ভূমিকা
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য এবং পৃথিবীতে তাঁর বিধান কায়েম করার জন্য। এ লক্ষ্যে মানবতার সঠিক পথের দিশারী হিসাবে এক লক্ষ চবিবশ হাযার নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন {আহমাদ, ত্বাবারানী, মিশকাত হা/৫৭৩৭}। তাঁরা যুগে যুগে মানুষকে সত্য-সুন্দরের পথ, কল্যাণের পথ, হেদায়াতের পথ প্রদর্শন করেছেন। সে পথে মানুষকে পরিচালনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু মানুষ শয়তানের প্ররোচনায় ও তার কুমন্ত্রণায় হক্বের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। কখনোবা এ পথে মানুষ যাতে আসতে না পারে সেজন্য বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে ঐসব মানুষও শয়তানের ন্যায় অভিশপ্ত হয়েছে, জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামের কীটে পরিণত হয়েছে। আলোচ্য নিবন্ধে হক্বের পথে, আল্লাহর পথে তথা দ্বীনের পথে বাধা দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
দ্বীনী কাজে বাধা প্রদানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করে জ্বিন-ফিরিশতা সবাইকে নির্দেশ দেন আদমকে সিজদা করার জন্য। সবাই নির্দেশ মেনে আদমকে সিজদা করলেও ইবলীস অহংকারবশতঃ আল্লাহর নির্দেশকে অমান্য করে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয় {দেখুন সূরা আল বাক্বারা, আয়াত ৩৪}। আদমের কারণে যেহেতু ইবলীসের উচ্চ মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়, সেজন্য সে আদম ও তাঁর সন্তানদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে পড়ে। সে মানুষের চিরশত্রুতে পরিণত হয়। শুরু হয় তার চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র ও মানুষকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা। সে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মানুষকে কুফরী করতে প্ররোচিত করে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ কুফরীতে লিপ্ত হলে সে বলে, ‘আমার সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি (নিজে) সৃষ্টিলোকের মালিক আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করি।’ {সূরা আল হাশর, আয়াত ১৬}।
ইবলীসের এই ধোঁকা দান শুরু হয় প্রথম মানব আদম (আঃ)-এর সময় থেকে। আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করে বললেন, ‘তুমি এবং তোমার স্ত্রী (পরম সুখে) এই বেহেশতে বসবাস করতে থাকো এবং এ (নেয়ামত) থেকে যা তোমাদের মন চায় তাই তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে আহার করো, তবে তোমরা এ গাছটির পাশেও যেও না, তা (না) হলে তোমরা (দুজনই) সীমালংঘনকারীদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে’ {সূরা আল বাক্বারা, আয়াত ৩৫}। কিন্তু ইবলীস আদম ও হাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতারণার ফাঁদ পাতলো। সে প্রথমে তাদের স্বজনে পরিণত হল। নানা কথায় সুকৌশলে তাদের প্ররোচিত করতে লাগল ঐ নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার জন্য। এক পর্যায়ে সে বলল, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে ঐ গাছটির নিকটে যেতে নিষেধ করেছেন এজন্য যে, তোমরা তাহলে ফেরেশতা হয়ে যাবে কিংবা তোমরা এখানকার চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে। এরপর সে শপথ করে বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাংখী’। এভাবে সে আদম ও হাওয়াকে রাযী করে। তার প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে তাঁরা উভয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তাঁরা গাছের পাতা দ্বারা লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের একথা বলে দেইনি যে, শয়তান হচ্ছে তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য দুশমন? তখন তাঁরা অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে {দেখুন সূরা আর আ‘রাফ, আয়াত ২০-২২}। এভাবে শয়তান প্রথম মানব-মানবী আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত করে এবং আল্লাহর নির্দেশ পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
