আমাদের গ্রামে ৪ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় যার মধ্যে ২ টি সরকারী, একটি উচ্চবিদ্যালয়, একটি কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়, একটি কলেজ, একটি সরকারী হাসপাতাল আছে ।শুধূ তাই নয়, সিরাজগঞ্জ সদর থানার দ্বিতীয় বৃহত্তম ঈদগাঁ মাঠ আমাদের গ্রামে অবস্থিত।
ভাববেননা "আমাদের গ্রাম" শিরোনামে রচনা লিখতে শুরু করেছি ।
২০০৬ সাল ।শরতের এক পড়ন্ত বিকেল ।একসাথে আমরা প্রায় ১২-১৫ জন যুবক । সবাই তখন কোন না কোন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি ।ছুটিতে সবাই তখন বাড়ীতে ।আমারা আলোচনা করছি ।গ্রামের জন্য, গ্রামের মানুষের জন্য আমাদের কিছু করা উচিত ।আমাদের আছে বুদ্ধি, আছে সাহস, আছে মুক্তচিন্তা ।হ্যাঁ করব, তবে তার জন্য চাই একতা ।
এক সপ্তাহের মধ্যে গড়ে তোলা হল একটি সংগঠন, নাম "বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন" ।সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ।উদ্দ্যেশ্য ছিল গ্রামের জন্য কিছু করা, গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করা, শহরের স্কুলের ছাত্রদের তুলনায় পিছিয়ে পড়া গ্রামের ছাত্রদের জন্য কিছু করা ইত্যাদি ।
সর্বপ্রথম ১৮ জন সদস্য (৩ জন নারী সদস্য), তিন জন উপদেষ্টা নিয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি ।
প্রথমবারের মত আমরা ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বাহুকা ও পার্শবর্তী গ্রামের ৪ টি উচ্চবিদ্যালয় ও প্রায় ১০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ৭ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করি ।এ পরীক্ষায় ৭ম শ্রেণীতে প্রায় ৩০ জন এবং ৪র্থ শেণীতে প্রায় ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহন করে ।এর মধ্য থেকে আমরা ৪র্থ শ্রেণীতে ২০ জনকে এবং ৭ম শেণীতে ৮ জনকে এককালীন বৃত্তি প্রদান করি ।এবং ৪র্থ শ্রেণীতে ২ জনকে ও ৭ম শ্রেণীতে ১ জনকে পরবর্তী শেণীর এক বছরের যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক খরচ দেই ।
বাহুকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের একাংশ
রতনকান্দী ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারমেন বক্তব্য দিচ্ছেন
বাহুকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এক বছরের প্রাতিষ্ঠানিক খরচ হাতে তুলে নিচ্ছে সপ্তম শেণীর এক ছাত্রী
২০০৬ সালের আমাদের আয়ের উৎস ছিল সংগঠনের সদস্যদের মাসিক চাঁদা এবং গ্রামের বিশিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের প্রদেয় টাকা ।২০০৬ সালের কার্যক্রমে আমরা সফল ।
২০০৭ সাল ।নতুন কমিটি ।এবছর আমরা আমাদের বৃত্তি প্রদানের এলাকার সীমা বৃদ্ধি করি ।২০০৭ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে ৭ম শেণীতে প্রায় ৮০ জন, ৪র্থ শ্রেণীতে প্রায় ২০০ জন ছাত্র-ছাত্রী ।পরিধি বৃদ্ধি করায় আমাদের সাংগঠনিক ফান্ড থেকে বৃত্তি প্রদান ও বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান করতে আমাদের হিমসিম খেতে হয় ।সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন আমাদের গ্রামের একজন বিশিষ্ঠ ব্যক্তি ।প্রথমবারের মত ডোনেশন দেন ১০,০০০ টাকা ।
শুরু হল আমাদের ব্যর্থতা ।দোষটা আমাদের না ।আমাদের গ্রাম্য রাজনীতির ।গ্রামের কিছু বখাটে ছেলে আমাদের সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে ।
আমাদের সংগঠনের সদস্য হওয়ার প্রধান যে শর্তগুলো ছিল:
প্রার্থীকে
১. বাহুকা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
২. ন্যুনতম এইচ এস এসি অথবা সমমান পাশ হতে হবে ।
৩. অবশ্যই উচ্চতর শিক্ষায় অধ্যয়নরত হতে হবে ।
৪. ভদ্র, রুচিশীল, সদাচারী ও মননশীল হতে হবে ।
৫. প্রর্থীর বিরুদ্ধে কোন অসামাজীক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগ থাকা যাবেনা ।
