তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি তখন। স্কুল এর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। দৌঁড়াচ্ছিলাম। প্রথমজনের পরেই ছিলাম। হঠাৎ পাশ থেকে ছোট্ট ধাক্কা। মূহুর্তেই মাটিতে আমি। পড়ে রইলাম। স্যারেরা দেখলেন না। খুব অভিমান হয়েছিল সেদিন। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় এসেছিলাম। তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলে, এত মন খারাপ করতে হয় না। সামনের বার তুমি প্রাইজ পাবে। মন খারাপটা কমে নি। কিন্তু পরের বার ঠিক ই প্রাইজ পেয়েছিলাম। এভাবেই জীবনকে দেখতে শিখিয়েছিলে তুমি মা। অসম্ভব দুষ্টু ছিলাম। সারাদিন একমাত্র কাজ ক্রিকেট খেলা দেখা আর খেলা।কখনো রাগ কর নি। পরীক্ষায় ফার্স্ট হতেই হবে, এমন কথা কখনো বলতে না। তবুও কিভাবে কিভাবে যেন হয়ে যেতাম! কেমন সুন্দর করে তুমি পড়াতে যে!কখনই পড়াটাকে চাপিয়ে দিতে না। সারা দিন কাজ করে শেষ বিকালে খেতে বসেছ তুমি, এমন সময় দরজায় ভিক্ষুক, নিজে হাতে খাবার দিয়ে আসতে , পানি দিয়ে আসতে, আরো কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে।
মধ্যবিত্ত সংসার। সব দিকে সামলানোটাই মুশকিল। তবুও প্রতি মূহুর্তে অসংখ্য আব্দার আমার। কখনো না বলেছ বলে মনে পড়ে না।সমবয়সীদের কাছে যখন শুনতাম তাদের বাবা- মায়েরা গল্পের বই পড়াকে চরমতম অপরাধ বলে গণ্য করেন, তখন আমার বই পড়ার নেশা দেখে নিয়মিত টাকা দিয়ে যেতে তুমি বই কেনার জন্য। কখনো জানতে চাইনি এই সীমিত আয়ের সংসারে কোথায় পাচ্ছ তুমি তা।পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁকিবাজ আমার জান-প্রাণ দিয়ে পড়তে থাকা আর পাশের রুমে জানালার পাশে রাত জেগে থাকা তুমি। যদি আমার কিছু লাগে! জর হয়েছে আমার। বিছানায় শুয়ে থাকা সারাদিন। দশ মিনিট পর পর আমার মুখে থার্মোমিটার দিয়ে দেখ জ্বর কমল কিনা!
সেদিনের কথাটা খুব মনে পড়ে। রিকশায় যাচ্ছিলাম তোমার সাথে। কিছু বোঝার আগেই পেছন থেকে আরেকটা রিকশার প্রচন্ড ধাক্কা। ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি।নিজেকে না সামলে আমাকে ধরে রাখলে তুমি। রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় ব্যথা পেয়ে অজ্ঞাণ হয়ে গিয়েছিলে। ডাক্তাররা বলছিলেন ৪৮ ঘন্টা দেখবেন তারা, এরপর আর কিছু করার থাকবে না। ফিরে এসেছিলে তুমি।এরপর থেকেই মাইগ্রেন ব্যথার সাথে যুক্ত হল এই ব্যথা, এখনো খুব ভোগায় তোমাকে এটা। তবুও তোমার মুখে দেখিনি বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ।
ঝুম বৃষ্টি নেমেছে রাতের আকাশে। রাতের খাবার রান্না করে সবে রান্না ঘর থেকে এলে তুমি। খিচুড়ি খাব, আমার ইচ্ছা। একটুও বিরক্ত না হয়ে আবার চুলোর পাশে চলে যেতে আমার বর্ষা যাপনের আবদার রক্ষায়! সবসময় বলতে মানুষকে ভালোবাসতে শিখতে। ছোটবেলায় বুঝতাম না কথাটার অর্থ। তবুও মাথা নেড়ে সায় দিতাম।মা তোমার মনে আছে সেই বৃদ্ধ মহিলাটার কথা, যাকে নিয়মিত পুরোন কাপড় সহ অনেক কিছু দিতে তুমি? তোমার সামনে একদিন সেই ভিক্ষুক মহিলা আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছিল বলে আমি রাগ করে আজেবাজে কিছু বলেছিলাম। ভিক্ষুক হয়ে নোংরা হাত দিয়ে আমাকে ছুঁবে কেন! এই ছিল আমার যুক্তি! খুব জোরে গালে চড় মেরেছিলে সেদিন। তারপর বুঝিয়ে বলেছিলে, মানুষকে ঘৃণা করতে হয় না। মা তুমি শিখিয়েছিলে ভুল করলে সরি বলে সেই ভুলের আর পুনরাবৃত্তি না করতে।বলতে, অনেক অনেক বড় মানুষ হওয়ার দরকার নেই, খুব ভালো মানুষ হওয়ার দরকার।
তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে থাকি এখন। নিজের পড়াশোনা, টিউশনি, সাথে অন্যান্য কাজ, খুব ব্যস্ত সময় কাটে। যোগাযোগ করা হয় না নিয়মিত। তবুও কখনো অভিমান নেই তোমার কথায়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বিছানা অগোছাল রেখে যাওয়া হয় না, তুমি তো নেই, যে এসে গুছিয়ে দিয়ে যাবে! জমে থাকা ময়লা কাপড় গুলো নিজেকেই ধুতে হয়। হাত বাড়ালেই হাতের কাছে সব তৈরি পাই না।তাইতো মাঝে মাঝে দীঃর্ঘশাস আসে অজান্তে। ছুটির দিনগুলোতে বাড়ি এলে কত ব্যস্ততা তোমার আমাকে নিয়ে! প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা দিনে যে স্নেহ –ভালোবাসায় বড় করেছ আমায় তা ব্যাক্ত করার মত যোগ্যতা আমার নেই। একারণে তোমার প্রতি শুধু শ্রদ্ধা জানিয়ে তোমাকে ছোট করার দুঃসাহস
আমার নেই। তবুও বলব, মা তোমাকে খুব ভালোবাসি।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১২ সকাল ৭:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



