এরশাদের সাথে স্ত্রী ও ছেলে সহ আমি এবং তার হাতে আমার তিনটি বই ( বৃটেনের বৈরী বাতাস, বৃটেনের আকাশ মেঘে ঢাকা ও স্মৃতির প্রতি প্রীতি গ্রন্থত্রয়)
আমরা ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানাই এবং আমার তিনটি বই উপহার দেই। বইগুলো কিছুক্ষণ দেখেন। তাকে বলি আপনার লেখার কি কোন সমগ্র বেরিয়েছে? তিনি বলেন হ্যাঁ বেরিয়েছে। আমি বলি দেশে থাকতে নব্বই দশকের শেষের দিকে কিছু কবিতা বাংলাবাজার পত্রিকা’র সাহিত্য পাতায় পড়েছি। আপনার কবিতা পড়ে মাটি ও মানুষের কাছাকাছি মন চলে যেত। কিন্তু গ্রন্থাকারে কোন কবিতা পড়ার সুযোগ হয়নি। ভবিষ্যতে দেশে গেলে আমি সংগ্রহ করে আনব। বিটিভিতে আপনার কালজয়ী গানগুলো শুনে আমি কিশোর বেলায় অত্যন্ত মুগ্ধ হতাম। এগুলোর ভিডিও ক্লিপগুলো বিটিভি থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন কি? বর্তমান প্রজন্ম যাতে জানতে পারে আপনি কিভাবে মানুষের পাশে সবসময় ছিলেন। তিনি বলেন হ্যাঁ ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। ‘আমি যেতে চাই বাংলার মানুষের কাছে, আমি বন্ধী আকাশের নীচে’ আপনার এই গানটি যারা শুনেছেন, এরশাদ কে ভুলার সাধ্য তাদের কি আছে?
দুপুরের খাবার শেষে কিছুসময় গার্ডেনে খোলা আকাশের নীচে তিনি চেয়ারে বসেন। আমি তার কাছে জানতে চাই দেশের অবস্থা কেমন? তিনি বলেন দেশের অবস্থা আর কি? যেমন ছিল তেমন আছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে জানতে চাইলে কিছুটা অনিহা সত্তেও বলেন, এ সরকারের আমলেই তাদের বিচার হবে? আবার প্রশ্ন করি কতটুকু স্বচ্ছতা থাকবে? তিনি বলেন সরকার যতটুকু স্বচ্ছ করবে! নিরপেক্ষ যাতে হয় সে দিকে সরকারের লক্ষ্য রাখা উচিৎ। আপনার প্রতিষ্টিত গুচ্ছগ্রামগুলো কি আছে? তিনি বলেন এগুলো আছে তবে ধারাবাহিকতা রাখা হয়নি নতুবা উদ্ভাস্তু মানুষের সংখ্যা কমে যেত! সবুজাভ পল্লীতে ভরে যেত বাংলার জনপদ। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হত বাংলাদেশ। যেভাবে দু’দশক আগে বলেছিলাম, লাঙ্গলের ফলা থেকে উঠে আসা, অতি আন্তরিক আমার ভালোবাসা। সেই আন্তরিক ভালোবাসায় কৃষকের আঙ্গিনা ভরে থাকত! আমার চোখে ভেসে উঠে সেই এরশাদ, যাকে কিশোর বেলা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে অবিভূত হতাম। বিশেষত ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় দূর্গত মানুষের পাশে জল কাদা মাড়িয়ে বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে সাহায্য করতেন। আর এন্ড্রুকিশোরের কন্ঠে পরিবেশিত হত ‘তোমাদের পাশে এসে বিপদের সাথী হয়ে আজকের চেষ্ঠা আমার...’! চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্যগুলো মনের মাঝে ভীড় জমায়। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে লামাকাজী এম এ খান ব্রিজ উদ্ভোধন করতে সিলেট এসেছিলেন। দুদিন পর তিনি সিলেট থেকে সড়ক যোগে ঢাকা যাবেন। সিলেট মহাসড়কের রশিদপুরে বিশ্বনাথের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানের ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে অভ্যর্থনা
