রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে খেতে খেতে ঘটনাটা দেখল তারেক।সম্ভবত এক টাকার একটা কয়েন পড়ে গেছে রাস্তায়।সন্ধ্যার অন্ধকারে সেটা খালি চোখে দেখা যাবে না।কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল ছোট বাচ্চাটার মুখ। খালি গা, গা ভর্তি ময়লা, রুক্ষ চুল। এগিয়ে গেল ও। মোবাইল এর আলোটা ধরল নিচু হয়ে । একটু পরেই খোঁজ পাওয়া গেল কয়েনটার! বাচ্চাটা কয়েন হাতে নিয়ে যে হাসি দিল তারেকের দিকে তাকিয়ে, সেরকম নির্মল হাসি বোধহয় শুধু বাচ্চারাই হাসতে পারে। হোক না সে টোকাই।খাবারের দাম দিতে গিয়ে তারেকের ইচ্ছে হল আরো কিছু খেয়ে নিতে! সম্ভব না। টিউশনি নেই এই মাসে। খুবই টানাটানির ভিতর আছে ও। প্রতিটা টাকা হিসেব করে খরচ করতে হয়।ফোনটা বেজে উঠল। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না ওর। আজকাল প্রায়ই এমন হয়। কিছু ভাল লাগছে না। সেদিন পরীক্ষা দিতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল, আর না লিখলে কেমন হয়! এমন না যে ও পারে না, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। নিজের চিন্তায় নিজেই হেসে ফেলল তারেক। লক্ষ্য করল, স্যার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে! বৃষ্টি নামবে বোধহয়। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। হলের গেটে পা রাখতেই ঝুম বৃষ্টি নামল। বহুদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। আজ ভিজলে কেমন হয়? গেট ছেড়ে হলের খুব ছোট্ট মাঠে নেমে পড়ল ও। আহ, কি অদ্ভুত ভালো লাগা! বৃষ্টির একেকটি ফোঁটা যেন এক এক বিন্দু জমে থাকা ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে! ক্লান্তি হয়ত ধুয়ে যায়, কিন্তু বিষন্নতা কি যায়? ভাবতে থাকে ও। "কিরে বৃষ্টিতে ভিজতেছিস কেন? ঠান্ডা লাগবে কিন্তু এই বৃষ্টিতে", তিন তলার বারান্দা থেকে চিৎকার করছে রাশেদ, ওর রুমমেট। নীরব হাসিতে বন্ধুর সহৃদয় উৎকণ্ঠা উপভোগ করে ও।হঠাৎ করে ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়, এই বৃষ্টি দেখে। ও তখন ক্লাশ ফাইভে পড়ে।ছোট বেলা থেকেই তারেকদের অবস্থা বেশি ভাল ছিল না। সেদিন নানা বাড়িতে ওদের দাওয়াত ছিল। মেজ মামা এসেছেন শহর থেকে। বিশাল হৈ চৈ। বিকেলবেলা, সব বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে বের হবেন তিনি। তারেকের ছোট বোন মিমি, খুব উত্তেজিত! মামার সাথে ঘুরতে যাবে। যে জামাটা পরে আছে সেটা কি সুন্দর? এর চেয়ে লাল জামাটা বেশি সুন্দর ছিল না? মা কেন সেটা পরতে দিল না? এরকম হাজারো প্রশ্নে বোনকে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে তারেক। মা রান্নাঘরে। যেহেতু তারেকদের অবস্থা ভালো না, সুতরাং নানা বাড়িতে আসলে তারেকের মাকেই রান্নাঘরে যেতে হয়, বড় খালা অথবা মামীরা সেদিকে পা বাড়ান না।তারেক যখন বোনকে বুঝাতে ব্যস্ত, অবাক হয়ে দেখল মেজ মামা বে্র হয়ে যাচ্ছেন। সাথে বড় খালা, ছোট খালা আর বড় মামার বাচ্চারা, মেজ মামার জাপানি পুতুলের মত মেয়েটাও আছে।অথচ একবারও ওদের কথা জিজ্ঞেস করলেন না। পাঁচ বছরের মিমি পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জানালা দিয়ে। সেদিন সন্ধ্যায় ও খুব বৃষ্টি নেমেছিল। বোনকে কোলে বসিয়ে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল তারেক।
"কিরে তুই বৃষ্টিতে ভেজার সময় মাঠে এমন চক্কর দিচ্ছিলি কেন?"। "তাই নাকি?", অবাক হয় তারেক , রাশেদের কথা শুনে। "পাগল হয়ে যাচ্ছি বোধ হয়!", চুল মুছতে মুছতে উত্তর দেয় তারেক।ফোনটা আবার বাজছে। নীলা ফোন করেছে।"হ্যালো"। 'আমি এর আগে ফোন করেছিলাম। ধর নি কেন? "। "আসলে বুঝতে পারিনি নীলা, তুমি ফোন করছ"। "ক্যাফেতে আস। তোমার সাথে কথা আছে।"।ক্যাফের কোনার একটা টেবিলে বসে আছে নীলা। সন্ধ্যার পর ছাত্ররা কম আসে ক্যাফেতে। তাই ভীড় থাকে না।বসার সাথে সাথেই বলে নীলা, "তারেক তোমার কি হয়েছে? "। "কিছু হয় নি তো"।" তোমাকে আমি যা বলেছিলাম তা মনে আছে?"। "হ্যাঁ,", অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় ও। "এখন কি করবে?"। চুপ করে থাকে তারেক।"আমার বাসা থেকে খুব ঝামেলা হচ্ছে।তুমি তো জানো বাবার এর আগে স্ট্রোক হয়েছিল।বাবা চাইছেন যত তাড়াতাড়ি পারেন বিয়েটা দিতে। তার মাথায় এখন রিটায়ারমেন্টের চিন্তা। এর আগে তিনি তার মেয়েকে বিয়ে দিতে চান।" " তোমার বাবা কি উনার পছন্দ করা ছেলের বদলে, আমাকে মেনে নিবেন? আমার তো পাশ করতে এখনো বছরখানেকের মত লাগবে"। "না , মেনে নিবে না বাবা", এবার নীলা উত্তর দেয় অন্যদিকে তাকিয়ে। "তাহলে এখন কি করতে চাইছ তুমি?"। চুপ করে থাকে নীলা। চুপ থাকে তারেকও।"নীলা, তোমার প্রতি আমার কোন রাগ নেই। তুমি কোন অপরাধবোধেও ভুগো না।ভা্লো থেক।"। ধীরে ধীরে ক্যাফে থেকে বের হয়ে আসে ও। আবার বৃষ্টি নামছে এক দু ফোঁটা করে। এত অসময়ে নামে কেন বৃষ্টি?, নিজের মনের কাছে জিজ্ঞাসা রেখে হাঁটতে থাকে তারেক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