আদম (আঃ)-এর এক হাযার বছর পরে পৃথিবীতে আগমন করেন নূহ (আঃ)। আদম (আঃ)-এর সময় শিরক ছিল না। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানব সমাজে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ে ওয়াদ, সু‘আ, ইয়াগূছ, ইয়াউক্ব ও নাসর নামক পাঁচজন সৎকর্মশীল লোক ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর সে সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের অসীলায় পরকালে মুক্তির আশায় তাদের পূজা আরম্ভ করে। সে সময়ে শয়তান ঐ সম্প্রদায়ের লোকদের এ বলে প্ররোচনা দেয় যে, এসব সৎকর্মশীল মানুষের মূর্তি বা প্রতিকৃতি সামনে থাকলে, তাদের দেখে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে অধিক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। ফলে লোকেরা তাদের মূর্তি তৈরী করে। এরপর ঐসকল লোকদের মৃত্যুর পরে তাদের পরবর্তীরা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ঐ মূর্তিগুলোকে সরাসরি পূজা করতে আরম্ভ করে। এসব মূর্তির অসীলায় তারা বৃষ্টি প্রার্থনা করত {ইবনু কাছীর, সূরা নূহ দ্রঃ; বুখারী, ‘তাফসীর’ অধ্যায়, হা/৪৯২০}। এভাবে পৃথিবীতে মূর্তিপূজা শুরু হয়। শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহর উপাসনার স্থলে মূর্তি পূজা জায়গা দখল করে নেয়।
কওমে মূসা তথা বনী ইসরাঈল শয়তানের প্ররোচনায় গো-বৎসের পূজা আরম্ভ করেছিল। মূলতঃ তারা শয়তানের কারণে আল্লাহর দ্বীনের কাজ পরিহার করে শয়তানী কাজ শুরু করে। এ সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ এরূপ- আল্লাহ পাক যখন মূসা (আঃ)-কে ওয়াদা দিলেন যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে নিয়ে তূর পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে চলে এস, আমি তোমাকে তাওরাত দান করব। যা তোমার ও তোমার সম্প্রদায়ের জন্য কর্মপন্থা নির্দেশ করবে। তখন তিনি বনী ইসরাঈলকে নিয়ে তূর পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। আর তিনি হারূণ (আঃ)-এর নেতৃত্বে তার সম্প্রদায়কে পশ্চাতে আসার নির্দেশ দিয়ে নিজে সাগ্রহে আগে চলে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে ৪০ দিন অবস্থান করলেন। তিনি ভাবলেন যে, তাঁর কওম নিশ্চয়ই তাঁর পিছে পিছে তূর পাহাড়ের সন্নিকটে এসে শিবির স্থাপন করেছে। কিন্তু তাঁর ধারণা সঠিক ছিল না।
আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মূসা! কোন জিনিস তোমার জাতির লোকদের কাছ থেকে (এখানে আসার জন্যে) তোমাকে তাড়াতাড়ি করালো! (মূসা আ. বললো, না) তারা তো আমার পেছনেই রয়েছে, আমি তোমার কাছে আসতে তাড়াতাড়ি করলাম যাতে করে হে মালিক, তুমি আমার ওপর সন্তষ্ট হও, তিনি (আল্লাহ) বললেন, তোমার (চলে আসার) পর আমি তোমার জাতিকে (আরেক) পরীক্ষায় ফেলেছি, সামেরী (নামের এক ব্যক্তি) তাদের গোমরাহ করে দিয়েছিলো।’ {সূরা ত্বোয়াহা, আয়াত ৮৩-৮৫}।
একথা জেনে মূসা (আঃ) আশ্চর্য হলেন। দুঃখে ও ক্ষোভে অস্থির হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর মূসা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার জাতির কাছে ফিরে এলো, (এসে তাদের) সে বললো, হে আমার জাতি (এ তোমরা কি করলে), তোমাদের মালিক কি তোমাদের একটি উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি (যে, তোমাদের তিনি এ যমীনের কর্তৃত্ব সমর্পন করবেন), তবে কি আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি(র সময়)টি তোমাদের কাছে খুব দীর্ঘ মনে হয়েছিলো (তোমরা আর অপেক্ষা করতে পারলে না), কিংবা তোমরা এটাই চেয়েছো, তোমাদের ওপর তোমাদের মালিকের গযব অবধারিত হয়ে পড়ুক, অতঃপর তোমরা আমার ওয়াদা ভংগ করে ফেললে! তারা বললো (হে মূসা), আমরা তোমার প্রতিশ্রুতি নিজেদের ইচ্ছায় ভংগ করিনি (আসলে যা ঘটেছে তা ছিলো), জাতির (মানুষদের) অলংকারপত্রের বোঝা আমাদের ওপর চাপানো হয়েছিলো, আমরা তা (বইতে না পেরে আগুনে) নিক্ষেপ করে দেই (এ ছিলো আমাদের অপরাধ), এভাবেই সামেরী (আমাদের প্রতারণার জালে) নিক্ষেপ করলো; তারপর সে (অলংকার দিয়ে) তাদের জন্যে একটি বাছুর বের করে আনলো, (মূলত) তার (ছিলো) একটি (নিষ্প্রাণ) অবয়ব, তাতে গরুর (মতো) শব্দ ছিলো (মাত্র), তারা (এটুকু দেখেই) বলতে লাগলো, এ হচ্ছে তোমাদের মাবুদ, (এটি) মূসারও মাবুদ, কিন্তু মূসা (এর কথা) ভুলে (আরেক মাবুদের সন্ধানে তূর পাহাড়ে চলে) গেছে।’ {সূরা ত্বোয়াহা, আয়াত ৮৬-৮৮}।
