আজ ৩০ জুলাই জাতীয় অধ্যাপক, দাবাগুরু, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনে ১১০তম জন্মদিন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি ১৮৯৭ সালের এই দিনে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃকবাড়ি ফরদিপুর জেলার পাংশা থানার বাগমারা গ্রামে।
মেধাবি মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবনে প্রায় সব পরীক্ষাতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিত্র পরীক্ষাতে বাংলা ও আসাম জোনে প্রথমস্থান দখল করে মাসিক ৩০ টাকা বৃত্তিলাভ করেন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে এমএ পাস করেন। উল্লেখ্য, সে বছর কেউ প্রথমশ্রেণি পান নি।
কাজী মোতাহার হোসেনের পূর্বপুরুষ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে দিল্লি দরবারের ধর্মীয় উপদেষ্টা ও বিচারক বা কাজী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে তারা জৌনপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রখ্যাত আলেম, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারক মওলানা কেরামত আলী জৌনপুরি ছিলেন এদের আত্মীয়। কাজীরা পরে মির্জাপুর, বাগেরহাট হয়ে ইসলাম প্রচার করতে করতে ফরিদপুর জেলার হাবাশপুরে বসবাস শুরু করেন। প্রায় দুই শতাব্দী আগে কাজী আতাউল্লাহ নিকটবর্তী বাগমারা গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন ১৯২০ সালের ১০ অক্টোবর সাজেদা খাতুনের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কাজী দম্পতির চার ছেলে সাত কন্যার মধ্যে বর্তমানে এক ছেলে ও চার কন্যা জীবিত। ছেলে ও মেয়েদের প্রায় সবাই জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড.সনজীদা খাতুন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্র সংগীতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। কাজী আনোয়ার হোসেন জনপ্রিয় স্পাইথ্রিলার সিরিজ ‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা। গত বছর প্রয়াত কনিষ্ঠ ছেলে কাজী মাহবুব হোসেনও অনুবাদ সাহিত্যে সুপ্রিতিষ্ঠিত । বাংলাভাষায় তিনি প্রথম ওয়েস্টার্ন কাহিনি অনুবাদ করে উপহার দেন। বেগম মোতাহার হোসেনও শিল্পসাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন।
এমএ ক্লাসের ছাত্র থাকাকালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ডেমোনেস্ট্রেটর পদে চাকরিতে নিযুক্ত হন। এমএ পাস করার পর তিনি পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার পদ লাভ করেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকালীন ১৯৩৮ সালে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আগ্রহ ও পরামর্শে কলকাতায় ড. প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের অধীনে স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে সংখ্যাতত্ত্ব বিষয়ে লেখাপড়া করে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতত্ত্ব পড়ানোর ভার নেন এবং সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এ দেশে সংখ্যাতত্ত্ব পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে তিনিই ১৯৫০ সালে ‘ডিজাইন অভ এক্সপেরিমেন্টস’ বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কাজী মোতাহার হোসেন উদ্ভাবিত পদ্ধতি ‘হোসেইনস্ চেইন রুল’ নামে অভিহিত হয়েছে। ১৯৫৪ সালে তিনি ‘প্রফেসর’ পদ লাভ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ‘ডিন’ ছিলেন। ১৯৬৪ সালে কাজী মোতাহার হোসেন সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরে তাকে ‘সুপারনিউমেরারি প্রফেসর অব স্ট্যাটিস্টিক’ পদে নিযুক্ত করা হয়। ইতিপূর্বে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইএসআরটি) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর এমিরিটাস’ পদে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে তাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ (ডিএসসি) ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালে তাকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় অধ্যাপক’-এর মর্যাদা দেওয়া হয়। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু। দাবাগুরু মোতাহার হোসেন ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত একনাগাড়ে প্রায় ৩০ বছর অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে দাবায় তার সাফল্য প্রশংসনীয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার দাবা খেলার সাথী ছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্যচর্চার সূচনা হয় কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ছাত্রাবস্থায়ই। তার আদর্শ শিক্ষক জোতিন্দ্রমোহন রায়ের উৎসাহ ও প্রেরণাতেই তার লেখায় হাতেখড়ি। তার প্রথম প্রকাশিত রচনার নাম ‘গ্যালিলিও’। এটি ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তার একমাত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘সঞ্চারণ’ সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিক ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতার ব্যাপারে দুজনের সম্পর্ক নিবিড় হয়। সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হয় ১৯২৭ সালে। বছরের গোড়ার দিকে নজরুল ঢাকায় আসেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য। নজরুল আদর করে মোতাহারকে ডাকতেন ‘মোতিহার’। ড. কাজী মোতাহার হোসেন নজরুল সম্পর্কে অনেক প্রবন্ধ ও একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর তিনি ৮৪ বছর বয়সে ঢাকায় বিদ্যালোকিত বর্ণিল জীবনের ইতি টেনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরম শ্রদ্ধায় আজ তাঁকে স্মরণ করছি।
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?
কর্মসংস্থান? না।
বিনিয়োগ? না।
ডলার সংকট? না।
গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।
ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।