somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এটি কোন সাহিত্য কথা নয়

১৯ শে মে, ২০১২ দুপুর ২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি নাহিদ জাহান লীনা, পরিচিত জন’রা আমাকে লীনা নামেই ডেকে থাকে। আমি একজন ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগী। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে আমার প্রথম ক্যান্সার ধরা পরে। তারপর, আমি আমার ডান পাশের ব্রেস্টটি ডাক্তারদের পরামর্শে কেটে ফেলে দিতে সম্মত হয়। কেননা, তখন আমার ছোট্ট আনার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর হয়ে তিন মাস। আমার মনে হয়েছে একটি ব্রেস্ট না থাকলে কি হয় মানুষের, কত মানুষ তো চোখে দেঁখতে পারেনা, কানে শুনতে পারেনা, হাটতে পারেনা, হাত দিয়ে কাজ করতে পারে না। কত নানা রকম অঙ্গহানী নিয়েও-তো মানুষ এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। যাই হোক কেটে ফেললে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশী থাকবে বলে, আমি সিদ্ধান্ত নিতে এক বিঁন্দুও কার্পণ্যতা বোঁধ করিনি। এরপর কেমোথেরাপির পালা, তাও সহ্য করার দৃঢ় মনোবল ছিল। এরপর রেডিওথেরাপি, সেটাও সফলতার সাথে সম্পন্ন করলাম। এবার এলো হরমোনাল থেরাপি, নিতে হবে পাঁচ বছর, প্রতিদিন একটি করে টেমোক্সোফেন ট্যাবলেট। কিন্তু কি আর করা কপাল মন্দ হলে যা হয় হরমোনাল থেরাপির মধ্যেই ২০১০ এর অক্টোবর মাসে ডান পায়ের হাড়ে “রাইট ফ্যিবুলা”-তে বেশ ছোট আকারে আবার ক্যান্সার ধরা পরলো, অল্পতেই সেখানে রেডিওথেরাপির মাধ্যমে স্বুস্থ হয়ে উঠলাম। তারপর ইন্ডিয়ার চেন্নাই এ্যাপোলো ক্যান্সার হাসপাতালে গেলাম চেকআপের জন্য। বিভিন্ন ধরনের টেস্টের পর আমার সেখানকার ডাক্তার শংকর শ্রিনিবাসান হরমোনাল থেরাপির ডোজ আরও বাড়িয়ে, প্রতি মাসে একটি জোলাডেক্স ইনজেকশান এবং একটি হাড় মবজুত করার জন্য জোমেটা ইনজেকশন প্রেসক্রাইব করলেন পাঁচ বছরের জন্য। শুরুও করে দিলাম ২০১১-এর জানুয়ারী থেকে। এটি চলাকালীন সময়ই আমার সার্জারির জায়গাতে বেশ ব্যাথা অনুভব করতে শুরু করি এবং চামড়ার উপরের অংশে গোটা উঠতে থাকে এবং সেগুলো থেকে রস নির্গত হতে শুরু করে। বেশ কাশি এবং খাবার খাওয়ার সময় গলাতে ব্যাথাও অনুভব করি। যাইহোক, বাংলাদেশের ডাক্তারদের নানা টেস্টের পর তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছে, আমার সার্জারির জায়গাতেই আবার ক্যান্সার ফিরে এসেছে এবং আবার কেমোথেরাপি শুরু করতে হবে।
এবার, আমি বেশ মুষরে পরলাম। মেনে নিতে পারালাম না আমার শরীরের ভিতর থাকা সেলগুলোর এই অস্বাভাবিক আচরণকে। এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রাথিমক পর্যায়ের ক্যান্সার সাধারণতঃ ফিরে আসে না এরকমই ধারণা দিয়েছিল আমার এখানকার ডাক্তাররা। আমিও জীবনটাকে আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। পলাশকে বলতাম, আমার শরীরে যদি আবার কখনও ক্যান্সার ফিরে আসে, তাহলে আমি আর কেমোথেরাপি নিবো না। কিন্তু, না, আনার মুখের দিকে তাকিয়ে এখানকার ডাক্তারদের পরামর্শে কেমোথেরাপি শুরু করে দিলাম। যদিও ইন্ডিয়ান ডাক্তার ই-মেইলে আমাকে কেমোথেরাপি শুরু করার আগে বায়োপসি করার কথা বলছিলেন। এখানে নিডেল বায়োপসি করাও হল, কিন্তু তাতে কোনো কিছু পাওয়া গেলো না।
ফলে, এখানকার ডাক্তারদের প্রতি কিছুটা আস্থার সংকট সত্ত্বেও কেমোথেরাপি শুরু করে চলে গেলাম চেন্নাই-এর তেনামপেট এলাকার এ্যাপোলো ক্যান্সার হাসপাতালে মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডাক্তার শংকর শ্রিনিবাসানের কাছে। তিনি কেমোথেরাপি বন্ধ না করেই বায়োপসির জন্য সার্জারির ডাক্তার মিস বাগিয়ামের কাছে রেফার করে দিলেন। ডাক্তার বাগিয়াম সেখানে আবার আমার চেস্টের সিটি স্ক্যান করালেন। এরপর তিনি আল্ট্রাসনো গাইডেড ট্রু-কাট বায়োপসি করলেন। মজার বিষয়টি তথা বেদনার দিকটা এখানেই, আমার প্রথমবারের বায়োপসির সাথে এবারের বায়োপসির কোন মিল নেই। তখন আমার ইআর ও পিআর ছিল পজেটিভ এবং হার২ ছিল নেগেটিভ। অথচ, এবার ইআর ও পিআর নেগেটিভ এবং হার২ পজেটিভ। হার২-র ফিস টেস্টেও পজেটিভ আসলো। পাল্টে গেলো আমার ক্যান্সারের ধরণ, শুরু হলো নতুন করে আবার চিকিৎসা। কেমোথেরাপি জেমসিটাবিন চললো ডে-১ ও ডে-৮ এবং এক সপ্তাহ বন্ধ- এভাবে ৬ সাইকেল, সাথে চললো হারসেপটিন মনোকোনাল এন্টিবডি ৬টি। প্রতি একুশ দিন পর পর ২ লাখ টাকার ধাঁক্কা এসে দাড়ালো জীবনের সন্ধীখণে।
তবে পাশে পেলাম অনেককেই, সকলের সহযোগিতা এবং অপরিসীম ভালোবাসায় চিকিৎসার ১৪ সাইকেল কেমোথেরাপি এবং ১৪ সাইকেল হারসেপটিন এন্টিবডি সম্পন্ন করেছি বেশ শারীরিক এবং মানসিক দৃঢ়তার সাথেই। সকলের এই অপরিসীম ভালবাসা আমি তো কখনই শোধ করতে পরবো না। তবে যতদিন বেঁচে আছি ততদিন ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য আমিও কিছু ক্ষুদ্র প্রয়াস রেখে যেতে চাই। আর আমার বুকের ধন ছোট্ট আনাকে দিয়ে যেতে চাই জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো। ওর বয়োঃসন্ধি কালটি পার করে রেখে যেতে পারলে মরে গিয়েও শান্তি পেতাম। কিছুটা মানুষের মত মানুষ বানিয়ে যেতে চাই। কিন্তু, আমার চিকিৎসা এই ১৪ সাইকেল হারসেপটিন ও ১৪ সাইকেল কেমোথেরাপিতে শেষ হলো না। চালিয়ে যেতে হবে দীর্ঘদিন, যতদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন, বললেন ডাক্তার। শুনালেন আশার কথা, ঔষধগুলো আমার শরীরে কাজ করছে, তাই এটা বন্ধ করা যাবে না।
এই পৃথিবীতে কোন কিছুই অবিনশ্বর নয়, সবাইকেই চলে যেতে হবে। কখনও আগে আর কখনও পরে, একথা আমাদের সকলেরই জানা। এও জানি কারও জন্য কোন কিছু থেমে থাকে না, সময়ের সাথে সাথে আনাও বড় হয়ে উঠবে। আপনারা আমাকে স্বার্থপর বলবেন কিনা, জানিনা। তবে হ্যা, আমার মিষ্টি মেয়েটার সাথে থাকতে বড়ই লোভ হয়। তার বেড়ে উঠার দিনগুলোতে পাশে থাকতে বড়ই সাধ জাগে। তাই, আপনাদের সকলের কাছে আকুল মিনতী রাখছি- এই মিনতী রাখতেও আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে, দ্বিধাবোধ হচ্ছে, তবুও রাখছি- “আর একটিবার আপনারা আমাকে আপনাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন”। আপনাদের বিন্দু বিন্দু সহমর্মিতাই হয়তো পারে আমাকে আবার জীবনের আশার আলো দেখাতে, আর আমার ছোট্ট আনা পেতে পারে মায়ের ভালোবাসা।
নাহিদ জাহান লীনা
আমাকে সাহায্য পাঠাবার ঠিকানা:
ষ্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক
একাউন্ট নাম: নাহিদ জাহান
একাউন্ট নম্বর: ১৮৩৪১১০৪৪০১
সুইফট কোড: SCBLBDDX

