somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নজরুল বাংলা সাহত্যির মুকুটহীন সম্রাট

২৭ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১০:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কবির ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করছি ।



কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের প্রিয় কবি। তিনি ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে ২৪মে বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমাধীন জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। কবির পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। কবির পিতৃ পুরুষগণ পাটনার অধিবাসী ছিলেন। সম্রাট শাহ আলম যখন দিল্লীর বাদশা, সে সময় সম্রাটের নির্দেশে পাটনার হাজীপুর থেকে তাঁরা চুরুলিয়া চলে আসেন।
ছোটবেলায় কবির নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। জন্মের পূর্বে চার সন্তান শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় পিতামাতা তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘দুখু মিয়া’। এ নাম ছাড়াও ছেলে বেলায় তাঁকে ‘ক্ষ্যাপা’ এবং ‘নজর আলী’ নামে ডাকতো। কবির জন্মের সময় প্রকৃতিতে ছিল ঝড়ের তাণ্ডব। ঝড় ঝঞ্ঝার মধ্যে চির বিদ্রোহী মহাবীর জন্ম নিলেন। নজরুল তাঁর এক কবিতায় জন্মমুহূর্তটিকে বর্ণনা করেছেন,

‘শোনো সবে জন্ম কাহিনী মোর

আমার জন্ম ক্ষণে উঠেছিল

ঝঞ্ঝা তুফান ঘোর।

উড়ে গিয়েছিল ঘরের ছাদ ও

ভেঙে ছিল গৃহদ্বার

ইস্রাফিলের বজ্র বিষাণ

বেজেছিল অনিবার।’

ডানপিটে এক কিশোর। গ্রামের মক্তবে পড়ে। কিন্তু মক্তবের বাধাধরা নিয়ম মানতে তার ভালো লাগে না। সুযোগ পেলেই সে ক্লাস ফাঁকি দেয়। মেতে উঠে দস্যিপনায়। অন্যের লিচুগাছে চড়ে পাকা লিচু পেড়ে আনে, হানা দেয় কোন গাছ বা পোড়ো দালানের কার্নিশের পাখির বাসায়। তাই বলে বছর শেষে মক্তবের পরীক্ষায় ফেল করে না, বরং প্রথম হয়। কারণ ক্লাস ফাঁকি দিলেও পড়ায় ফাঁকি দেয় না সে। তাই দূরন্তপনার মাঝেই নিম্ন প্রাইমারি পরীক্ষায় পাস করে গ্রামের মক্তব থেকেই।

কয়লা অঞ্চল বলে খ্যাত আসানসোলের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম চুরুলিয়া। চুরুলিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অজেয় নদ। গ্রামের পূর্ব পার্শ্বে রাজা নরোত্তম সিংহের গড় এবং দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে ‘পীর পুকুর’। হাজী পাহলোয়ান নামে একজন ‘পীর’ এই পুকুর খনন করেছিলেন। পীর পুকুরের পূর্বপাড়ে হাজী পাহলোয়ানের মাজার শরীফ। পশ্চিম পাড়ে একটি মসজিদ আর মাজার। কবি নজরুলের পিতা, পিতামহ আজীবন এ মসজিদ ও মাজার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।
নজরুল চুরুলিয়ার যে মক্তবে পড়ালেখা এবং নিম্ন প্রাইমারি পরীক্ষায় পাস করার পর কৈশোরেই শিক্ষকতা করেন সেই মক্তবেরই শিক্ষক ছিলেন তার চাচা মৌলবী কাজী ফজলে আহাম্মদ। আরবী ও ফারসী ভাষায় পারদর্শী এই চাচার কাছেই নজরুল এই দুই ভাষা শেখেন। তার লেখায় আরবী, ফারসী, উর্দু ও হিন্দী শব্দ দক্ষমতার সাথে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারার গোড়াপত্তন ঘটে তখনই।

নজরুলের বয়স যখন আট সে সময় আকস্মিক তাঁর জীবনে এক আঁধার অধ্যায় নেমে আসে। এ সময় পিতা ফকির আহমদ মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর সংসারের অভাব-অনটন বেড়ে যায়। মা জাহেদা খাতুন ছেলের লেখাপড়া কিভাবে করাবেন তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। অতি কষ্টে ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৩১৬ খৃষ্টাব্দে গ্রামের মক্তব হতে নজরুল নিম্নিমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

