ক্ষমতায় থাকবে। তখন চাকরি ছেড়ে তিনিও ফ্রিডম পার্টিতে যোগদান করবেন। ব্রিগেডিয়ার বারী একসময় সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের কাছেও সন্দেহজনক লোক হিসেবে বিবেচিত হলে তিনি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধূুরীর সঙ্গে হাত মেলান। এ সময় জেনারেল মইন বারীকে ডিজিএফআই থেকে সরিয়ে প্রথমে সেনাসদরে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক অ্যাটাশে করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারীর ভাই চৌধুরী আশরাফুল বারী গতকাল তাঁর ভাই সম্পর্কে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'তাঁর টেলিফোন নম্বর আমার জানা নেই। নিউ ইয়র্ক থেকে আমাদের সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হয়। তিনি নিউ ইয়র্কে দুই সন্তান ও স্ত্রীসহ অবস্থান করছেন।'

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