উল্লেখ্য যে, যারা আমাদের সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছিল তার কেউই এস এস সি পাশ করেনি এবং নেশাখোর, উশৃংখল ।যাদের দেখলে গায়ে থুথু ফেললেও সস্তি পাওয়া যায়না ।সাভাবিকভাবে "বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন" তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করল ।
ফলাফল:
পরেরদিন বিকেলে তারা আমাদের সংগঠনের সভাপতির গায়ে হাত উঠালো ।
আমরা পারলামনা উল্টা তাদের গায়ে হাত উঠাতে, দুর্বলতার জন্য নয় ।তাদের আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক যা আমাদের নাই ।
আমরা বিচার চাইলাম গ্রামের মুরুব্বিদের কাছে ।তবে সেটা চাওয়া পর্যন্তই রয়ে গেল, পাওয়া হলনা।
৩-৪ মাস পরের কথা ।রমজান মাস ।আমাদের অনেকেরই রমজান মাসে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকত ।বাড়ীতে বসে থেকে কি করব ? শুরু করে দিলাম বাহুকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ফ্রি কোচিং ।
বেশিদিন যেতে দিলনা ।ভিলেজ পলিটিকস্ এর কারনে সেটাও বন্ধ করে দিতে হল বাধ্য হয়ে।
পার হয়ে গেল আরও একটি বছর।
২০০৮ সাল।
এবার বৃত্তি দেয়ার পরিধি আরো এক ধাপ বাড়ানো হল ।বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে আমাদের রতনকান্দী ইউনিয়ন এর সকল বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী দের মধ্যে ।সেই সাথে প্রথমবারের মত যোগ করা হল নবম শ্রেণীকে ।
বিপুল আগ্রহে ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহন করল ।৪র্থ শ্রেণীতে প্রায় ৩৫০ জন, ৭ম শ্রেনীতে প্রায় ২৫০ জন এবং ৯ম শ্রেনীতে প্রায় ২৮০ জন ছাত্র-ছাত্রী অংশ্রগ্রহন করে ।গ্রাম পুলিশের পাহারয় বাহুকা কলেজ ও বাহুকা কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে নেয়া হয় বৃত্তি পরীক্ষা ।
পাঁচদিন পর বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষনা করা হয় ।এর ৩ দিন পর ঈদ-ঊল-আযহা।
ঈদ-ঊল-আযাহার ৩য় দিন হবে বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান ।যথারীতি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ফলাফল ও দাওয়াতপত্র পৌছে দেয়া হল ।বিশিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের কাছে পৌছে দেয়া হল দাওয়াতপত্র ।খুব ভাল লাগছে অনেক জাকজমকভাবে করব এবারের অনুষ্ঠান ।ডেকোরেশন প্রস্তুত ।আমরাও প্রস্তুত।
কিন্তু প্রস্তুত নয় আমাদের ডোনার ।কারনটা আমরাও জানিনা ।গতকাল পর্যন্ত ও যারা আমাদের সাথে ছিল......।কারনটা বলি, আসলে যারা আমাদের বিরোধিতা করছিল তারা ডোনারকে টাকা দিতে দেবেনা ।ঈদের একদিন আগে দিন স্থগিত করতে হল অনুষ্ঠান ।যাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল তাদের বাড়ী বাড়ী গিয়ে দাওয়াত ফেরত নয়া হল।ঈদের আনন্দ যেন আমাদের মাটি হয়ে যাচ্ছে ।
পরদিন ঘটল আরেক ঘটনা ।আমাগের গ্রামের একজন বিশিষ্ঠ প্রকৌশলী আমাদের নিয়ে বসলেন ডোনারদের সাথে ।দীর্ঘ ৪ ঘন্টা আলোচনার পর সমাধান হল ।ডোনার টাকা দিচ্ছে, অনুষ্ঠান হচ্ছে ।
আমার শুরু হল দাওয়াত পৌছানো ।
তারপর অনুষ্ঠান.......
২০০৮ সালের বৃত্তি পরীক্ষার একাংশ
বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ
বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এর সহ সভাপতি
বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এর শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক
বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এর সদস্যদের একাংশ
তিন দিন পরের কথা ।আবারো হুমকি দেয়া হল আমাদরে কে মারার......
২৫-মার্চ ২০০৯....... ঘটে গেল এক লজ্যাষ্কর ঘটনা........
অবসান হল বাহুকা স্টুডেন্টস্ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এর......
এই আমাদের রাজনীতি.....
ছিঃ ছিঃ
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


