ভূমিকা :
মানুষ মাত্রই তার সম্পদ বৃদ্ধি করতে চায়। সম্পদ বাড়ানোর জন্য কৃষি, চাকুরী, চিকিৎসা সহ মানুষ বিভিন্ন কাজ করে। এজন্যে তারা পরিবার ছেড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে থাকে। সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সরকার, মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন এনজিও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা দিয়ে থাকে। এ পরিকল্পনা সমূহের মৌলিক দর্শন হ’ল কাজ করা। কাজ করলেই সম্পদ বাড়বে। ইসলাম এ দর্শনকে অস্বীকার করে না। তবে ইসলাম এর সাথে আরো কিছু অভ্যন্তরীণ উপায় সংযুক্ত করে। যথা- ১. তাক্বওয়া অবলম্বন করা ২. আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া ৩. তওবা করা ৪. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা করা ৫. যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করা ৬. করযে হাসানা প্রদান করা ৭. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা ৮. দান করা ৯. আল্লাহর জন্যে হিজরত করা ১০. বিবাহ করা ১২. সম্পদ বৃদ্ধির দো‘আ করা ১৩. হজ্জ ও ওমরা সম্পাদন করা ১৪. দ্বীনী ইলম শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা প্রভৃতি। এগুলো অভ্যন্তরীণ এজন্য যে, এগুলো দ্বারা সরাসরি সম্পদ বাড়ে না। এসব সম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক কার্যকরণ। এসবের উপর ভিত্তি করে আল্লাহ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে সমৃদ্ধি দিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে এ সবের অভাবে আল্লাহ সম্পদ কমিয়ে দেন এবং কখনো শাস্তি প্রদান করেন। আর কাজের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির বিধান ইসলামে লাগামহীন নয়। বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহর বৈধ সীমায় থেকে কাজ করলে আল্লাহ সম্পদ বৃদ্ধি করবেন। বৈধ পন্থায় নবী ও রাসূলগণ কাজ করতেন। ব্যক্তি, পরিবার ও জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধির জন্য হালাল পন্থায় কাজ করার কোন বিকল্প নেই।
সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে :
সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি মানুষের হাতে নয়; বরং তা আল্লাহর হাতে। এজন্য দেখা যায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও অনেকে সাবলম্বী হ’তে পারে না। পক্ষান্তরে স্বল্প পরিশ্রমে আল্লাহর অনুগ্রহে অনেকেই অল্প সময়ে সচ্ছল হয়, স্বাবলম্বী হয়।
আল্লাহ বলেন,
‘এরা কি তোমাদের প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বণ্টন করি পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের ওপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে এবং তারা যা জমা করে তা হ’তে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতর’ {যুখরুফ, ৪৩/৩২}।
আল্লাহ আরো বলেন,
‘আল্লাহ জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন; যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্ত দাস-দাসীদেরকে নিজেদের জীবনোপকরণ হ’তে এমন কিছু দেয় না, যাতে তারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায়। তবে কি তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে’ {নাহল, ১৬/৭১}।
তিনি আরো বলেন,
‘তুমি রাত্রিকে দিবসে পরিণত কর এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত কর এবং মৃত হ’তে জীবিতকে নির্গত কর এবং জীবিত হ’তে মৃতকে বহির্গত কর এবং তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করে থাক’ {আলে ইমরান ৩/২৭}।
সম্পদ বৃদ্ধির মৌলিক পথ :
ইসলামে সম্পদ বৃদ্ধির মৌলিক পথ ১টি। আর তাহ’ল- হালাল পথ। আল্লাহ বলেন,
‘হে মুহাম্মাদ! তুমি জিজ্ঞেস কর যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্যে যেসব শোভনীয় বস্ত্ত ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে? তুমি ঘোষণা করে দাও এসব বস্ত্ত পার্থিব জীবনে, বিশেষ করে ক্বিয়ামতের দিনে ঐসব লোকের জন্য যারা মুমিন হবে, এমনিভাবে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নির্দশনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করে থাকি’ {আ‘রাফ ৭/৩২}।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছি এবং যাদের আমি সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি’ {বনী ইসরাঈল ১৭/৭০}।
আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! আমি তোমাদেরকে যা জীবিকা স্বরূপ দান করেছি সেই পবিত্র বস্ত্তসমূহ ভক্ষণ কর এবং আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা তাঁরই উপাসনা করে থাক’ {বাক্বারাহ ২/১৭২}।
সম্পদ বৃদ্ধির কতিপয় উপায় :
হালাল পথে সম্পদ বৃদ্ধির বহু উপায় ইসলামে রয়েছে। নিম্নে কতিপয় উপায় প্রদত্ত হ’ল :
১. তাক্বওয়া অবলম্বন করা :
তাক্বওয়া ইসলামী শরী‘আতের একটি পরিচিত শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, ভয় করা।*১* ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় তাক্বওয়া অর্থ হ’ল আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে নিষিদ্ধ বস্ত্ত সমূহ হ’তে দূরে থেকে ইসলাম নির্ধারিত পথে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা। অথবা যে কাজ করার কারণে মানুষকে আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হ’তে হবে, তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা হচ্ছে তাক্বওয়া। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত করুণা, ভালবাসা, দয়া ও অনুগ্রহ হারানোর ভয় অন্তরে সদা জাগ্রত থাকার নাম তাক্বওয়া।*২*
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার উবাই ইবনু কা‘ব (রা.)-কে বললেন, আপনি তাক্বওয়া সম্পর্কে আমাকে বলুন। জবাবে তিনি বললেন, আপনি কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ পথ দিয়ে চলেছেন? ওমর (রা.) বললেন, হ্যাঁ। কা‘ব (রা.) বললেন, সেখানে আপনি কিভাবে চলেছেন? ওমর (রা.) বললেন, কাপড়-চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। কা‘ব (রা.) বললেন, ওটাই তো তাক্বওয়া।*৩*
ইসলামের সার্বভৌম অধিকার সংরক্ষণের নিমিত্তে যাবতীয় হারাম কার্যাবলী থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রেখে হালাল পন্থায় যে জীবিকা নির্বাহ করতে ইসলাম নির্দেশ দেয় এমন তাক্বওয়ার দীপ্ত সজীবতায় বদ্ধমূল মানবগোষ্ঠীকে আল্লাহ স্বীয় মহিমায় সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন।
আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দিবেন। আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস হ’তে রিযক দান করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই, আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা’ {তালাক্ব ৬৫/২-৩}।
আল্লামা কাযী আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক আন্দালুসী (মৃঃ ৫৪৬) এ বিষয়ে বলেন, আল্লাহ তাক্বওয়া অবলম্বনকারীর দুনিয়া ও আখিরাতের বিপদ সমূহ দূরীভূত করেন।*৪* এতে কোন সন্দেহ নেই যে, অভাব দুনিয়ার অন্যতম বিপদ, যা আল্লাহ তাক্বওয়ার মাধ্যমে মোচন করেন। আল্লাহ বলেন,
‘জনপদের অধিবাসীগণ যদি ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্যে আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দ্বার খুলে দিতাম। কিন্তু তারা নবী রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম’ {আ‘রাফ৭/৯৬}।
ইনশাআল্লাহ চলবে ...
রচনাঃ
মুহাম্মাদ আবু তাহের
এম. ফিল. গবেষক,
আল-হাদীছ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
টিকাঃ
*১*. কাযী নাছিরুদ্দীন আল-বায়যাবী, আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তাবীল (দেওবন্দ : আল-মাকতাবাতুল আসাফিয়াহ, তা.বি.), পৃঃ ১৬; ইমাম মুহাম্মদ বিন আবু বাকর আর-রাযী, মুখতারুস সিহাহ (বৈরুত : মাকতাবু লিবানন, ১৯৮৯ খৃষ্টাব্দ), পৃঃ ৬৪৭; ড. ইবরাহীম মাদকূর, আল-মু‘জামুল ওয়াসীত (দেওবন্দ: কুতুবখানা হুসাইনিয়াহ, তা.বি.), পৃঃ ১০৫২।
*২*. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১২শ খন্ড (ঢাকা : ইফাবা ১৯৯২), পৃঃ ১০৭।
*৩*. আলাউদ্দীন আলী বিন মুহাম্মদ আলী বাগদাদী, লুবাতুত তাবীল ফী মা‘আনিত তানযীল, ১ম খন্ড (বৈরুত : দারুল ফিকর, ১৯৭৯ খৃ.), পৃঃ ২৮।
*৪*. ঐ, আল-মুহাররারুল ওয়াজীয ফী তাফসীরিল কিতাবিল আযীয (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্যাহ, ১৯৯৩), ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩২৪।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