আমার মোবাইল নম্বর: +৮৮০১৯১৯৯৯৯১০১
পলাশের মোবাইল নম্বর: +৮৮০১৭১৩২২৯২০৭
আমার ই-মেইল: [email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০১২ দুপুর ২:২১
১৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশে কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায় না

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৩


সরকারি দলের দায়িত্বপ্রাপ্তরা যখন মিডিয়ার সামনে কথা বলেন, তখন তাদের কথায় দেশে কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের খবর পাওয়া যায় শুধু। কিন্তু যখন সমাজের কাছে যাওয়া হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে বাংলাদেশ

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১৬

দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে বাংলাদেশ। ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং মালদ্বীপের মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজয় দিবস, সংবিধান, পহেলা বৈশাখ, পান্তা-মাছ কিছুই ভালো লাগে না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪১


ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠলেন আর সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনার চারপাশের সবকিছুই ভুল। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভুল, রান্নাঘরের খাবার ভুল, দেশের সংবিধান ভুল, এমনকি বাইরে যে ঝড়ো হাওয়া বইছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরীক্ষায় নকল ও বাস্তবতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:১৬



শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সাহেবের বক্তব্য পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের বিষয়টি গত কিছুদিন যাবত সোশ্যাল মিডিয়াতে খুব আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সামহো্য়্যারইন ব্লগেও সমালোচনা হয়েছে! বাংলাদেশে স্কুল কলেজ পরীক্ষা সহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছেগুলো

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৩৩

ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে যাক।
তোমায় পাওয়ার ইচ্ছে আমার অনিচ্ছেতে থাক।
ইচ্ছেরা সব ছুটি নিয়ে যাক না বহু দূরে।
অনিচ্ছেরা কাছে এলে হতেম ভবঘুরে।
মনের যত গোপন কথা মনের মাঝেই থাক।
ইচ্ছেগুলো অনিচ্ছেতে হঠাৎ বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×