সত্য অর্থ খাঁটি, সঠিক, নির্ভুল, বাস্তব, যথার্থ, প্রকৃত, আসল ইত্যাদি। অপরদিকে মিথ্যা অর্থ অসত্য, ভুল, অবাস্তব, অযথার্থ, অমুলক, কল্পিত, নিষ্ফল, অনর্থক ইত্যাদি। অর্থাৎ সত্যের বিপরীত রূপ হ’ল মিথ্যা। সুতরাং সত্য ও মিথ্যার কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন বা পৃথক এবং এ দু’টি বিপরীতধর্মী বিষয়। আবার এ দু’টির সংমিশ্রণ বা সংযোজন বিশুদ্ধ কোন কিছুর উদ্ভব করতে সক্ষম নয়। তাই ইসলামে সত্য ও মিথ্যার সংমিশ্রণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
এ নশ্বর জগতে জীবন যাপনে সত্য-মিথ্যার ন্যায় আরও বহু বিপরীতধর্মী বিষয় বিদ্যমান, তন্মধ্যে কয়েকটি হ’ল, ধর্ম-অধর্ম, ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, সুবিচার-অবিচার, কল্যাণ-অকল্যাণ, শান্তি-অশান্তি, জন্ম-মৃত্যু, আকাশ-পাতাল, হাসি-কান্না, আলো-অন্ধকার, উত্তম-অধম, সম্ভব-অসম্ভব, উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ, কৃতকার্য-অকৃতকার্য ইত্যাদি। তবে মানব জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য এবং আধ্যাত্মিক বিজয় অর্জনের প্রক্রিয়ায় সত্য ও মিথ্যার ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি ধর্মীয় জীবন-যাপনে সত্যের কোন বিকল্প নেই। তবুও অলৌকিক উপায়েই সত্যের বিপরীতে মিথ্যা জন্ম লাভ করেছে। মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব প্রতিনিধিকে সত্য ও মিথ্যা নির্ণয় করার জ্ঞান-বুদ্ধির পক্ষে বিপক্ষে অসংখ্য বাণী অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিঃসন্দেহে এটাই হ’ল সত্য ভাষণ। এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ, তিনিই হ’লেন পরাক্রমশালী মহাপ্রাজ্ঞ’ {আলে ইমরান ৬২}।
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটাই প্রমাণ যে, আল্লাহই সত্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা যাদের পূজা করে সব মিথ্যা। আল্লাহ সর্বোচ্চ মহান’ {লোক্বমান ৩০}।
একই ভাবার্থে পুনরায় আল্লাহ প্রত্যাদেশ করেন, ‘আল্লাহই সত্য, আর তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে, তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উচ্চে, মহান’ {হজ্জ ৬২}।
আলোচ্য বিষয়ের প্রমাণে ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা সত্য নিয়ে আগমন করেছে এবং সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে তারাই তো আল্লাহভীরু’ {যুমার ৩৩}।
সত্যের অনুকূলে মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহ সত্যকে সত্যে পরিণত করেন স্বীয় নির্দেশে, যদিও পাপীদের তা মনঃপূত নয়’ {ইউনুস ৮২}।
নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী ও বহির্ভূত দৃশ্য অদৃশ্য সবার উপরে আল্লাহ সত্য, তাঁর উপরে কেউ নেই। এই মহা সত্যের আলোচনায় উপরের আয়াতগুলো উপস্থাপিত হ’ল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সত্যের মূলে কুঠারাঘাত করার জন্যই মিথ্যার উদ্ভব হয়েছে এবং মিথ্যার কর্ণধার হিসাবে শয়তানের আবেদন নিবেদন অনুমোদিত হয়েছে মহান আল্লাহর দরবারে। শয়তানের এই আবেদন ছিল, মূলতঃ কৃত্রিমভাবে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে মানব জাতিকে সত্যের পথে বাধাগ্রস্ত করা, যা মানব জাতির অজ্ঞাত নয়। বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যতের মালিক মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা‘আলা উদভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মহাব্যবস্থাকল্পেই তাঁর প্রতি অবিচল থাকার জন্য বিভিন্নভাবে নির্দেশ প্রদান করেন।
এক ও অদ্বিতীয় মহাপবিত্র সত্তা আল্লাহকে অকৃত্রিমভাবে সর্বান্তকরণে সত্যরূপে গ্রহণ করা, পক্ষান্তরে এই সুন্দরতম ধারণাকে শয়তানের প্ররোচনায় সন্দেহ বা মিথ্যায় রূপান্তরিত করার চক্রান্ত হ’তে মুক্তির প্রয়াসেই সত্য-মিথ্যা অভিযানের অবতারণা।
সত্যের মধ্যে মিথ্যার অনুপ্রবেশ, বিশেষ করে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে মিথ্যা চিন্তা বা মিথ্যা রচনার কথা একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির পক্ষে কল্পনা করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। অথচ শয়তান এরূপ গর্হিত ও অবিশ্বাস্য কাজেও সুযোগমত কোন কোন বান্দার মধ্যে ইন্ধন যুগিয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর প্রতি অপবাদ (মিথ্যা) আরোপ করে অথবা তাঁর নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তার চাইতে বড় যালেম কে? নিশ্চয়ই যালেমরা সফলকাম হবে না’ {আন‘আম ২১}।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহর প্রতি যারা মিথ্যা আরোপ করেছে, তারাই যালেম, সীমালংঘনকারী’ {আলে ইমরান ৯৪}।
তিনি আরো বলেন, ‘যে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে অথবা তার কাছে সত্য আসার পর তাকে অস্বীকার করে, তার কি স্মরণ করা উচিত নয় যে, জাহান্নামই সে সব কাফেরের আশ্রয়স্থল হবে। যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎ কর্মপরায়ণদের সাথে আছেন’ {আনকাবূত ৬৮-৬৯}।
ইনশাআল্লাহ চলবে ...
রচনাঃ
রফীক আহমাদ
শিক্ষক (অবঃ)
বিরামপুর, দিনাজপুর

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


