কোন ক্লাশে পড়ি তখন? খুব সম্ভবত ক্লাশ থ্রী। মামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। ব্যাপক চিৎকার- চেঁচামেচি সবাই মিলে! সবাই একসাথে হলে যা হয় আর কি! এর মধ্যেই হঠাৎ করে ছোট মামার পড়ার টেবিলে গিয়ে হাজির আমি (আমাদের পিচ্চিদের খুব পছন্দের জায়গা ছিল সেটা! টেবিলের ড্রয়ার অথবা শেলফ ওলট -পালট করার মজাই আলাদা! ) টেবিলের ওপরেই পড়ে থাকতে দেখলাম বইটাকে। কি সুন্দর মলাট! নামটাও মজার! "নুহাশ ও আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ"। বসে গেলাম বইটা পড়তে। অবিশ্বাস্য! এত সুন্দর! এত মজার কাহিনী! ইশ, নুহাশের কত দুঃখ! ক্লাশ থ্রীতে পড়া বালক অভিভূত হয়ে গেল সেই যে, আজ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র ও কমেনি সেই মুগ্ধতা। হুমায়ুন আহমেদ, নামটাই যেন এক জাদু। খুব সম্ভবত গল্পের বই পড়ার জন্য আমার যে পাগলের মত নেশা তার শুরু এই কাহিনী থেকেই। বললে হয়ত অনেকেই বিশ্বাস করবেন না, সেই বয়সেই পড়া শুরু করেছিলাম হুমায়ুন আহমেদেরই অবিস্মরনীয় চরিত্র হিমুর অসাধারন একটা বই, "দরজার ওপাশে"। মামার বাসায় শেলফ ভর্তি অনেক বই। যেখানে সারা বাসা জুড়ে অন্য সবাই হৈ-হুল্লোড় করছে , আমি ছোট মামার রুমের দরজা চাপিয়ে দিয়ে , গ্রোগাসে গিলছি একের পর এক উপন্যাস! যা সেই বয়সের বাচ্চাদের জন্য নাকি পড়া পুরো নিষিদ্ধ! আম্মু খেয়াল করবে কখন, বাড়ি ভর্তি মানুষ। কিন্তু তাই বলে বাসার মানুষদের এই কথা জানতে বেশিদিন লাগেনি যে, এই ছেলেটা এই বয়সেই এভাবে উপন্যাস, গল্প পড়ছে! তবে আসল মজা হল তখন, যখন দেখলাম কেউ আমাকে কিছুই বলছে না! বরং তারা যেন এটাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছে। এমনকি কোন বই পড়ব বা পড়ব না সে ব্যাপারেও কারো কোনরকম নিষে্ধাজ্ঞা নেই! সুতরাং, আমিও অবর্ননীয় মুগ্ধ্তায় ডুবে গিয়ে পড়তে লাগলাম হুমায়ুন আহমেদের একের পর এক উপন্যাস। শুধু কি হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসই পড়েছি? না। বইয়ের জগতের ভেতর যে অসাধারন ভালো লাগা লুকিয়ে আছে, তা আমি টের পেয়ে গেছি ততদিনে হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে। তাই হাতের কাছে যে লেখকের বই পেতাম তাইই পড়ে ফেলতাম। ক্লাশ সেভেনেই পড়ে ফেলেছিলাম "দূরবীন"। স্কুলের রেজাল্টের সুবাদে প্রতি বছরই বেশ কিছু বই পেতাম উপহার হিসেবে। মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাথে পরিচয় সেই সুবাদেই। ক্লাশ ফাইভে থাকাকালীন তার "দুষ্টু ছেলের দল " বইটা