আজিমের বউ (১ম অংশ)
কাজী আনোয়ার হোসেন
------------------
১.আপন মনে গুনগুন সুর ভাঁজছে মিতা শাহনাজ, তৈরি হচ্ছে স্কুলের জন্য। কাল একটু রাত জেগে পরীক্ষার খাতাগুলো দেখে রাখায় সকালে কাজের চাপ একদম নেই। সদ্য পাটভাঙা, লালপেড়ে, সুন্দর একটা সুতির ছাপা শাড়ি পরেছে ও আজ; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোখোঁপায় গোটা কয়েক কাঁটা গুঁজে নিয়ে পাউডারের পাফ বুলাচ্ছে নাকে-মুখে। মর্নিং শিফটে বাচ্চাদের দুটো ক্লাস নিয়ে ফিরে আসবে,গোসল-খাওয়া সারবে বাসায়, তারপর আবার ডে শিফটে সেভেন-এইটের দুটো ক্লাস নেবে দুটো থেকে চারটে পর্যš-। ব্যস, ছুট্টি। খাতা-কলম, র্যাপিড রিডার, সবুজ সাথী, ড্রইংবক্স সব ওর বুটিক-ব্যাগে পুরে ওটা কাঁধে ঝুলাতে যাবে, এমনি সময় ঝনঝন শব্দে বাজল টেলিফোন। কেন জানি ওর মনটা আগাম গাইল: হয়তো খারাপ কোনও খবর। ভয়ে ভয়ে রিসিভার কানে তুলল ও। ‘কে কও? মিতা?’ নানীজির কাঁপা গলা। এই রসিক বৃদ্ধাকে ওর ভারি পছন্দ। এ-শহরে টিচার হয়ে এসে প্রথম ছয়টা মাস পেয়িং গেস্ট হিসেবে ছিল ও এঁদের পরিবারে, বিশেষ করে এঁর মধুর, ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে। এখনও নানীজির বাড়িতে যখন-তখন ওর অবাধ যাতায়াত। ও-বাড়ির সবকিছুতে ওকে থাকতেই হবে, কোনও অনুষ্ঠানে যদি না যায়, নানীজি নিজে চলে আসেন নিতে। মিতার সাড়া পাওয়ামাত্র রেলগাড়ি ছুটালেন নানীজি। ‘কী বিয়াপার, মিতা, ভুইলা গেছো নিকি আমাগো? আহো না যে? অসুক-বিসুক অইল নিকি আবার? এক সাপ্তা গেল গা, পাত্তাই নাই!’ প্রথমে বাঁধা-ধরা অনুযোগ সেরে নিয়ে এইবার শুরু করলেন নানীজি পুরো খবর, ‘এইদিকের গটনা জানো না, মিতা? আজিম তো আইতাছে। সইন্ধ্যার গাড়িতে আইব, আগামী কাইল।’ একটু ইত¯-ত করলেন তিনি, তারপর বলে ফেললেন আসল খবর, ‘বউ নিয়া আইতাছে আজিম।...কী কইলা?...হ, বউ নিয়া। ঢাকা থেইকা ফোন করছিল আমারে কাইল অনেক রাইতে। হাতে এক্কেরে সময় নাই। কও দেহি, তারাহুরা কইরা আমরা অহন কী ব্যব¯-া করি! বাড়ির হগলতে এক্কেরে পেরেশান হইয়া পড়ছে। আইজ বিকালে পারিবারিক মীটিন। তুমি আইজ ইসকুল থেইকা সিদা আমাগো এইহানে আইসা পড়ো। হগলতে মিলা বুদ্দি-পরামশ্য কইরা দেহি কী করা যায়।...কী কইলা?...হ, এই বাড়ির হগলতে তো থাকবই, কয়জন আপ্তীয়-স্বজনরেও ডাকুম।...কী কইলা?...পিট্টি লাগামু কইলাম! তুমি আপ্তীয়রও বেশি, তুমি একটুও দেরি করবা না, মিতা। একটা আয়োজন করতে হইলে...’ বলেই চললেন নানীজি। বাড়িঘর গোছগাছ করা, নাতি-নাতবৌয়ের জন্য সুন্দর করে একটা ঘর সাজানো, বাড়ির বাইরের আলোকসজ্জা, খানাপিনার ব্যবস্থা, ডেকোরেটরের সঙ্গে কথা বলাÑহ্যাঁ, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে, সময় কম। রিসিভার কানে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে মিতা। বাগানের লাল-নীল-হলুদ ফুলগুলো রঙ হারিয়ে কেমন মলিন হয়ে গেছে, এক রঙ অন্য রঙে মিলেমিশে ঝাপসা। ফোন ছেড়ে জানালার সিক ধরল মিতা। মনে হচ্ছে কণ্ঠনালীর কাছে