somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বন্ধু রাশেদ, যে বন্ধুটাকে কখনো ভুলতে পারব না

২০ শে এপ্রিল, ২০১১ রাত ১০:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলা থেকেই অন্ধভক্ত ছিলাম জাফর ইকবাল স্যারের লেখার। ভার্সিটি লাইফের মাঝামাঝি এসেও সেই মুগ্ধতা একটুও কমে নি! এখনো সমান আগ্রহ নিয়ে পড়ি তাঁর সব নতুন উপন্যাস গুলো। কিশোর উপন্যাস হলে তো কথাই নেই! এভাবেই একদিন পড়লাম "আমার বন্ধু রাশেদ" উপন্যাসটি। কোন ক্লাশে পড়ি তখন? সম্ভবত ক্লাশ এইট।এক বসায় উপন্যাস টা যখন পড়া শেষ করেছিলাম, তখনকার অনুভুতিটা ছিল ভয়াবহ! ভয়াবহ বলছি এ কারনে যে, রাশেদের মৃত্যুতে যে তীব্র আঘাতটা পেয়েছিলাম, তা খুবই অসহনীয় ছিল সেই কৈশোরে। কতদিন যে ভেবেছি আনমনে ইশ, রাশেদ যদি না মারা যেত। বহুদিন হয়ত আর মনে ছিল না সেই দুর্দান্ত সাহসী,বুদ্ধিমান কিশোরটির কথা। কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিল পত্রিকার একটি নিউজ, "আমার বন্ধু রাশেদ" উপন্যাসটি নিয়ে সিনেমা হবে! অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম, কবে মুক্তি পাবে সিনেমাটা আর তা দেখতে পাব!


অবশেষে সিনেমা হলে হাজির আমি।সিনেমা শুরু হল। প্রথমেই ইবু তার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে নিজের সেই কৈশোরের মফস্বলে। ছেলের সাথে কথা বলতেই বলতেই ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায় ইকবাল। মূল কাহিনী শুরু হয়। রাশেদকে সিনেমায় প্রথম দেখা যায় ক্লাশে ভর্তির কাগজ হাতে নিয়ে ক্লাশ টীচার এর সামনে এসে দাঁড়াতে। কি আশ্চর্য! উপন্যাসটা পড়ে ঠিক যেরকম একটা ছেলে কল্পনায় ভেসে ওঠে সেরকম একজনই এসে দাঁড়িয়েছে সিনেমার পর্দায়! মনে মনে অনেকগুলো ধন্যবাদ দিয়ে দেই মোরশেদুল ইসলামকে! রাশেদের নাম যে প্রথমে লাড্ডু ছিল, আর নতুন নাম রাশেদ ঠিক হওয়ার পর তার সাথে বন্ধুদের সখ্যতা গড়ে ওঠা সব দৃশ্যগুলো একে একে যেতে থাকে চোখের সামনে দিয়ে। রাশেদের অসম্ভব সাহসের পরিচয় প্রথম পাওয়া যায় যখন ক্লাশের সবচেয়ে মারপিট পারদর্শী কাদেরের সাথে তাকে সমান তালে মারপিট করতে দেখা যায়।রাশেদকে মারার শাস্তি হিসেবে যখন রাশেদের পাড়ার কাচ্চু ভাই কাদেরকে মাথা ন্যাড়া করে দেন। আর সেই ন্যাড়া মাথা নিয়ে অসহায় রাগে কাদেরের ক্যাপ পরে থাকার দৃশ্যটি হল ভর্তি দর্শককে হাসায়! সিনেমা এগোতে থাকে। রাশেদের রাজনৈতিক সচেতনতায় শুধু তার বন্ধু ইবু,আশরাফ, ফজলু, দিলীপ যে অবাক হয় তা না, হতবাক হয়ে যান শফিক ভাইও। এর ই মাঝে একদিন বন্ধুদের নিয়ে মিছিলে যায় রাশেদ। যে কিশোরেরা স্বাধীন বাংলাদেশ শব্দটাই কখনো শোনেনি তারাই এই দেশের জন্য ঘরের শাসনের কথা ভুলে গিয়ে মিছিলে যায় রাশেদের সাথে। হঠাৎ ই একদিন বিকেলে ইবু শুনতে পায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকা শহরে হাজার হাজার মানুষ মেরে ফেলেছে মিলিটারীরা। কিছু বুঝে