আমরা দেড় হালি ভাইবোন। মায়ের বিয়ে হয়েছিল সেই ১৩ বছর বয়সে। একবার নাকি মা আমগাছে পালিয়ে থেকেছে একরাত। তার স্বামীর ঘর-সংসার ভয় লাগত। কিন্তু সেই মা যে কিনা মাত্র ক্লাস থ্রি পাস। বাবাও তাই। আমার মা ছয়বোন একভাইকে মানুষ করেছে। তাতে আমার বাবার ভূমিকা ছিল শুধু মাত্র এদিক ওদিক মাথা দুলানো। আমার মনে আছে ছোট বেলায় দু-এক বেলা উপোসও করেছি। বাবা মাঝে মাঝে চিন্তায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো। বাবার জন্যই তো সব। অলসতার কারণে সবকিছু হারিয়েছে। তার ফল ভোগ করেছি আমরা। মাকে প্রাধান্য দেয়নি তেমন। তারপরও আমার বাবার মত জ্ঞান হারায়নি্ শক্ত হাতে পরিবারের হাল ধরেছিল, গ্রামের হাজার কুংস্কার, পিছু কথা ইভেন সামনে কথাকেও মা অগ্রাহ্য করে একে একে সবকয়টা ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করেছে। আজ সবাই সুখে আছে সবাই ভালো আছে। কিন্তু মায়ের চিন্তা এখনও দুর হয়নি। আমাকে নিয়ে, মা মনে করে আমি মায়ের কথা মানি না, তার কথা শুনিনা, আমি মনে মাকে অতটা শ্রদ্ধা করিনা, কিন্তু আমি তো জানি আমি কতটা ভালোবাসি। কতটা-------------। আমি ডানপিটে মেয়ে তার। বিয়ে করতে চাইনা। কেন চাইনা মা হিসাব করে বলতে পারে না। তার কাছে খটকা লাগে। কিন্তু মাকে তো আমি বোঝাতে পারি না। বিয়ে করলে কি হবে? বাচচা কাচ্চা, একটা চার দেয়ালের ঘর আর সেই চার দেয়ালে টানানো থাকবে স্বামীর আদেশ, হুমুক, খবরদারী। এখানে যেওনা, ওখানে গিয়েছিলে কেন। টাকা দিয়ে কি করবে। আরো কত কি??? সে যাই হোক। আমার মাকে আমি অনেক অনেক ভালো বাসি।
একবার আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, বাসায় আমি, আমার ভাই আর বাবা ছাড়া কেউ নেই। রাতে আমি একা খাটে ঘুমানো। কি যেন একটা অন্ধকার লাভার মত আমাকে পা থেকে গিলে খাওয়া শুরু করল। আমি জানা যত দোয়া কালাম ছিল, সব পড়ে একসাথ। কিছুতে কিছু কাজ হয় না। সে অন্ধকারটা আমার বুক পর্যন্ত এসে পড়েছে। আমার আর কোন উপায় না দেখে জোরে চিৎকার দিলাম-- মা --------- আমাকে বাঁচাও। সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথার উপর একটা হাত অনুভব করলাম (আমি তখন ভয়ে আধো ঘুমে) তাকিয়ে দেখি আমার মায়ের হাত। হাত মাথায় রাখার সাথে সাথে অন্ধকারটা বস্তুটা আমার শরীর থেকে সরাত করে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। নিচের দিকে তাকিয়ে ফের উপরের দিকে তাকালাম। মাকে আর দেখলাম না। এই মা আমার মা। আমি তাকে ভালো বাসবো কাকে ভালোবাসবো।
ভোর হতে না হতেই মায়ের কাছে সেই ২টা নদী পার হয়ে চলে গেলাম। কিন্তু স্বপ্নের কথা মাকে বলিনি। শুধু কাছে গিয়ে মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছিলাম। সেই থেকে আমি মাকে দূরে কোথাও গেলে, কোন বড় কাজে গেলে মাকে সালাম করে যাই যদি কাছে থাকে। মাঝে মাঝে ফ্লাইং কিছু কাজ থাকে মাসে ২-৩ দিন তখন অনেক রাতে বাসায় ফিরতে হয়। রাস্তায় যখন একা হাটি বা রিকসায় চলি তখন একবার যদি আল্লাহকে ডাকি তো ১০বার মাকে ডাকি। মাকে ডেকে বেশি স্বস্তি পাই।
আমার মা সেই থ্রি ক্লাস পড়া মহিলা। সেই থ্রি পাস মা তখনই জানতো মেয়েদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। ওদেরও মতামত থাকবে সব কাজে। আমাদের কাউকে কোন কাজে বাধা দিত না। তাই আমরা একেকটা হয়েছি জীবন সংগ্রামের সৈনিক। যারা কেউ হারেনি আজো। সবাই যার যার জায়গায় থেকে জয়ী। জীবনের প্রাপ্তিতে তৃপ্ত। তারপরও মায়ের চিন্তা দূর হয় না। তার মেয়েরা একেকজন, একেক জায়গায়। তার মনটা পড়ে থাকে ৬ জায়গায়। কেন? সে যে মা !
মায়ের সেই কথা মনে পড়লে আজো গা শিউরে ওঠে। প্রতিবেশির সাথে তর্ক বেধেছিল বলে- আমরা দুই বোন কথা বলেছিলাম। তার সাথে তর্ক হয়েছিল সে ছিল পুরুষ। মা তার সাথে কথায় পেরে উঠছিল না বলে আমরা চুপ করে থাকতে পারলাম না। সে লোকটা মাকে তখন বলল-আপনার আমার মধ্যে কথা হচ্ছে এর মধ্যে আপনার মেয়েরা আসছে কেন? মা তখন তাকে বলল-- আসবে অবশ্যই কারণ ওরা আমার মেয়ে--।
হ্যাঁ সেই মায়ের গল্পই করছিলাম। আমাদের পড়াশুনা এবং সংগ্রামী জীবনে বাবার ভূমিকা ছিল অতি গৌণ। মা-ই ছিল প্রধান।
তাইতো একথাটা সত্য- "আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটা শিক্ষিত সমাজ বা জাতি দিবো।" আমার মায়ের জন্য সবাই দোয়া করবেন। এখনও যতদিন বাঁচবে যেন সুখ, শান্তিতে বাঁচতে পারে। আমরা যেন তাকে শান্তি-সুখ দিতে পারি। দোয়া করবেন সবাই।
আমার মা-বাবা দুজই বেচেঁ আছেন, সুস্থ্য ভাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