এসে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা, চিš-াগুলো অস্পষ্ট। ধীরে ধীরে কিছুটা রঙ ফিরে এলো ফুলে, মাতালের মত ঢলাঢলি কমল ওদের। মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়ে আসতে নির্জলা, নিষ্ঠুর, বা¯-ব সত্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ওর কাছে: ব্যাপারটা ঘটল তা হলে, বিয়ে করে ফেলল আজিম। ভয় ছিল, এমনটা হতে পারেÑকিন্তু সত্যি সত্যি ঘটেই গেল! আগে থেকে বলল না, মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার একটু সুযোগও দিল না ওকে! একটু ভাবল না ওর কথা! সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর এলো নিজেরই মন থেকে। কেন ভাববে? বিরাট ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র, নিজেও গতবছর এমবিএ পাশ করে নেমে পড়েছে ব্যবসায়, অল্পদিনের মধ্যেই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে আলাদা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; উনত্রিশ বছরের তরতাজা, স্বাস্থ্যবান যুবক; যেমন দেখতে-শুনতে, তেমনি ছোট-বড় সবার সঙ্গে ভদ্র, স্বতঃস্ফূর্ত, মিষ্টি ব্যবহার; পরিবারের সবার আদরের ধন, চোখের মণি, কলজের টুকরোÑসে কেন ওর মত সাধারণ এক স্কুল টিচারের কথা ভাবতে যাবে? কিন্তু তা হলে আগে যেখানে ঢাকা থেকে বছরে একবার বেড়াতে আসত, গত দেড়টা বছর প্রতিমাসেই ছুটে এসেছে কেন ও নানা-বাড়িতে? আর এসেই কেন হই-হই করে খোঁজ করেছে মিতার? ছুটির কটা দিন ওর সঙ্গে হাসি-গল্পে মহানন্দে কাটিয়ে দিয়ে কেন প্রতিবার মন খারাপ করে ফিরে গেছে ঢাকায়? এর উত্তর জানা নেই মিতার। ও অবশ্য বরাবর ভদ্র দূরত্ব বজায় রেখেছে, এরকম একটা ভয় ছিল বলেই তীক্ষè উপস্থিতবুদ্ধির কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে নিজেকে, সহজ বন্ধুত্ব হিসেবে হালকা করে দেখেছে সম্পর্কটাকে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে ওরা নদীর তীর ধরে অনেক, অনেকদূরÑকিন্তু হাত ধরেনি কেউ কারও। মুখ ফুটে কেউ বলেনি কিছু। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে মিতা, মনের গভীরে কোন আশাই দানা বাঁধেনি ওর? ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস পড়ল।Ñনা, তা বলতে পারবে না। যাক, এখন কিছুতেই কিছু এসে যায় না। টেনিসনের লাইনটা মনে পড়ছে: ‘সুখের দিনগুলো স্মরণ করলে চরমে পৌঁছবে তোমার দুঃখ।’ ভুলে যাও, ভুলে যাও।
২.স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই সচকিত হলো মিতা। কর্তব্য যখন বেদনার কাঁধে হাত রেখে সাš-¡না দিয়ে বলে: ‘আরে, দূর, বাদ দাও তো! কাজ পড়ে আছে না তোমার!’ তখন সে-কথায় কান দেওয়াই ভালো। বেরিয়ে পড়ল ইতি। ইঁট বসানো সরু পথের ওপর ঘন হয়ে বিছিয়ে রয়েছে ইউক্যালিপ্টাসের শুকনো ঝরা পাতা। একটু এগিয়ে বামে বাঁক নিয়ে একশো গজ গেলেই স্কুল। দু’বছর হলো বিধবা মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে চাকরি নিয়ে এসেছে ও এখানে। এখন মনে হয় কত যুগ ধরে যেন আছে ও এই শহরে। ছোট্ট একটা মেয়ে ইউক্যালিপ্টাসের ফরসা গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিল তার প্রিয় আপার জন্য, মিতা কাছে আসতেই দৌড়ে এসে ভেজা-ভেজা কচি হাত দিয়ে ধরল ওর হাত। ‘আচ্ছা, মিতাপা, ঘাসফড়িংগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় যায়?’ ‘আমি জানি না তো, বেনু সোনা।’ আনমনে জবাব দিল মিতা। অতীতে চলে গেছে ওর মন। বি.এ. পাশ করে চাকরি নিয়ে ও যখন পাকশিতে আসে, ওর তখন তেইশ, আজিমের সাতাশ। একমাসও হয়নি নানীজির বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে আছে, এমনি সময়ে ঢাকা থেকে এলো সবার প্রিয়, পরিবারের হিরো আজিম আহমেদ। এসেই সন্ধ্যায় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘ভউ’ করে ওকে ভয় দেখিয়ে নতুন মানুষ দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। লজ্জায় লাল। দৃশ্যটা মনে পড়ায় হাসি এসে গেল ঠোঁটে। মিতার হাসি দেখে ছোট্ট মেয়েটা ওর হাতটা নিয়ে নিজের গালে ঠেকাল। ‘আচ্ছা, আপা, তুমি লাল রসগোলা বানাতে পারো?’ ‘না, সোনা।’ ছোটবেলায় মা হারিয়ে আজিম আর ওর বড় বোন শাš-া নানীবাড়িতে মানুষ হয়েছে সাত-আট বছর। তারপর ওদের বাবা এনাম আহমেদ দুজনকে ঢাকায় নিয়ে যান। শাš-ার বিয়ে হয়ে যায় সেই বছরই, আজিম মন দেয় লেখাপড়ায়। কিন্তু নানীবাড়ির হাসিখুশি খোলামেলা পরিবেশের আকর্ষণে প্রতি বছরই গরমের ছুটিতে ছুটে চলে আসে ও এখানে। গত সতেরো বছর ধরে এর কোন হেরফের হয়নি। কিন্তু মিতার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই এসেছে ও পাকশিতে, হাসি-গল্পে মাতিয়ে দিয়ে গেছে সবাইকে। গল্প করতে গিয়ে দুজনেই আবিষ্কার করেছে অদ্ভুত মিল রয়েছে ওদের দুজনের রুচিতে, চিš-ায়, মন-মানসিকতায়। ‘মিতাপা, আমার জন্মদিন জুলাই নাকি জুনমাসে ভুলে গেছি।’ ‘ভাল করেছ, সোনা।’ গত বছর এমবিএ পাশ করে বাবার ব্যবসায় যোগ না দিয়ে নিজেই আলাদা ব্যবসায় নেমে এক বছরে অনেক উন্নতি করেছে আজিম। গত ছ’টা মাস প্রতিবার যখন এসেছে, ওর জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে এসেছে, ওর কাছে সেটা ভাল লাগলে মনে হয়েছে ধন্য হয়ে গেছে আজিম। নানাবাড়ির জমজমাট গল্পের আসরে ইদানীং মাঝেমাঝেই মামা-মামী-খালা-খালুরা ওর বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন, আজিম কোন জবাব দেয়নি, লাজুক হেসেছে, আর চোরা চোখে তাকিয়েছে মিতার দিকে। ‘আচ্ছা, আপা, এই শহরে কি বাঘ আছে?’ ‘না, সোনা।’ ‘ভালুক?’ ‘নাহ্!’ এই তো কদিন আগে হঠাৎ আজিমের একটা দীর্ঘ চিঠি এলো মিতার বাসার ঠিকানায়। ওতে নানান কথার শেষে লেখা ছিল কী যেন বলবে ও মিতাকে আগামীবার পাকশি এসে। এখন বোঝা গেল কী বলতে চেয়েছিল। অথচ ও ভেবেছিল, হয়তো...রাগ হচ্ছে মিতার নিজের ওপর, আঘাত লাগছে আত্মসম্মানে, কেন খুশি হয়ে উঠেছিল ওর গোটা অ¯ি-ত্ব? কী ভেবে? ভাগ্যিস কোন উত্তর লিখে নিজেকে খেলো করে ফেলেনি ও! ক্লাসে পৌঁছে রুটিন কাজের মধ্যে কিছুটা স্ব¯ি- খুঁজে পেল মিতা। প্রথমেই ব্যাগটা ডেস্কের ওপর নামিয়ে বই-খাতা বের করে সাজিয়ে রাখল। গত কদিন ধরেই ছাত্র-ছাত্রীদের ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি মুখস্থ করাচ্ছে, বলল, ‘জাহাঙ্গির, যেটুকু শিখিয়েছি খাতা না দেখে বলো তো শুনি!’ সোৎসাহে শুরু করল জাহাঙ্গির: বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? এটুকু বলতেই উঠে দাঁড়াল বেনু। ‘আপা, আমি বলি?’ ‘ওর বলা হয়ে যাক, বেনু, তারপর। কেমন?’ বেনুর আবৃত্তি শেষ হতেই ‘গুড’ বলে চক নিয়ে ব্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইতি। আজ আরও দুটো চরণ লিখল: ভুঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল, মাড়াসনে মা, পুকুর থেকে আনবি যখন জল।
৩. প্রায় সবাই হাজির। দোতলায় নানীজির শোবার ঘরে কেউ চেয়ারে, কেউ লম্বা বেঞ্চে, কেউ খাটে, কেউ টুলেÑযে যেখানে পেরেছে বসেছে। মিতা পৌঁছতে ওকে ডেকে নিজের ইজিচেয়ারের পাশে একটা গদি আঁটা মোড়ায় বসালেন নানীজি। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আলোচনা। ছোটখালার ইচ্ছে সামনের আঙিনায় প্যান্ডেল টাঙানো হোক। মেজোখালার ইচ্ছে শহরের সবাইকে দাওয়াত করা হোক। মেজো মামা আপত্তি করলেন: ভোজ লাগানোর কোন দরকার নেই, বিয়ে হয়ে গেছে, এখন শুধু আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে চা-বিস্কিটের একটা সম্বর্ধনা হলেই যথেষ্ট। নানীজি বললেন: মোরগ পোলাওয়ের লগে আর কী-কী থাকবো, হেইটা নিয়া চিš-া করো। বড়খালা বললেন: টিকিয়া, বোরহানী আর খাসীর কালিয়া। আর মুরগীর রোস্টÑজিভ টেনে বলল ছোট্ট ইরিনা। এইবার ছোটরা কাঁইমাই শুরু করল। পুবের বড় বেডরূমটা সাজানো হবে আজিম ভাই আর ভাবীর জন্য। ফুলের দায়িত্ব থাকবে অলকের ওপর, কাগজ-কাটা সাজসজ্জার ভার নিতু ভাবীর ওপর। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবে ছোটখালু। কেনা-কাটা, প্যান্ডেল, বাবুর্চি-বেয়ারা এসবের ভার নিলেন বড়মামা। ‘ডিনার সেট, পেট, গাস এসব ভাড়া না করে নানুর আলমারি থেকেÑ’ এর বেশি আর বলতে পারল না মেজখালার মেয়ে নাসিমা; বাঙাল ভাষায় ফুঁসে উঠলেন নানীজি। ‘খবরদার! আমার কইলজা হাতরাইয়া কিছু যদি বাইর করবি, নলী বাইঙ্গা ফালামু কোলাম!’ ‘ধরতে পারলে তো!’ বলল অলক। ‘দৌড়ে তুমি পারবে আমাদের সঙ্গে?’ হাসলেন নানীজি, তারপর ভুরু কুঁচকে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘আলমারিতে চোখ দিবি না, ব্যস, কোইয়া দিলাম!’ ‘আচ্ছা, চায়নিজ করলে কেমন হয়?’ নতুন এক প্র¯-াব তুলল বড়খালার ছোটমেয়ে রুবি। ‘হল ভাড়া নিয়েÑ’ ‘খুব খারাপ হয়,’ জবাব এলো তারই মায়ের কাছ থেকে। ‘কেন?’ জানতে চাইল তাঁর আরেক মেয়ে। ‘আমি তো উপর-নিচ করতেÑ’ বলতে নিয়েছিলেন নানীজি, কিন্তু কথা শেষ করবার আগেই প্র¯-াব উইথড্র করে নিল রুবি। ‘আমি ভাবছিলাম, যদি ঢাকার পশ্ এলাকার আল্ট্রা মডার্ন মেয়ে হয়,’ ব্যাখ্যা দিল রুবি, ‘তা হলে আমরা ভাবীকে দেখিয়ে দিতে পারতাম, এখানে আমরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।’ নতুন আইডিয়া খেলল তরুণ ফটোগ্রাফার বাবলুর মাথায়: ‘গেটের ওপর আজিম ভাইয়ের একটা ছবি এনলার্জ করে টানিয়ে দিলে কেমন হয়?’ ‘খুব ভাল হয়,’ বলল মিতা। ‘কাবাবঘরের গেটে যেমন খাসীর ছবি টাঙানো থাকে, তাই না?’ সবাই হো-হো করে হেসে ওঠায় লজ্জা পেয়ে মিতা আপারই আঁচল তলায় লুকাল বাবলু। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল মিতা। চা-না¯-ার ফাঁকে-ফাঁকে ঘণ্টা দুয়েক আলোচনা, হাসি-তামাশা আর গল্প-গুজব চলল, সবার সঙ্গে সমান তালে আড্ডা দিল মিতাও। প্রত্যেককে যার-যার দায়িত্ব বেঁটে দিলেন নানীজি, এমন কি ছোট্ট ইরিনাও পেল একটা পান-সুপারী সাজানো থালার দায়িত্ব। মিতার ওপর পড়ল বাদাম-পে¯-া দেওয়া শরবত তৈরি করা এবং সবাই ঠিক মত পেল কিনা দেখবার দায়িত্ব। পরদিন দুপুরে আসবে কথা দিয়ে বাসায় ফিরে গেল ও।
৪. পরদিন শুক্রবার। স্কুল নেই। সন্ধের আগেই নানীজির প্রশ¯- রান্নাঘরের কোণে টেবিলের উপর রাখা একটা কল লাগানো ড্রামে কুচি করা বাদাম-পে¯-া দেওয়া মিষ্টি দইয়ের শরবত বানিয়ে ফেলল মিতা। বড় দেখে তিনটে বরফের চাঁই ছাড়ল ওতে। বর-কনে পৌঁছে গেলেই গাসে-গাসে ঢালা হবে শরবত। তখনও ওর হাজির থাকতে হবে, কারণ কল খুলে ঢালার আগে বড় হাতা দিয়ে আচ্ছামত গুলাতে হবে, দেখতে হবে মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না। কাপড় পাল্টে আসছি বলে ঘরে ফিরে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল মিতা। কিচ্ছু ভাল লাগছে না, উঠে দাঁড়াবারও শক্তি নেই শরীরে। বুক ভেঙে উঠে আসতে চাইছে কাঁপা-কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। আধঘণ্টা শিথিল ভঙ্গিতে পড়ে থেকে, নিজেকে চোখ রাঙিয়ে অনেক কষ্টে তুলল ও বিছানা থেকে। শথ ভঙ্গিতে সাদামাঠা একটা শাড়ি পরল ও, কাজল দিল চোখে, মুখে হালকা পাউডার বুলিয়ে, কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ পরেই রওনা হলো আলো-ঝলমল বাড়িটার দিকে। অভ্যাগতরা আসতে শুরু করেছেন। দূর থেকে ট্রেনের সিটি কানে আসতেই ধক্ করে উঠল মিতার বুকের ভিতরটা। ওই, আসছে ওরা! বড় মামা গাড়ি নিয়ে গেছেন ওদের আনতে। ওর ইচ্ছে হলো ঝোপে-জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে পড়ে, এমন কোথাও, যেখান থেকে ওদেরকে দেখা যায়, কিন্তু ওকে কেউ দেখতে না পায়। মাথা নেড়ে বাজে চিš-া দূর করে দিল মিতা। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না, মনটাকে শক্ত করে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকতে হবে। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় ওর ভিতরে কী চলছে। গম্-গম্ করছে বাড়িটা ঠিক বিয়ে-বাড়ির মতই। সবাই চারদিকে এমন ভাবে ছুটোছুটি করছে, যেন পিঁপড়ের বাসায় খোঁচা দিয়েছে কেউ। ‘আরে, মিতা আপা! তুমি এতক্ষণে আসছ?’ নিচতলার বারান্দায় উঠতেই বলল ছোটখালার বড় মেয়ে ঝর্না, ‘সেই কখন থেকে পাগল হয়ে খুঁজছে নানু তোমাকে! জলদি ওপরে যাও, নইলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে তোমার নানীজি!’