জানাবে বলে ঘোষণা করা হয়। আম্মাকে আগের দিন রাতে বলি খিচুড়ি রান্না করার জন্য। আমি ও ঘরের লজিঙ্গের ছাত্র আলা উদ্দিন খুব ভোরে খিচুড়ি খেয়ে সাইকেল যোগে বিশ্বনাথ যাই। বিশ্বনাথ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানের ছাত্র-ছাত্রী ও সর্বশ্রেণীর জনসাধারাণ মাইল দুয়েক পায়ে হেঁটে মিছিল সহকারে গন্তব্যে পৌঁছি। মহাসড়কের দুপাশে আমরা শত শত ছাত্র-ছাত্রীরা লাইন ধরে সকাল নয়টা থেকে প্রেসিডেন্টের আগমনের অপেক্ষোয় দাঁড়িয়ে থাকি। এগারো ঘঠিকার দিকে গাড়ির বহর আসতে শুরু করে। অপলক দৃষ্টিতে গাড়িগুলোর দিকে চেয়ে থাকি, যেন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী গাড়ী দেখা থেকে বঞ্চিত না হই। হঠাৎ সেই অভাবনীয় সুযোগ চোখের সামনে আসে। প্রেসিডেন্ট নিজে ড্রাইভ করে একটি জিপে আসেন। আর সবাই বলছে শুভেচ্ছার স্বাগতম, প্রেসিডেন্টের আগমন। বিশ্বনাথবাসীর পক্ষ থেকে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। তিনি মুহুর্তে পেরিয়ে যান আমাদের সামন থেকে। আমরাও তার জিপের পিছনে ছুটি। তিনি রশিদপুর পয়েন্টে সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিনিট দশেক ভাষণ দেন। আমরা দূর থেকে শুধু শ্রবণ করি, জনতার ভিড়ের জন্য কিছুই দেখতে পাইনি। তার সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। বিশ্বনাথের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে পাঁচ লক্ষ টাকা অনুদান ঘোষণা করেছিলেন। সিলেট ঢাকা মহাসড়কে শত শত তোরণ ছিল।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে এরশাদ গৃহবন্ধী ছিলেন। ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাচঁবে’ ‘লাঙ্গলের ফলা থেকে উঠে আসা, অতি আন্তরিক আমার ভালোবাসা’ এসব লেখা সম্বলিত একটি নির্বাচনী পোষ্টার আমার রুমে লাগিয়ে রাখি। লাঙ্গলের ছবির মধ্যে এরশাদের অনেকগুলো ছবি ছিল। দেখতে খুবই আকর্ষণীয়। যারা দেখতেন মুগ্ধ হতেন। নির্বাচনের পরে আরেকটি পোষ্টার প্রকাশ হয়। জনতার আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত। নির্বাচনে গণরায়, জাতি আজ এরশাদের মুক্তি চায়। এরশাদের বিকল্প নাই, অবিলম্বে মুক্তি চাই। এই পোষ্টারটিও আমার রুমে লাগিয়ে রাখি। সেই পোষ্টারে হাত দিয়ে কিশোরবেলা একটি ফটো তুলেছিলাম। ঐ ফটোটি তাকে দেখাই। তিনি দেখে আনন্দিত হন।
১৯৯৭ সালে ১২জানুয়ারী জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সিলেটে হজরত শাহ্জালাল ( রহ.) মাজার জিয়ারতে আসেন। তার আগমনের সংবাদ শুনে মাজার প্রাঙ্গনে সকাল থেকে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। আমি দরগার পার্শ্ববর্তী রাজারগলি থাকতাম। খবর পেয়ে ভোরে মাজারে যাই। ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করি। কিন্তু তিনি না আসায় বাসায় চলে আসি। আবার জোহরের নামাজে যাই। নামাজান্তে মাজার প্রাঙ্গনে অপেক্ষা করছি। দুপুর আড়াই ঘটিকার সময় শুনি তার আগমনী বার্তা। আমি ও ফুফাতো ভাই সুমেল ছিলাম। আমরা ভিতরে প্রবেশ করে মাজারের পাশে চলে যাই। তিনি কয়েকজন সঙ্গীসহ সেখানে প্রবেশ করেন। মাজার জিয়ারত শেষে তিনি বলেন স্যারের কবরে যাব! মাজার থেকে বেরিয়ে ডান দিকে উঠে একটু অগ্রসর হলে বঙ্গবীর এম.এ. জি ওসমানীর কবর। তিনি সেখানে গিয়ে জিয়ারত করেন। মাজার থেকে নেমে এসে ঘোষণা করেন, তিনি বিগত পাঁচ বছর সংসদ সদস্য থাকাকালে যে বেতন ভাতা পেয়েছেন তা মাজারের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হবে। মাজারের গেইট পেরিয়ে জিপে উঠে শাহ পরাণ (রহ.) মাজারের উদ্দেশ্যে আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যান। এই দেখার প্রায় চৌদ্দ বছর পর তার সাথে স্ত্রী সন্তান সহ দেখা করি। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এরশাদ আগের মত রাজনীতিতে ব্যস্থ থাকেন না। রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় তাকেও যেন হতাশ করেছে। তার প্রশ্ন যে গনতন্ত্রের জন্য ক্ষমতা ছাড়লাম সেই গনতন্ত্র কি দেশে এসেছে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

