মানিব্যাগটা খুলেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল আমার। খুচরা দুই টাকা নেই। এখন বাধ্য হয়েই বারো টাকার ভাড়া পনের টাকা দিতে হবে। রিকশাওয়ালা নির্ঘাত বলবে তার কাছে ভাংতি নেই। আমার একটা বদ অভ্যাস হচ্ছে পকেটে যে দুই টাকা বা এক টাকার খুচরো গুলো থাকে তা বুক শেলফ এর নিচের তাকে রেখে দেয়া। তবে এটার যুক্তি আছে। হলে কিছুক্ষন পর পর ক্যান্টিন বয়রা চা নিয়ে আসে। তখন ওদের কে দিয়ে দেয়া হয় টাকাগুলো সহজে। কিন্তু পরে একদমই খুচরো সাথে না থাকায় বাইরে অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে হয়। রিকশাওয়ালার দিকে পনের টাকা এগিয়ে দিতেই সে হাসি মুখে বলল, "ভাংটি নাই স্যার"। কোন কথা না বলে বারো টাকার ভাড়া পনের টাকা দিয়ে চলে আসলাম। তিন টাকা নিয়ে এত চিন্তার আসলে কিছু ছিল না। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। টিউশনি নেই গত দুই মাস, সুতরাং বাধ্য হয়েই হিসাব করে খরচ করতে হচ্ছে। রুমে ঢূকতেই মেজাজটা সপ্তমে উঠে গেল, রুমমেট পাগলের মত বাজাচ্ছে মেটালিকার গান। আজ ওকে কঠিন কিছু বলতেই হবে। "কিরে এভাবে গান বাজাচ্ছিস কেন? এটা কি মানুষের থাকার জায়গা না? তোর মত অসভ্য ছেলে আমি কম দেখেছি"। মাহী হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বিস্ময়ে কিছু বলতে পারছে না। আসলে গত তিন বছর ধরে আমরা দুই জন এক রুমে আছি। কখনোই নিজেদের ভেতর ঝগড়া দূরে থাক কথা কাটাকাটি ও হয়নি। মাহী মাঝে মাঝে এরকম জোরে গান বাজালেও আমি একবার নিষেধ করলেই বন্ধ করে দেয়। "কিরে তোর কি হইছে?, এরকম করছিস কেন?", বিস্ময়টা এতক্ষনে সামলে নিয়ে ও বলে। বিছানার ওপর বসে আমি মুখটা নিচে নামিয়ে আনি। "দোস্ত আমি সরি। কিছু মনে করিস না"।
অরনীর সাথে আমার পরিচয়টা কিছুটা নাটকীয়ই বলা যায়। ভার্সিটিতে সবে ভর্তি হয়েছি। মাস দুয়েক ক্লাস করেই ক্যাফেতে বসে আড্ডা, কাপের কাপ চা অথবা রাত দুইটায় বন্ধুরা মিলে হাঁটতে বেড়িয়ে পড়া, সবে শুরু হচ্ছে এই লাইফ। একদিন সকালের কথা। আটটায় ক্লাশ থাকায় নাস্তা করা হয়নি। সুতরাং দশটায় ব্রেক পাওয়ার সাথে সাথেই পড়িমড়ি করে ক্যাফেতে ছুটলাম নাস্তা করা জন্য। পরাটা আর ভাজির প্লেটটা নিয়ে যেই না কাউন্টারের সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছি , মনে হল কিছু একটা উড়ে এসে পড়েছে আমার গায়ে!ততক্ষনে ভাজির প্লেট আমার সাদা গেঞ্জিকে হলুদ করে দিয়েছে! রাগে রীতিমত ক্ষেপে গিয়ে চোখ কটমট করে সামনে তাকাতেই স্নিগ্ধ একটা মুখ বলে উঠল , "আমি খুব সরি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমার দেখে আসা উচিত ছিল"। অনেক কষ্টে রাগটা সংবরন করে বলতে বাধ্য হলাম, " না না ঠিক আছে,"। মেয়ে বলেই আজ বেঁচে গেলা, নাহলে....., মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে বললাম! " আপনি আসলেই খুব রেগে গেছেন"। মনে মনে বললাম, "না রাগব না। হাসব হা হা করে। এখন আবার হলে যেয়ে এই গেঞ্জি চেঞ্জ করে আসতে যে কত ঝামেলা"। যাই হোক, আর কিছু না বলে আমি সরে গিয়েছিলাম!
