এবারও ঈদের বাজার দখল করে নিয়েছে ভারতীয় পোশাক
সাধারণ মার্কেটগুলোতে তো বটেই, রাজধানীর বড় বড় শপিংমল, ওয়ানস্টপ মল ও অভিজাত এলাকার বুটিক শপগুলোতেও দেশি কাপড় নেই বললেই চলে। সবই ভারতীয়। শাড়ি ও থ্রিপিসসহ অল্প কিছু পোশাক এসেছে পাকিস্তান থেকে। গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশি কাপড় ও পোশাকের অবস্থা কিন্তু এতটা শোচনীয় ছিল না। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের ঈদে অর্ধেক দেশি এবং অর্ধেক বিদেশি—এই অনুপাতে বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদ উপলক্ষে ২৫ শতাংশ বেশি কাপড় আমদানি করা হয়েছে। ভারতীয় কাপড়ের বিক্রিও এরই মধ্যে গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ধরে নেয়া হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক শুধু মারই খাবে না, একেবারে আছাড় খেয়ে পড়ে যাবে।
অনেক কারণের কথাই বলেছেন ব্যবসায়ীরা। ভারতের নায়িকা ও অভিনেত্রীদের অনুকরণের জন্য তরুণীদের উথালপাথাল হয়ে ওঠা একটি বড় কারণ। আগে বোম্বের তথা আজকের মুম্বাইয়ের নায়িকারা এদেশের তরুণীদের মাতিয়ে রাখতেন। ক’বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের নায়িকা ও অভিনেত্রীরাও মুম্বাইয়ের নায়িকাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। এমনকি ভিলেন চরিত্রের কোনো কোনো অভিনেত্রীর মতো পোশাক পরার জন্যও আমাদের মেয়েরা বিপণিবিতানগুলো তছনছ করে বেড়ায়। রুচির উন্নতি হচ্ছে বটে! ফ্যাশনে তো আমাদের মেয়েরা ভারতীয়দের পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যুবা-তরুণদের সম্পর্কেও একই কথা অনেকাংশে সত্য। তবে জাতির ভাগ্য ভালো যে, বিশেষ করে পাঞ্জাবিতে বাংলাদেশের কারিগররা এখনও মার খাননি। প্রতি বছরই তারা নতুন নতুন ডিজাইনের পাঞ্জাবি নিয়ে আসছেন। বাহারি ফতুয়া ও টি-শার্ট নামাচ্ছেন তারা। ফলে ভারত এখনও ছেলেদের পোশাকের বাজার দখল করতে পারেনি।
প্রতিটি আমলে বরং মুক্তবাজার ও বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে দেশি পণ্যের বিকাশ ঠেকানো হয়েছে। অথচ ভারত নিজেও কিন্তু আগে দেশি পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। দেশি পণ্য বিক্রি হওয়ার পর যদি বিশেষ কারণে কোনো পণ্য আমদানির প্রয়োজন দেখা দেয় কেবল তখনই ভারত অন্য দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে এবং সাময়িকভাবে ওই বিশেষ পণ্যটি আমদানি করতে দেয়। এর প্রক্রিয়াও সরকার এত জটিল, কঠিন ও সময়সাপেক্ষ করে রেখেছে যে নিতান্ত দায়ে না পড়লে ভারতের কোনো ব্যবসায়ী সহজে কোনো পণ্য আমদানির কথা চিন্তা পর্যন্ত করেন না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। পণ্যের বাজার শুধু নয়, ভারতের জন্য সীমান্তও উন্মুক্ত রেখেছে বাংলাদেশ।
শুধু তা-ই নয়, শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য সহায়তা না পাওয়া গেলেও ভারতীয় পণ্য আমদানির জন্য অনেক কম সুদেও ঋণ পাওয়া যায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে! অথচ অর্থনীতি সম্পর্কে সামান্য ধারণা যাদের আছে তারাই একবাক্যে বলবেন, শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করে চলেছে। আর এভাবে ভারতের প্রভাব বাড়তে থাকলে বছর কয়েকের মধ্যেই দেশ থেকে দেশি সব পণ্য হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। প্রতিটি জিনিসের জন্যই মানুষকে ভারতের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে হবে। ভারতীয়রা তখন কিন্তু আর এখনকার মতো কম দামে জিনিস দেবে না। যেহেতু উপায় নেই, সেহেতু ভারতীয়দের ইচ্ছামত দাম গুনতে হবে।
বিশ্লেষণের এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ঈদের বাজারে ভারতীয় পোশাকের বিক্রি ও পরিমাণ বেড়ে যাওয়াটাকে আমরা মোটেই ভালো ভাবতে পারি না। সরকারের উচিত জাতীয় শিল্পের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা এবং ব্যবসায়ীদের সর্বান্তঃকরণে সহায়তা দেয়া। ভারতীয় বা বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশি পণ্য যাতে টিকে থাকতে পারে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের কর্তব্য। সরকারকে আমদানির ব্যাপারে কঠোর হতে হবে, কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে চোরাচালানের বিরুদ্ধেও। সব মিলিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের কথা আমরা চিন্তা করতে চাই যখন স্বদেশি পণ্য শুধু স্লোগানের বিষয় হয়ে থাকবে না; সব বয়সের মানুষই তখন দেশি পণ্যকে যথেষ্ট মনে করবে, যেমনটি ভারতীয় পণ্যকে মনে করে ভারতীয়রা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

