বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিল যিনি সুদীর্ঘ ১৩ বছর জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন সেই একই ব্যক্তির আদর্শিক চিন্তায় পরিবর্তন ও ইসলামে প্রত্যাবর্তন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে। কেন তিনি সমাজতন্ত্র বিসর্জন দিলেন? তার মত এত বড় মাপের একজন বাম নেতা সমাজতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলেন কেন? তিনি নিশ্চয়ই সমাজতন্ত্র বর্তমানে যারা বাম রাজনীতি করে তাদের চেয়ে কম বুঝতেন না, বরং বেশীই বুঝতেন।
আশির দশকের প্রথমদিকেই তার চিন্তায়, তার দর্শনে পরিবর্তন আসে এবং ১৯৮৪ সালের ৩রা নভেম্বর তিনি জাসদ থেকে পদত্যাগ করেন। জাসদ থেকে পদত্যাগের মাত্র ১৬ দিন পর মেজর জলিল ১৯৮৪ সালের ২০শে অক্টোবর ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং মরহুম হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) এর নেতৃত্বে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। জাসদ থেকে তার পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ‘কৈফিয়ত ও কিছুকথা’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ
“দলীয় জীবনে জাসদের নেতা-কর্মীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়ার ফলে নৈতিকতার ক্ষেত্রে অবক্ষয় ঘটে, ব্যক্তিজীবনে আসে বিশৃঙ্খলা এবং ধর্মীয় নৈতিকতা এবং মূল্যবোধে পরিচালিত সমাজদেহ থেকে নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সমাজে বসবাসরত জনগণকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সাংস্কৃতিক জীবন এবং মূলবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মোটেও সক্ষম হয়নি। প্রচলিত পারিবারিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনধারা থেকে কেবল নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলেই বিকল্প সংস্কৃতি জন্ম নেয় না, বরং এই ধরনের রণকৌশল অবলম্বন সমাজে প্রচলিত নীতি, নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি তাচ্ছিল্য, উপহাস এবং ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবী আন্দোলনের বিপক্ষে চলে যায়।"
“ইসলাম ধর্ম এ দেশের শতকরা ৯০ জন গণমানুষের কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়, ইসলাম ধর্মভিত্তিক নীতি-নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-পর্ব, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং এদেশের সাধারণ গণমানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান ঘটনার সাথে ইসলাম ধর্ম অঙ্গাঅঙ্গিভাবেই জড়িত। জন্মপর্ব থেকে শুরু করে জানাযা পর্যন্ত ইসলামের নীতি-নির্দেশের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন। এমন একটি জীবন দর্শনকে অবহেলা, উপেক্ষা কিম্বা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে চলার নীতিকে বাস্তবসম্মত কিম্বা বিজ্ঞানসম্মত বলা যায় না। প্রগতিশীল আন্দোলনের স্বার্থেই ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন অত্যাবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি, কারণ ইসলাম শোষণ-জুলুম, অন্যায়, অসুন্দরসহ সর্বরকম স্বৈরশাসন এবং মানুষের উপর অবৈধ প্রভুত্বের ঘোর বিরোধী। ইসলাম পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, রাজতন্ত্র উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ সকল সম্পদের মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই। মানুষ হচ্ছে তার কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমানতদার বা কেয়ার টেকার।”
প্রিয় পাঠক চিন্তা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন। সত্যকে জানার চেষ্টা করুন। মিথ্যাকে বর্জন করুন। সত্য সর্বদা প্রকাশিত, প্রসারিত, সত্য চিরসুন্দর।
তথ্যসূত্রঃ
অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা - মেজর (অব.) এম. এ. জলিল
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০১১ দুপুর ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