প্রচন্ড গরমে ঘামতে ঘামতে বাসে উঠে যখন দেখলাম একটা সিট ফাকা আছে, তাও আবার জানালার পাশে তখন একটু তো ভালো লাগেইা কিন্তু সিটে বসতে না বসতেই সকালে ক্যাফের মেয়েটাকে দেখলাম বাসে উঠতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে যখন দেখল সিট নেই তখন আমার সিটের পাশে এসেই রড ধরে দাঁড়িয়ে রইল। আরে বাবা, অন্য পাশে দাঁড়ালে সমস্যা কি!এখন তো চক্ষু লজ্জার খাতিরেই উঠে দাঁড়াতে হয়! এর উপর আবার আছে প্রথম আলোর সেই এড! " আপনি বসুন এখানে", একটু ঝাঁঝ নিয়েই বললাম কথাটা! "ওহ আপনি! অনেক ধন্যবাদ!", উত্তর আসল এক ঝলক হাসির সাথে। উত্তরে মুখ বাঁকা করে হাসলাম শুধু! নীলক্ষেত থেকে মিরপুর -২ পর্যন্ত এখন আমাকে এভাবেই যেতে হবে, যদি না এই কন্যা নেমে না যান মাঝখানে কোথাও! যাই হোক, সিটটা ছেড়ে দিয়ে বেশ খানিকটা নায়কের ভাব নিয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম! "আপনি কোন ডিপার্টমেন্টের? কোন লেভেল? কোন হলে থাকেন?", একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমি নিজেও যে কখন মেয়েটাকে প্রশ্ন করতে শুরু করে দিয়েছি পাশের সিটে বসে তা টেরই পেলাম না! তবে এটা টের পেলাম মেয়েটার হাসিটা অসম্ভব সুন্দর!
র্যাগ ব্যাচের কনসার্টে হঠাৎ শুনলাম কেউ একজন আমার নাম ধরে চিৎকার করছে! অরনী! "কিরে , এই মেয়ে তোকে এমন পাগলের মত ডাকছে কেন! কাহিনী কি মামা! ", বন্ধুদের অনেক খোঁচা শুনতে শুনতেই ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। "কেমন আছেন? কনসার্ট আমার জঘন্য লাগছে। আপনি বের হবেন? চলেন যাই", এক নি;শ্বাসে কথা গুলো বলেই হাঁটা ধরল ও। আমি বলার সুযোগই পেলাম না, আর্টসেল এর গান আমার অসম্ভব ভালো লাগে! দুইজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে যখন ওর হলের সামনে এসে দাঁড়ালাম, আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, আমি নিজ থেকে ওর কাছে মোবাইল নম্বরটা চাইলাম!
সময় ঠিক যতটা ধীরে যায় বলে মনে হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক দ্রুতই চলে গেল তিনটা বছর। একবার ও পিছনে ফিরে তাকাবার অবসর পাইনি। হয়ত খুব বেশি ডুবে গিয়েছি আমি ওর মাঝে। কিন্তু গতকাল দুপুরে যখন অরনী জানালো, ওর বাসার দ্বিমতের কারনে আর সম্পর্কটা রাখতে চাচ্ছে না ও, তখন বহুকাল পরে যেন আমি সেই প্রথম ক্যাফের দিনটায় চলে গিয়েছিলাম। আমার অযোগ্যতা অস্ংখ্য। আমি এই অদ্ভুত শহরটার অদ্ভুত মানুষগুলোর কেউ নই, আমি মফস্বল থেকে উঠে আসা কেউ। এর সাথে জড়িয়ে থাকা পারস্পরিক অযোগ্যতা গুলো আজ আমাকে চিনতে শেখালো সময়কে। অরনী আর বেশি কিছু বলেনি। উঠে চলে গিয়েছিল চুপচাপ।
আর আজ দুপুরে আ্মি এখন বসে আছি মাথা নিচু করে চুপচাপ। হয়ত কখনো আমিও মিশে যাব, হয়ে যাব এই অদ্ভুত শহরের অদ্ভুত একজন। অপেক্ষা করছি, এর জন্য? না। মেয়ে তোমার জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১২ ভোর ৬:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



