২.
অতিথিরা পৌছালেন তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট হোটেলে। বিলাস বহুল স্যুইট দেখে একেজনের চক্ষু চড়কগাছ। এমন নয় যে তাঁরা আগে দেখেননি বা ব্যবহার করেননি। এমন একটি দেশের ক্ষেত্রে বেশিই মনে হচ্ছে। অবাক হওয়ারই বিষয় । তবে খাতির যত্নের যে ত্রুটি হবেনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। ত্রুটি হওয়ার কথাও না।
বিকেলে দেশের জাতীয় স্টেডিয়ামে অতিথিদের আগমন উপলে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। ঘন্টা দুয়েক বিশ্রামের পর তাঁদের নিয়ে যাওয়া হল সেখানে । আবার একগাড়িতে। ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছেন একেকজন। এবারেও উপহার পেলেন মিস্টি হাসি।
বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের ‘বর্ণাঢ্য’ শব্দটির মর্যাদা পুরো মাত্রায় রাখা হলো। অতিথিরা উপভোগ করলেন খুব।অনুষ্ঠান শেষ হলো রাত নটায়। এবারে তাঁদের অবাক করে দিয়ে আলাদা আলাদা গাড়িতে নেয়া হলো নৈশ ভোজের স্থানে। অতিথিরা বিভ্রান্ত বোধ করলেন। তার সাথে যুক্ত হলো কিছুটা ভয়। ঘটনা বোঝতে না পারার কারণে।
খাবারের ঘরটা বিশাল। নানারকম আসবাবপত্রে ঢাকা পড়ে গেছে চারদিকের দেয়াল। অতিথিরা আসবাবপত্রের নিখুঁত কারুকার্যের প্রশংসা করতে করতে এগিয়ে গেলেন খাবার টেবিলের দিকে। সবার চেয়ারই যার যার দেশের পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা। সশ্রদ্ধায় তাঁদের বসানো হল। সবাই বসে পড়লে মেজবান একটু কেশে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন,‘প্রথমেই সম্মানিত অতিথি মহান প্রেসিডেন্টদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এই গরীব দেশের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার জন্যে। এখানে আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। আমাদের যতটুকু সাধ্য আমরা আপনাদের সেবায় প্রয়োগ করছি। ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, এই আশা রাখি।’ উনি থামতেই পৃথিবীর পাঁচনম্বর দেশের প্রেসিডেন্ট স্বভাব সুলভ অমায়িক ভঙ্গিতে বললেন,‘ না না। কিযে বলেন মি. প্রেসিডেন্ট? আপনাদের আতিথেওতায় আমরা মুগ্ধ।’ অন্যরাও সায় জানালেন তাঁর সাথে।
দুই নম্বর দেশের প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘যদিও কিছু কিছু ব্যাপার একটু রহস্যময়।’
পৃথিবীর একনম্বর দেশের প্রেসিডেন্ট তাঁর পুরোনো বদ অভ্যাস ছাড়তে পারলেন না। দুই নম্বর দেশের প্রেসিডেন্টের নাম ধরে বলে উঠলেন,‘‘টনি ঠিকই বলেছে। হা হা হা।’’
এমন ধারা কথা শুনে থমকে গেলেন সবাই। পরিবেশ হালকা করতে হেসে উঠলেন মেজবান। ‘আপনি মি. প্রেসিডেন্ট, বেশ রসিকতা করতে পারেন। হা হা হা।’ তাঁর সাথে বাকীরাও হেসে উঠলেন। উচ্চস্বরে ভদ্র কিন্তু শীতল হাসি।
‘এবার সম্মানিত অতিথিবৃন্দ অনুমতি দিলে খাবার পর্ব শুরু করতে পারি।’ সবার নীরবতাকে অনুমতি ধরে খাবার আনার ঈঙ্গিত দিলেন মেজবান। গোল গোল ঢাকনা দিয়ে ঢাকা ডিশগুলো টেবিলে রাখা হলে তিনি উঠে দাড়ালেন। ‘ক্ষমা করবেন সম্মানিত অতিথিবৃন্দ। দুটো কথা বলে নিতে চাই। অতিথিরা তাঁর দিকে তাকালেন কিন্তু কেউই লক্ষ্য করলেন না মুখে হাসি হাসি ভাব থাকলেও চোখের দৃষ্টি ক্রমশঃ কঠিন হচ্ছে। আবার শুরু করলেন, ‘মানে একটু ভদ্র রসিকতা।’ মুচকি হাসলেন। ‘মানে বলতে চাইছিলাম আপনাদের জন্য খাবারগুলো অবশ্যই বিশেষভাবে তৈরি। আমি নিশ্চিত ঢাকনাগুলো সড়ালেই আপনারা কোন না কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেনই।’ অতিথিরা এবার কৌতুহল বোধ করলেন। ‘ তাই আমি একটি শর্ত রাখতে রাখতে চাই, যদি আপনারা কিছু মনে না করেন।’ অতিথিরা মুচকি হেসে আরো বলার ঈঙ্গিত দিলেন। ‘শর্তটা হলো খাবার যেমনই হোক আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগে সন্মানিত অতিথিদের কেউ কোন প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন না। প্রতিক্রিয়া দেখালেই গুণতে হবে আমাদের দেশের দুই বছরের জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ।’ বলে সবার দিকে হাসি মুখে তাকালেন।
কথা বলে উঠলেন পৃথিবীর একনম্বর দেশের প্রেসিডেন্ট। ‘মি. প্রেসিডেন্ট আপনার শর্ত্টা যদিও সিরিয়াস গোছের কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং। আপনি নিশ্চই অবগত আছেন আমি চ্যালেঞ্জ ভালবাসি? আমি রাজি। আপনারা কি বলেন?’ বাকী সবাইকে বললেন।
ব্যাপরটা যেহেতু চ্যালেঞ্জের পর্যায়ে চলে গেছে, অন্য সবাইও শুধু অহমিকার কারণে রাজি হয়ে গেলেন। বেশ অস্বস্থির সাথে।
মেজবান মুচকি হেসে বেয়ারাকে ঈঙ্গিত দিলেন ঢাকনা সড়ানোর। তার চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোতে লাগলো। 'এটা হচ্ছে সম্মানিত অতিথিবৃন্দ পৃথিবীর তাবৎ গরীব মানুষের মাংসের কাবাব।’ অতিথিরা ‘থ’ বনে গেলেন। আরেকটা ঢাকনা সড়ানো হলো। 'এটা হচেছ ক্ষত-বিক্ষত সত্য ধর্মের রেজালা।’ তারপর আরো। 'এটা হচ্ছে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া জারজ শিশুর গলিত মাংস। ওটা খনিজ তেলের স্যুপ সম্মানিত অতিথিবৃন্দ। এটা পুরুষের অন্ধ চোখ। আর এটা হচ্ছে আমাদের নারীদের নারীত্ব!’
সারাটি ঘর ভরে উঠলো পঁচা গলা দুর্গন্ধে। অতিথিরা নাক চাপা দিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বমি করতে লাগলেন।
পৃথিবীর এক নাম্বার দেশের প্রেসিডেন্টই সবার আগে বলে উঠলেন, ‘হচ্ছে কী এসব? হচ্ছে কী এসব?’
একটি প্রতিবাদী গল্প ছিল।জন্মকাল ১৮/০৭/২০০৮।
_____________________________________________
*প্রাকৃত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