পড়ে ইচ্ছে হচ্ছিল এখনই এই লেখকের সব বই কিনে ফেলি! জাফর ইকবাল স্যারের সায়েন্স ফিকশন তো এরপর পড়েছি পুরোপুরি নেশাগ্রস্থের মত! শুধু যে বই পড়ি তাও না, বই কিনি ইচ্ছেমত। মধ্যবিত্ত সংসার। কত সমস্যা। কিন্তু কখনো মনে পড়ে না, বই কেনার টাকা চেয়ে আম্মুর কাছ থেকে পাই নাই, এমন হয়েছে। ঈদের মার্কেটিং এ গেলেও আমার আগে বই কিনতে হবে! নাইন-টেনে পড়ি তখন। চলে এসেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সেই গাড়ী। বই পড়ার গতি বাড়ল আরো বহুগুনে। এমন ও হয়েছে, গাড়ীতে বসেই একটা বই পড়েছি, আরেকটা নিয়ে গিয়েছি, এক ঘন্টা পর আবার সেই বই ফেরত দিয়ে অন্য বই নিতে চলে এসেছি! ( যেহেতু খুলনা যথেষ্ঠ ছোট শহর, সুতরাং দুই-এক ঘন্টা পর পর গাড়ী যেখানে যেখানে যেত তা কখনোই সাইকেলে দশ-বিশ মিনিটের বেশি দূরত্বের হত না ) । ইন্টারে ওঠার পর শুরু হল বইমেলায় যাওয়া। খুলনায় কখনোই সেভাবে বইমেলা হয় না,যেভাবে ঢাকায় আয়োজন করে হয়। কিন্তু আমি যখন ইন্টারে পড়ি সেই সময় থেকে মোটামুটি ভালো প্রচারনা চালিয়ে বইমেলা শুর হল। কিন্তু সেই বইমেলাও ঢাকার মত প্রকাশনা সংস্থা নির্ভর বইমেলা না। বরং পুরো শহরজুড়ে যেসব বইয়ের দোকান আছে, তারাই এখানে স্টল দেয়, বই বিক্রি করে। সন্ধ্যা হওয়ার মুহুর্তে প্রাইভেট পড়া শেষ করে তিন-চার বন্ধু মিলে যখন সাইকেলে ছুটতে ছুটতে বইমেলায় যেতাম, আর রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে সাইকেল পাশে ধরে রেখে হেটে হেটে বাসায় ফিরতাম, সে আনন্দের তুলনা নেই! হাত ভর্তি বই! কি আনন্দ! কি অসাধারন রহস্য না লুকিয়ে আছে বইগুলোর ভেতর!স্বীকার করছি, আমি শুধু মাত্র হুমায়ুন আহমেদ আর জাফর ইকবাল স্যারের বইই কি্নতাম! এই দুজনার কোন নতুন বই বের হবে, আর আমি কিনব না, তা হতে পারে না! অন্য লেখকদের বই ও কিনেছি, তবে তা খুব যৎসামান্য। ওগুলো বন্ধুদের কাছ থেকেই পাওয়া যেত অজস্র! ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম।ঢাকায় চলে আসা হল। লাইন ধরে ঢুকতে হয় একুশে বই মেলায়। যুদ্ধ করে কিনতে হয় হুমায়ুন আহমেদ অথবা জাফর ইকবালের বই! কিন্তু কেনার পর যে আত্ব তৃপ্তি পাই, তা আজ ও সেই ইন্টার লাইফ অথবা ক্লাশ সেভেনের সময়কার বই কেনার মতই। টিউশনির প্রায় পুরো টাকাই উড়ে গেছে বই কেনার পেছনে এমন ও হয়েছে! নীলক্ষেত দিয়ে যাওয়া আসা হলেই দাঁড়িয়ে যাই ফুটপাতের বই এর দোকানগুলোর সামনে। বই না কিনে ফিরেছি এমন দিন খুব কম গিয়েছে! ফলশ্রুতিতে অন্য লেখকদের বইয়ের সম্ভার ও বেড়েছে অনেকটা!