নজরুলের বয়স মাত্র দশ তখন। তাঁর মা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অভাব-অনটনের কারণে নজরুলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল। সংসারে আর্থিক দৈন্য দূর করতে নজরুল মক্তবে চাকরি গ্রহণ করেন। এই অল্প বয়সে নজরুল মক্তবের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। মক্তবের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি অল্প সময়েই প্রিয় হয়ে ওঠেন। শিক্ষার্থীরা তাকে ছোট ওস্তাদজী বলে সম্মান দিত। এ সময় নজরুল মাজারের খাদিমগিরি ও মসজিদের মুয়াজ্জিনেরও দায়িত্ব পালন করেন। নজরুলের এক চাচা কাজী বজলে করিম ভাল ফার্সি জানতেন। কবিতাও লিখতেন। নজরুলের এই চাচা লেটো দলের সাথে জড়িত ছিলেন। লেটো দলের জন্য বজলে করিম কবিতা ও গান লিখতেন। নজরুল তাঁর চাচার উৎসাহে কবিতা লিখা শুরু করেন। চাচার মতো নজরুল এ সময়েই কবিতায় আরবী, ফার্সি শব্দ ব্যবহার করে সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতেন।

তখনকার দিনে গ্রামে গ্রামে যাত্রা, পালাগানের আসর বসতো। বসতো লেটো গানের আসর। লেটো গানের কথা ও সুর নজরুলকে আকৃষ্ট করে। সে সময় চুরুলিয়ার আশেপাশে লেটো গানের কয়েকটি দল ছিল। নজরুল মক্তব ছেড়ে লোটো দলে যোগ দিলেন। অল্প বয়সেই চমৎকার চমৎকার পালা গান লিখে নজরুল সুনাম কুড়ান। চুরুলিয়া, রাখপুরা, নিমসা প্রভৃতি গ্রামে নজরুল কবি হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। নজরুলের লেখা ‘চাষার সঙ;, ‘মেঘনাদ বধ’, ‘শকুনি বধ’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘রাজপুত্র,’ ‘আকবর বাদশা’, ‘কবি কালি দাস’ প্রভৃতি পালা গান উচ্ছ্বসিত প্রশংসিত হয়। সে সময়কার লেটো দলের বিখ্যাত কবিয়াল শেখ চাকার নজরুলকে ব্যাঙাচি বলে ডাকতেন।
নজরুলের শৈশর-কৈশোরের অনেক ঘটনা আর কাজের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তার লেখায়। কৈশোরের তার দুরন্তপনার চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে তার বিখ্যাত ‘লিচুচোর’ কবিতায়-

পুকুরের ঐ কাছে না

লিচুর এক গাছ আছে না

হোথা না আস্তে গিয়ে

য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে

গাছে গেৎ যেই চড়েছি

ছোট এক ডাল ধরেছি,

ও বাবা, মড়াৎ করে

পড়েছি সড়াৎ জোরে!

কবির শিশু মানসের পরিচয় পাওয়া যায় তার ‘খুকী ও কাঠবেড়ালি’ কবিতায়। শিশু-কিশোরদের অতিপ্রিয় ও বহু পঠিত এই কিশোর কবিতাটি কবি রচনা করেন তার একবারের কুমিল্লা সফরের সময়। এটি রচনার ইতিহাস সম্পর্কে মুজফফর আহমদ তার ‘কাজী নজরুল ইসলামঃ স্মৃতিকথা’ বইতে লিখেছেন, ‘এর রচনার পেছনে যে ঘটনা ঘটেছিল নজরুল তা’ আমাদের বলেছিল। সে একদিন দেখতে পেল যে শ্রী ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের শিশুকন্যা জটু (ভালো নাম শ্রীমতী অঞ্জলী সেন) একটা একা কাঠবেড়ালির সঙ্গে কথা বলছে। তা দেখেই সে কবিতাটি লিখে ফেলে।’

কাজী নজরুল ইসলাম কৈশোরে এক জায়গায় আটকে থাকতে পছন্দ করতেন না। জ্ঞানার্জন আর দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আগ্রহ। তাইতো ‘সঙ্কল্প’ কবিতায় লিখেছেন-

থাকব না’ক বদ্ধ ঘরে

দেখব এবার জগৎটাকে

কেমন করে ঘুরছে মানুষ

যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

দেশ হতে দেশ দেশান্তরে

ছুটছে তারা কেমন করে,

কিসের নেশায় কেমন করে

মরছে যে বীর লাখে লাখে।

তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল বিদ্রোহী। তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন বিদ্রোহী। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট আমাদের চিরবিদ্রোহী কবি ধূলিবালির ধরা থেকে বিদায় নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল মসজিদের পাশে চিরঘুমে শায়িত আছেন।
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×