৫. প্রাচীন বাড়িটাকে আর চেনাই যাচ্ছে না। ছোটরা সত্যিই সুন্দর করে সাজিয়েছে কাগজের ফুল আর নকশা দিয়ে। সিঁড়ির ধাপে আর ল্যান্ডিঙে আলপনা আঁকা হয়েছে। সুন্দর লাগছে। দোতলায় উঠে গেল মিতা। সিঁড়ি বেয়ে পিলপিল করে উঠছে-নামছে উৎসবের বাহারি সাজ-পোশাক পরা নানান বয়েসী চেনা-অচেনা অসংখ্য ছেলেমেয়ে। ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন ছোটখালা। ‘বাহ্! ভারি সুন্দর লাগছে তো তোমাকে আজ!’ মৃদু হেসে পাশ কাটাল মিতা। নানীজির কাছে যেতে হাত ধরে বসালেন তিনি পাশে। কেন খোঁজ করছেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘কী কইলা?’ ‘আমাকে খুঁজছিলেন বলে?’ ‘হ।’ ‘কেন?’ কেন খুঁজছিলেন মনে নেই নানীজির। নিজ দায়িত্বের কথা ভেবে সচকিত হলো মিতা। ‘আমার একটা টুল দরকার ছিল যে, নানীজি। ওর ওপর চড়ে শরবত ঘুঁটতে হবে ঢালার সময়।’ ‘ঠিক কইছ। তোমার বড়খালা আছে রান্নাঘরে, অরে কইলেই একটা টুলের ব্যব¯-া কইরা দিব।’ রান্নাঘরে চলে এলো মিতা। টেবিলের ধারে একটা টুল রাখা, তার ওপর বসেই অপেক্ষা করছেন বড়খালা ওর জন্য। ওকে দেখেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখদুটো। ‘দারুণ লাগছে তোমাকে, মিতা!’ ওর চিবুক স্পর্শ করে আঙুলে চুমো খেলেন বড়খালা। ‘আজিমটা একটা আ¯- গাধা! কাছের মানুষটাকে মনে ধরল না, হুট করে বিয়ে করে বসল কোথাকার কোন্ মেয়েকে। অথচ আমরা সবাই জানি একমাত্র তোমাকেই সত্যি-সত্যি মানায় ওর পাশে।’ ‘শরবতটা এখন একবার ভাল করে ঘুঁটে বরফ দিয়ে রাখলে হতো না, খালা? মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না কে জানে!’ টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন বড়খালা। ‘ঠিক বলেছ। তুমি নাড়ো, আমি একটা গাসে নিয়ে চেখে দেখি।’ টুলে উঠে দাঁড়াল মিতা ইয়া বড় এক কাঠের ঘুঁটনি নিয়ে। বড়-বড় আরও কয়েকটা বরফের চাকা ছাড়া হলো টবে। মিনিট পাঁচেক ঘাঁটাঘাঁটির পর চেখে দেখা গেল মিষ্টি বেশি লাগছে, তার মানে বরফ গললে একদম ঠিক হবে। আবার ঢাকনা বন্ধ করে রাখা হলো, সার্ভ করবার আগে আবার একবার ঘাঁটতে হবে, ব্যস। এবার দোতলার বারান্দায় চলে এলো মিতা বড়খালার সঙ্গে। এখান থেকে দেখা যাবে বর-কনেকে গেট দিয়ে ঢুকবার সময়। ফুলের তোড়া নিয়ে তিন-চারটে বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়েছে গেটের দু’পাশে। বিরিয়ানী আর টিকিয়ার গন্ধ ভেসে আসছে নিচ থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