উঠার আগেই মিলিটারী এসে পড়ে ওদের ওই ছোট্ট শহরটাতেও। সবাই যখন আতঙ্কে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে, তখন কিশোর রাশেদ ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো শহর। মিলিটারীদের প্রতিটা কাজ লক্ষ্য করছে দূর থেকে, আর তালিকা তৈরি করছে বিশ্বাসঘাতকদের। তাইতো কিশোর রাশেদ যখন পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলে , "এটা বিশ্বাস ঘাতকদের তালিকা" , খুব একটা অবাক হই না । রাশেদ ই তো এই কাজ করবে। তবে তালিকা বানিয়েই বসে থাকেনা রাশেদ, আরো কত কাজ বাকি তার। সিনেমার খুব একটা মজার দৃশ্য হচ্ছে রাজাকার আজরফ আলীর অন্য দুই রাজাকারের পা ধরে কান্নাকাটির দৃশ্যটি! ব্যাপারটা এমন, রাশেদ আর ইবু শান্তি কমিটির অফিসে যেয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে পায়, দুই রাজাকারকে পাঠানো হচ্ছে আজরফ আলীর কাছে একটি চিঠি দিয়ে। মুহুর্তেই করনীয় ঠিক করে ফেলে রাশেদ! একটূ আগেই রাজাকার আজরফ আলীকে রাস্তায় দেখে এসেছে ওরা। শার্ট খুলে মুখে বেঁধে নেয় রাশেদ। দৌঁড়ে যায় আজরফ আলীর কাছে, তার কাছে গিয়ে বলে, "আপনাকে মারতে আসছে দুই মুক্তিযোদ্ধা", বলেই দৌড়ে সরে যায়। ভয়ে অন্তরাত্বা কেঁপে যায় আজরফ আলীর। এই দিকে এসে পড়ে সেই দুই রাজাকার! দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে আজরফ আলী! হতভম্ব দুই রাজাকার আজরফ আলীকে জাপ্টে ধরে। আর আজরফ আলী কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরে তাদের পা! বলে, "আমারে ছাইড়া দ্যান, আমি মুক্তি বাহিনী, আমারে ছাইড়া দ্যান"। রাজাকাররা যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করে ততই জোরে পা চেপে ধরে কাঁদতে থাকে আজরফ আলী! পুরো সিনেমা হল তুমুল উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে ঘৃন্য রাজাকারের এই অবস্থা দেখে! আর এদিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সবার সাথেই মজা দেখছে রাশেদ আর ইবু! এই ঘটনায় পুরো শহরে রটে যায় , শহরে মুক্তিবাহিনী নেমেছে, এবার আর পাকবাহিনীর রক্ষা নাই। তবে শুধু এসবেই থেমে থাকে না রাশেদের কাজ। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র-গুলি পৌছে দেয়া, নিজেদের স্কুলের ম্যাপ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে তাদের সাথে বসে যুদ্ধ পরিকল্পনায় অংশ নেয়া, এমনকি শেষ পর্যন্ত ইবু আর রাশেদ শফিক ভাইয়ের সাথে ওদের স্কুলের পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমনেও অংশ নেয়। পাকিস্তানিদের ক্যাম্পটা অনেকখানিই ধ্বংস হয়, কিন্তু ধরা পড়েন শফিক ভাই। পরদিন প্রকাশ্যে তার ফাঁসি দেয়ার আয়োজন করতে থাকে আজরফ আলী। এবার আবার দৃশ্যপটে হাজির রাশেদ।মুক্তিযোদ্ধাদের সুইসাইড স্কোয়াডের কথা ছড়িয়ে দিয়ে পন্ড করে দেয় সেই আয়োজন।শফিক ভাইকে হাসপাতালে পাঠায় রাজাকারেরা , সুস্থ হলে অত্যাচার করে মারবে বলে। আর এদিকে চার বন্ধু মিলে বসে একসাথে।