আসল ঘটনা এই ছিল যে, মিসর থেকে বিদায়ের দিন যাতে ফেরাঊনীরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন না করে এবং তারা কোনরূপ সন্দেহ না করে, সেজন্য (মূসার অলক্ষ্যে) বনু ইসরাঈল প্রতিবেশী ক্বিবতীদের কাছ থেকে অলংকারাদি ধার নেয় এই বলে যে, আমরা সবাই ঈদ উৎসব পালনের জন্য যাচ্ছি। দু’একদিনের মধ্যে ফিরে এসেই তোমাদের সব অলংকার ফেরৎ দিব। কিন্তু সাগর পার হওয়ার পর যখন আর ফিরে যাওয়া হল না, তখন কুটবুদ্ধি সম্পন্ন মুনাফিক সামেরী মনে মনে এক ফন্দি আটল যে, এর দ্বারা সে বনু ইসরাঈলকে পথভ্রষ্ট করবে। ফলে মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে হারূণের দায়িত্বে রেখে তিনি আগেভাগে তূর পাহাড়ে চলে গেলে সামেরী সুযোগ বুঝে তার ফন্দি কাজে লাগায়। সাগর ডুবি থেকে নাজাত লাভের সময় চতুর সামেরী জিব্রীলের অবতরণ ও তাঁর ঘোড়ার প্রতি লক্ষ্য করে দেখল যে, জিব্রীলের ঘোড়ার পা যে মাটিতে পড়ছে, সে স্থানের মাটি সজীব হয়ে উঠছে ও তাতে জীবনের স্পন্দন জেগে উঠছে। তাই সবার অলক্ষ্যে এ পদচিহ্নের এক মুঠো মাটি সে তুলে সযতনে রেখে দেয়।
মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে চলে যাবার পর সে লোকদের বলে, তোমরা ফেরাঊনীদের যেসব অলংকারাদি নিয়ে এসেছ এবং তা ফেরত দিতে পারছ না, সেগুলি ভোগ-ব্যবহার করা তোমাদের জন্য বৈধ হবে না। তাই সেগুলি একটি গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দাও। কথাটি হারূণ (আঃ)-এরও কর্ণগোচর হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীছ থেকে জানা যায় যে, হারূণ (আঃ) সব অলংকার একটি গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন, যাতে সেগুলি একটি অবয়বে পরিণত হয় এবং মূসা (আঃ)-এর ফিরে আসার পর এ সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণ করা যায়। হারূণ (আঃ)-এর নির্দেশ মতে সবার অলংকার গর্তে নিক্ষেপ করার সময় সামেরীও হাতের মুঠি বন্ধ করে সেখানে পৌঁছল। সে হারূণ (আঃ)-কে বলল, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হৌক- এই মর্মে আপনি দো‘আ করলে আমি নিক্ষেপ করব অন্যথা করব না। হারূণ তার কপটতা বুঝতে না পেরে সরল মনে দো‘আ করলেন। আসলে তার মুঠিতে ছিল জিব্রীলের ঘোড়ার পায়ের সেই অলৌকিক মাটি। ফলে উক্ত মাটির প্রতিক্রিয়ায় হোক কিংবা হারূণের দো‘আর ফলে হোক সামেরীর উক্ত মাটি নিক্ষেপের পরপরই গলিত অলংকারাদির অবয়বটি একটি গো-বৎসের রূপ ধারণ করে হাম্বা হাম্বা রব করতে শুরু করে। মুনাফিক সামেরী ও তার সঙ্গী-সাথীরা এতে উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, এটাই হল তোমাদের উপাস্য ও মূসার উপাস্য। যা সে পরে ভুলে গেছে’ {দেখুন সূরা ত্বোয়াহা, ৮৮}।
অপরদিকে মূসা (আঃ)-এর তূর পাহাড়ে গমনকে সে অপব্যাখ্যা করে বলল, মূসা বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে কোথাও চলে গেছে। এখন তোমরা সবাই এ গো-বৎসের পূজা কর। কিছু লোক তার অনুসরণ করল। ফলে মূসা (আঃ)-এর পিছে পিছে তূর পাহাড়ে গমনের প্রক্রিয়া পথিমধ্যেই বানচাল হয়ে যায়।
অতঃপর মূসা (আঃ) এসে সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সব কথা শুনলেন। হারূণ (আঃ) তাঁর বক্তব্য পেশ করলেন। সামেরীও তার কপটতার কথা অকপটে স্বীকার করল। এরপর মূসা (আঃ) আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী শাস্তি ঘোষণা করলেন। মূসা (আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন {দেখুন সূরা বাক্বারা, আয়াত ৫৪}। এতে তাদের কিছু লোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।
