‘সারা মুসলিম দুনিয়ায় এসেছে নামিয়া শবে-বরাত
রুজি-রোজগার-জান-সালামৎ বন্টন করা পূণ্যরাত।’
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কতিপয় মহিমান্বিত রজনী নির্ধারিত করে রেখেছেন। যাতে আমরা এসব রজনীতে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য লাভের আকাংখায় ধ্যানমগ্ন থাকি। আল্লাহর অশেষ বরকত লাভ করতে পারি। সবরকম পাপ-পংকিলতা থেকে তওবা করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে সক্ষম হই। ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ সাধনের পথ সুগম হয়। এমন এক পূন্যময় রাত ১৪ শাবানের দিবাগত রজনী। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত বলে এ রাত প্রচলিত। হাদিস শরিফের ভাষায় ‘লাইলাতুম মিন নিসফি শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য রাত বলা হয়। এ রজনীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শবে কদরের পরেই এ রাতের গুরুত্ব। মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, তোমরা শবে বরাতকে সম্মান কর। তোমাদের জন্ম, মৃত্যু, রিজিক, সম্পদ, ভালো-মন্দ সবকিছু এ রাতেই নির্ধারিত হয়।
শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। যেহেতু এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ দয়াগুণে অসংখ্য-অগণিত পাপী বান্দাদের ক্ষমা করে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। এ রাতে মানুষ আল্লাহ পাকের দরবারে হাজির হয়ে তাঁর বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করে। এ বরকতময় রজনীতে পরলৌকিক জীবনের লাভজনক ব্যবসার এক সূবর্ণ সুযোগ রয়েছে। মানুষের হেদায়তের জন্য একলক্ষ মতান্তরে দু’লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রাসুল ধরায় আগমন করেন। তাঁরা সবাই মাছুম বা নিস্পাপ ছিলেন। তাঁদের সর্দার রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এ রাতে জাগ্রত থেকে গুনাহগার উম্মাতদের জন্য খোদার দরবারে কেঁদেছেন।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর ফজিলত ও বরকত বর্ণিত হয়েছে। সূরা দুখানে লাইলাতিম মুবারাকাতিন বা বরকতময় রাত বলে তাফসির গ্রন্থে লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বলা হয়েছে, অনেকে বলেছেন বরকতময় রাত বলতে শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে। যারা এমত পোষণ করেছেন তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ট তাবিয়ী হযরত ইকরামা (রাঃ)। তিনি সায়্যিদিনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর আযাদকৃত দাস ও বিশেষ ছাত্র ছিলেন। হযরত ইকরামার ইলম সম্পর্কে ইমাম আমির শুরাহবিল আশ শা’বী বলেন, কিতাবুল্লাহর ইলম সম্পর্কে ইকরামার চেয়ে অধিক জ্ঞাত কোন আলিম এখন বাকি নেই ( সিয়ারু আ’লামিন নুবালা )। ইখতিলাফ বিদ্যমান অবস্থায়ও ইমাম সুফিয়ান ছুরীর মতে আমল থেকে নিষেধ করো না।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা রাত্রে আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকটে যাই। এ সময় তিনি নামাজে ছিলেন। সিজদায় গিয়ে তিনি অঝোরে কেঁদেছেন দেখে বলি, আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোন! আপনি সিজদায় অঝোরে কেঁদেছেন। উম্মাতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি। মহানবী (সাঃ) হে আয়েশা! তুমি কি জান, আজ কোন রাত? এ রাত সম্পর্কে তুমি কি কিছু জান? জবাবে বলি আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ভালো জানেন। তিনি বলেন, এ রাত পাপ মুক্তি ও কল্যাণময়ী রাত। এ রাতে আল্লাহ পাক রহমতের দরজা খুলে দেন। বান্দাদের মধ্যে রহমত-বরকত নিয়ামত সমূহ বিলিয়ে দেন।
ইবনে মাজাহ শরিফে হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, শাবানের পনের তারিখ রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত কর এবং দিনের বেলায় রোজা রাখ। এ রাতে সন্ধ্যার পর থেকেই আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী! আমি ক্ষমা করে দেব। কে আছ রিজিক প্রার্থনাকারী! আমি রিজিক দান করব। আছ কি কোন বিপদগ্রস্থ ব্যক্তি! আমি বিপদ থেকে রক্ষা করব। আছ কি অমুক ব্যক্তি, আছ কি অমুক ব্যক্তি! এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা করেন।’
শবে বরাত শুধু আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মাতকে দেয়া হয়েছে। কারণ আগেকার নবীদের উম্মাতরা অনেক বেশি হায়াত পেতেন। ফলে তারা আল্লাহর ইবাদতের বেশি সুযোগ লাভ করতেন। আর শেষ নবী (সাঃ) এর উম্মাতেরা কম হায়াত পান। তাই আল্লাহ উম্মাতে মোহাম্মাদীকে বরকতময় রজনী দিয়েছেন। যার জন্য অনেক নবী (সাঃ) উম্মাতে মোহাম্মাদী হওয়ার আশা ও প্রার্থনা করেছেন।
তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ শরিফে হযরত আয়েশা (রাঃ) বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি এক রাতে দেখতে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমার পাশে নেই। আমি ওনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি তিনি জান্নাতুল বাক্বীতে অবস্থান করছেন। উর্ধ্বাকাশের পানে তার মস্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বলেন, আয়েশা, তুমি কি আশংকা করেছিলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) তোমার প্রতি অবিচার করছেন? আয়েশা (রাঃ) বলেন, এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনার অন্য কোন বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন কিনা! রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আল্লাহ তায়ালা ১৫ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বনি কালব গোত্রের সমুদয় বকরীর পশম পরিমাণের চেয়ে বেশি মানুষকে মাফ করেন।
ইবনে মাজাহ শরিফে আবু মুসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ১৫ই শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা নিচে নেমে আসেন এবং সকল মাখলুককেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিক এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না।’ এতদ্সত্বেও এ রজনীতে মানুষ নানাবিধ কুসংস্কারে ব্যস্ত থাকে। এ রাতে গুরুত্ব উপলব্ধি না করে বিধর্মীদের প্রথানুসারে আলোকসজ্জা, আতশবাজি ও পটকা ফুটানোতে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে আলোকসজ্জা ও আতশবাজী তামাশা করা সুস্পষ্ট বিদআত। এসব ধারণা ইসলামি অনুষ্টানে হিন্দুদের দিওয়ালী অনুষ্টান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন হাকিমূল উম্মাত আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)। হালুয়া রুটি বিলি বন্টনের কার্যক্রমও বিদআত। ইবাদতের সাথে এগুলির কোন সম্পর্ক নেই। এসব শিয়াদের কাছ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছেন।
এপূণ্যময় রাতের মহাত্ম্য, পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য রাখতে হলে এসব কর্মকান্ড পরিহার অপরিহার্য। পাপ-পংকিলতা দূরিভূত করে আত্ম বিশ্লেষণ, আত্মসমীক্ষা ও আত্ম সংশোধনের পথে অগ্রসর হতে হবে। হে আল্লাহ নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। ক্ষমাই পছন্দ কর। অতএব আমাদের ক্ষমা করে দাও! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা, নিরপত্তা ও ইহকাল-পরকালের চির শান্তি কামনা করছি। যেভাবে কবি বলেছেনঃ
শবে বরাতের রাত্রিতে আজি, চাহি নাগো শুধু ধন ও মান,
সবার ভাগ্যে দিও যাহা খুশি-জাতির দিওগো মুক্তি দান।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