রাশেদের পরিকল্পনায়, ডাক্তার সাহেবের সহযোগিতায় আর ইবু, আশরাফ ও ফজলুর সাহায্যে অবিশ্বাস্য কিন্তু খুব সহজেই শফিক ভাইকে উদ্ধার করে ওরা!এর পরই হঠাৎ করে ইবুর বাসায় সিদ্ধান্ত হয় ওরা শহর ছেড়ে চলে যাবে অরু আপাদের সাথে। ফজলু আর আশরাফ চলে গিয়েছে আরো আগে। বিকেলবেলা দুই বন্ধু গিয়ে বসে সেই চেনা রেলব্রিজটার উপরে। এসময় রাশেদ যখন বলে ওঠে, "ইবু তুইও চলে যাবি? আমি একা হয়ে যাব রে। সব কাজ এখন থেকে একা একাই করতে হবে"। রাশেদের এই মন ভেঙ্গে দেয়ার মত কথাটা শুনে খুব ইচ্ছে করে নিজেকে নিয়ে যেতে এই সাহসী , বুদ্ধিমান কিশোরটির পাশে। রাশেদের সেই হতাশা যেন সমানভাবে আমাকেও ছুঁয়ে যায়। পুরো সিনেমার ভেতর অসাধারন একটা দৃশ্য রাশেদ আর ইবুর এই রেলব্রিজের উপর চুপচাপ বসে থাকা। ক্যামেরার কাজ ছিল অসম্ভব সুন্দর।চলে যায় ইবু। আর তার পরপরই বজ্রাহতের মত দেখতে পাই, নদীর পাড়ে চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা রাশেদকে। রাইফেল ধরে আছে রাজাকার আজরফ আলী। শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে এই এই কিশোরের মুখে। কি অসম্ভব দৃঢ়তায় সে উচ্চারন করে "জয় বাংলা"।গুলি করে আজরফ আলী। পড়ে যায় রাশেদ। ওহ, কি ভয়ঙ্কর বিষন্নতা যে সে মুহুর্তে চেপে ধরে তা বলার মত না। রাশেদ মরে গেছে? বিশ্বাস হয় না, সত্যি বিশ্বাস হয় না। সত্যি বলছি, চোখের পানি সামলানো তখন কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। কারন রাশেদ তো শুধু উপন্যাসের কোন চরিত্র নয়। আমার সেরা সাহসী বন্ধু সে, আমার দেশটাকে তো স্বাধীন করেছে রাশেদরাই।


অনেক দিন পর সত্যিকারের একটা অসাধারন বাংলা মুভি দেখা হল মোর্শেদুল ইসলামের নৈপুন্যে। সত্যি বলতে কি, অনেক ক্ষেত্রে তিনি উপন্যাসকেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তাইতো মুভিটা দেখা শেষ করে এটাকে কোন মুভি মনে হয় না, মনে হয় আমার সেই বহু বছর আগের বন্ধুটাকে দেখে এলাম। কোনভাবেই মনটা ভালো করতে পারি না, বার বার মনে হয় রাশেদ কে ওরা বাঁচতে দিল না।আমার এই লেখাটা আসলে কোন মুভি রিভিউ মূলক পোষ্ট না। শুধুমাত্র নিজের কিছু ভাবনা শেয়ার করতে চাইছিলাম সবার সাথে এই অসাধারন উপন্যাস আর উপন্যাসটাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সিনেমাটা নিয়ে। পুরো মুভিতে ক্যামেরার কাজ, শব্দধারন , কোরিগ্রাফি ছিল অসাধারন। অনুদানের ছবি বলে মনেই হয় নি কখনো। অনেক অনেক ধন্যবাদ জাফর ইকবাল স্যারকে এবং পরিচালক মোর্শেদুল ইসলামকে। যারা এখনো মুভিটা দেখেন নি, তারা দেখে আসতে পারেন। শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, হৃদয়ের গভীর থেকে তীব্র গর্ব আর সেই সাথে সুতীব্র বিষন্নতা অনুভব করবেন এই অদ্ভুত কিশোরটির জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১২ সকাল ৭:০৩
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×