সম্প্রদায়ের লোকদের শাস্তি দানের পর মূসা (আঃ) এবার সামেরীকে ঘটনা জিজ্ঞেস করলেন। সামেরী আনুপূর্বিক ঘটনা বর্ণনা করল। এরপর বলল, আমার মন এটা করতে প্ররোচিত করেছিল। অর্থাৎ কারো পরামর্শে নয়; বরং নিজস্ব চিন্তায় ও শয়তানী কুমন্ত্রণায় আমি একাজ করেছি। মূসা বললেন, তোমার জন্য সারা জীবন এই শাস্তিই রইল যে, তুমি বলবে, আমাকে কেউ স্পর্শ করো না এবং তোমার জন্য আখেরাতে একটা নির্দিষ্ট ওয়াদা রয়েছে, যার ব্যতিক্রম হবে না। সেটা হল জাহান্নাম। এক্ষণে তুমি তোমার সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ্য করো, যাকে তুমি সর্বদা পূজা দিয়ে ঘিরে থাকতে। আর আমরা ঐ কৃত্রিম গো-বৎসটাকে অবশ্যই জ্বালিয়ে দেব এবং অবশ্যই ওকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে ছিটিয়ে দেব {দেখুন সূরা ত্বোয়াহা, আয়াত ৯৫-৯৭}। এভাবে বনী ইসরাঈল শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছিল।
কেবল পূর্ববর্তী উম্মতের ক্ষেত্রেই নয়; বরং ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেও শয়তানের ঐ প্ররোচনা অব্যাহত আছে। বদর যুদ্ধের সময় ইবলীস সুরাকা বিন মালেক বিন জুশুম মুদলিজীর আকৃতিতে এসে মুশরিকদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্ররোচিত করেছিল এবং সে মুশরিকদের সাথেই ছিল। কিন্তু যখন সে মুশরিকদের বিরুদ্ধে ফিরিশতাদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করল, তখন সে পিছনে ফিরে পলায়ন করতে থাকল। এ সময় হারেছ বিন হিশাম তাকে আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। তখন ইবলীস তার বুকে সজোরে ঘুষি মারলে হারেছ মাটিতে পড়ে যায় এবং এই সুযোগে ইবলীস পলায়ন করে। মুশরিকরা তখন বলতে লাগল যে, সুরাকা কোথায় যাচ্ছ? তুমি কি বলনি যে, তুমি আমাদের সাহায্য করবে এবং কখনই আমাদের থেকে পৃথক হবে না? সে বলল, ‘আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাও না, আমি অবশ্যই আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করি এবং (আমি জানি) আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন কঠোর শাস্তিদাতা।’ {সূরা আল আনফাল, আয়াত ৪৮}। এরপর শয়তান পলায়ন করে সমুদ্রের ভিতরে চলে যেতে থাকে {আর-রহীকুল মাখতূম, অনুবাদ: আবদুল খালেক রহমানী ও মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ (ঢাকা : তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ২০০৯), পৃঃ ২৫৮}।
এভাবে শয়তানী কারসাজিতে যুগে যুগে মানুষ আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছে। আদ, ছামূদ, কওমে লূত্ব, আহলে মাদইয়ান প্রভৃতি গোত্র আল্লাহদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন এবং বিভিন্ন গযব দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। এ পৃথিবীতে নমরূদ, ফিরাউন, কারূণ, হামান, শাদ্দাদ, আবরাহা, আবু জাহল প্রভৃতি প্রতাপশালী মুশরিক রাজা-বাদশাহ ও নেতৃবৃন্দ আল্লাহদ্রোহী কাজ করেছে, আবার মানুষকে সে কাজে উৎসাহিত-উদ্বুদ্ধ করেছে। কখনো তাদেরকে আল্লাহবিরোধী কাজে বাধ্য করেছে। কিন্তু তাদের কারো পরিণতি শুভ হয়নি। সবাইকে আল্লাহ ধবংস করে দিয়েছেন। আর তাদের ইতিবৃত্ত পরবর্তীদের জন্য উপদেশ হিসাবে রেখে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না বলেই এ যুগেও সুনামি, ক্যাটরিনা, সিডর, নার্গিস, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয় দিয়ে আল্লাহ পৃথিবীর মানুষকে সতর্ক-সাবধান করেন। তবে মানুষ খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে। বিপদ-আপদ দূর হয়ে গেলেই তারা আবার অভ্যাসবশতঃ পূর্বের কাজে ফিরে যায়। আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টিকে সৎপথে, তাঁর মনোনীত দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছেন। তদুপরি যারা আল্লাহর উপদেশ না মেনে তাঁর অবাধ্য হবে এবং তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে পবিত্র কুরআনে। এ পর্যায়ে বাধা দান সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত হুঁশিয়ারী ও হক্বের পথে বাধা দানের পরিণতি সম্পর্কিত আগামী দুই পর্বে আলোচনা উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।
ইনশাল্লাহ চলবে ...
রচনাঃ ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