অনেক কথাই বলা হল বই নিয়ে, বই পড়া নিয়ে। কিন্তু এত কথা বলার উদ্দেশ্য যে কথাটা বলা, তা হচ্ছে হুমায়ুন আহমেদ। অনেককেই অনেকবার বলতে শুনেছি, হুমায়ুন আহমেদ নাকি বাংলা সাহিত্যের পাঠক বাড়াননি , শুধু নিজের পাঠক বাড়িয়েছেন। এমনকি একবার স্যার নিজেও এই কথা বলেছিলেন, খুব সম্ভবত অতি জ্ঞানীদের কথায় ত্যক্ত -বিরক্ত হয়েই। কিন্তু কথাটা যে কত বড় মিথ্যা তার প্রমান তো আমার কাছে আমি নিজেই! একজন হুমায়ুন আহমেদের অসাধারন লেখার কারনেই তো গল্পের বই বা উপন্যাস বা সাহিত্য যেটাই বলি তার প্রতি যে তীব্র আগ্রহ, তা তৈরি হয়েছিল আমার ভেতর। আমি নিশ্চিতভাবে জানি, যারা হুমায়ুন আহমেদের অন্ধ ভক্ত তারা অন্য লেখকের লেখাও প্রচুর পড়েন। পড়তে বাধ্য হন। কেননা হুমায়ুন আহমেদ এমন এক জগতে পাঠককে নিয়ে যান, যেই মুগ্ধতার কারনে পাঠকেরা বার বার ডুবে যান বইয়ের জগতে। সব ধরনের বইয়েই তারা খুঁজে ফেরেন সেই মুগ্ধতা, শুদ্ধতা। আর এভাবেই বাড়ে সাহিত্যের পাঠক।
ব্যক্তি হুমায়ুন আহমেদ নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছে আমার নেই, সেই যোগ্যতাই নেই আমার। কিন্তু যারা তার দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে মুখের ফেনা তুলে ফেলেন তারা ভুলে যান, এই মানুষটা নিজের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে প্রত্যন্ত এক গ্রামে গড়ে তুলেছেন বিশ্বমানের স্কুল। এই মানুষটাই আজ নিজে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও , আমাদের দেশে সর্বাধুনিক মানের ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার করার স্বপ্ন দেখান আমাদের। যেসব অতি বুদ্ধির ভারে ন্যুয়ে পড়ে সমালোচকরা হুমায়ুন আহমেদের মুন্ডুপাত করেন তারা বলতে পারবেন তারা এমন কি করেছেন সমাজের জন্য? যখন দেশের সব বুদ্ধিজীবি অথবা তথাকথিত সাহিত্যিকেরা দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের পা চাটায় ব্যস্ত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে, তখনো অসীম সাহসিকতায় হুমায়ুন আহমেদ তীব্র ব্যঙ্গ করেন এ দেশের ভন্ড রাজনীতিবিদদের। কোন ধরনের রাখ ঢাক না করেই তিনি সরাসরি বলে দেন সত্য কথা। আজকের প্রথম আলোতেই তার কচ্ছপকাহিনিতে তিনি লিখেছেন, শীর্ষ ধনীর পর আমরা যাব তিন রাজনীতিবিদের কাছে। তাঁরা কিছুই দেবেন না আমরা জানি। তাঁরা নিতে জানেন, দিতে জানেন না। কয়জন সাহিত্যিক এরকম সাহস দেখাতে পারেন? আমি জানি কেউ পারেন না, কারন হুমায়ুন আহমেদ একজনই।
হুমায়ুন আহমেদ নিয়ে লেখার মত যোগ্যতা আমার নেই। শুধুমাত্র এই মানুষটার সাথে আমার মিশে থাকা আবেগ এবং অনুভুতিকে প্রকাশ করতেই এই লেখা। একজন হুমায়ুন আহমেদ কখনো পশ্চিম বাংলার তথাকথিত বড় সাহিত্যিকদের মত হানিমুনে যাওয়ার কাহিনী লিখেন না, কিংবা বাংলা সাহিত্যের কোন গুষ্টী উদ্ধার করা বড় প্রফেসরের মত পতিতাপল্লীর ভাষা ব্যবহার করে রগরগে মিথ্যা বর্ননায় ভরা
চটি কাহিনীও লিখেন না, তিনি পুতুপুতু প্রেম কাহিনী লিখেন না কিংবা করেন না কোন দলের চামচামি। তিনি হুমা্যুন আহমেদ। তিনি আমাদের "জোছনা ও জননীর গল্প " শোনান, তিনি হুমায়ুন আহমেদ যিনি "মধ্যাহ্ণের" তীব্র রোদের মাঝেও আমাদের নিয়ে যান এক অদ্ভুত পেছনের বাস্তবতায়। কিংবা অসম্ভব আশাবাদিতার গল্প শোনান , "অন্যদিন" এ। তার হিমু এবং মিসির আলি আমাদের কি সুন্দরভাবেই না গভীর মানবতাবোধ আর মানব চরিত্রের রহস্যময়তার কথা বলে যায়! তিনি একজন হুমায়ুন আহমেদ, যিনি নিজে জীবনের কঠিনতম মুহুর্তে দাড়িয়েও আমাদের কচ্ছপের মত স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে থাকতে শেখান। তিনি আমাদের হুমায়ুন আহমেদ। হুমায়ুন আহমেদ, আপনি বেঁচে থাকুন আরো সুদীর্ঘকাল। বই মেলায় গিয়ে প্রচন্ড ভিড়ের ভেতর হুড়োহুড়ি করে আপনার নতুন বই কেনা হবে না একথা আমি কল্পনাও করতে পারি না।পারব ও না। আপনাকে বাঁচতেই হবে। আমাদের মাঝেই থাকতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


