প্রথম পর্ব ...
সত্যকে নিয়ে প্রতারণার প্রেক্ষাপটে, মিথ্যাবাদীদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বলেন,‘আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নিবেন মিথ্যুকদেরকে। যারা মন্দ কাজ করে, তারা কি মনে করে যে, তারা আমার হাত থেকে বেঁচে যাবে? তাদের ফায়ছালা খুবই মন্দ’ {আনকাবূত ৩-৪}।
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজন অনুপাতে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক-বিবেচনা দান করেছেন। এই জ্ঞানের দ্বারা যারা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে, তারা অবশ্যই আল্লাহর আশ্রয় লাভ করেছে। শয়তান শত চেষ্টা দ্বারাও এদের কোন ক্ষতি করতে পারে না, এটা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে যারা এই জ্ঞানের দ্বারা অনধিকার চর্চায় মত্ত হয়েছে, শয়তান সেখানেই একটা সুন্দর আশ্রয় ও সুযোগ লাভ করেছে। অতঃপর চিত্তাকর্ষক ও লোভনীয় বস্তু সামগ্রী দ্বারা তাদের হৃদয় জয় করে, আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়া স্তব্ধ করে দেয়। মানব জীবনে সমস্ত পাপকর্মের জন্মদাতা শয়তান কোন ব্যক্তিকে বিভিন্ন পাপে আচ্ছাদিত করেও পুরোপুরি স্বস্তি পায় না, যতক্ষণ না তাকে আল্লাহর চরম অসন্তুষ্টির পাপ শিরকে লিপ্ত করতে পারে। কারণ শিরকে লিপ্ত হওয়ার অর্থই আল্লাহদ্রোহীতায় লিপ্ত হওয়া। এক পর্যায়ে এরা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রটনাও করে এবং আল্লাহর নিদর্শনকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। মহাজ্ঞানী আল্লাহ এদেরকে সীমালংঘনকারী ও শ্রেষ্ঠ যালেম বলে ঘোষণা দিয়ে উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেছেন।
উক্ত কাফের, যালেম ও অপবাদকারীদেরকে সংশোধন করার সুযোগ হিসাবে যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের আগমন ঘটেছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই আল্লাহ ও নবী-রাসূল উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহদ্রোহীই থেকে যায়। এদের সম্পর্কে সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাঁর মহাসত্য কিতাবে প্রত্যাদেশ করেন যে, ‘এরপর আমি একাদিক্রমে রাসূল প্রেরণ করেছি। যখনই কোন উম্মতের কাছে তাঁর রাসূল আগমন করেছেন, তখনই তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে। অতঃপর আমি তাদের একের পর এক ধ্বংস করেছি এবং তাদেরকে কাহিনীর বিষয়ে পরিণত করেছি। সুতরাং ধ্বংস হোক অবিশ্বাসীরা’ {মুমিনূন ৪৪}।
একই মর্মার্থে অন্যত্র মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে বলেন, ‘বলুন, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর, তবে সৎপথ পাবে। রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া’ {নূর ৫৪}।
অতঃপর মিথ্যাবাদী বান্দাদের সন্বোধন করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হ্যাঁ, তোমার কাছে আমার নির্দেশ এসেছিল। অতঃপর তুমি তাকে মিথ্যা বলেছিলে, অহংকার করেছিলে এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলে। যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, ক্বিয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখ কালো দেখবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নাম নয় কি?’ {যুমার ৫৯-৬০}।
একই বিষয়ে পুনরায় বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা কুরআন আসার পর তা অস্বীকার করে, তাদের মধ্যে চিন্তা-ভাবনার অভাব রয়েছে। এটা অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ। এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পিছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আপনাকে তো তাই বলা হয়, যা বলা হ’ত পূর্ববর্তী রাসূলগণকে। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তার কাছে রয়েছে ক্ষমা এবং রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ {হা-মীম-সাজদাহ ৪১-৪৩}।
মিথ্যাবাদীদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যারা আমার নিদর্শনাবলীকে (আয়াত সমূহকে) মিথ্যা বলে, তাদেরকে তাদের নাফারমানীর কারণে আযাব স্পর্শ করবে’ {আন‘আম ৪৯}।
মানব সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অনায়াসেই দৃষ্টিগোচর হবে যে, সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব নিয়েই মানুষ প্রথম হ’তেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর জন্ম-মৃত্যুর ন্যায় প্রতিটি মানুষের মধ্যে সত্য ও মিথ্যার জন্ম-মৃত্যু ঘটছে আবহমানকাল ধরে। জন্ম-মৃত্যু মহাক্ষমতার মালিক আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত সত্য। মিথ্যা কখনও এই মহাসত্যের অবমাননা করতে পারবে না। তবে সন্দেহের ধূম্রজাল এঁকে আচ্ছন্ন করে রাখার ব্যাপক কৌশল অবলম্বন করতে পারে মাত্র। যেমন মিথ্যাবাদীদের ধারণা, মৃত্যুর পর তাদের কোন অস্তিত্ব থাকবে না বা পুনরুত্থিত হবে না এবং ক্বিয়ামতও হবে না। এ ধারণার বশবর্তী হয়েই মিথ্যাবাদীরা আল্লাহ ও রাসূলদের অবিশ্বাস ও অস্বীকার করেছে। কিন্তু মিথ্যাবাদীরা যদি তাদের গোড়ার ইতিহাসে ফিরে তাকায় তবে মৃত্যুর পরের চাইতেও তা কঠিন দেখবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরেও কিছু উপাদান থাকে, কিন্তু জন্মের পূর্বে তার কিছুই থাকে না, সামান্য ঘৃণিত পদার্থের সূত্র ধরে কত সুন্দর মানুষের আবির্ভাব হয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অসীম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানের দ্বারা মানব সৃষ্টি করেন, অতঃপর তুচ্ছ মানবের কাছেই অস্বীকৃতি ও অবিশ্বাসের প্রত্যুত্তর লাভ করেন। মহা ধৈর্যশীল আল্লাহ তা‘আলা সীমালংঘনকারী এই সব সম্প্রদায়কে কখনও রেহাই দিবেন না। এদের কাউকে ইহজগতেই পাকড়াও করেছেন এবং পরজগতেও পাকড়াও করবেন। আর কিছু সংখ্যককে ইহজগতে সুখভোগের সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্ত হ’তেই সাংঘাতিকভাবে পাকড়াও করবেন, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
পৃথিবীর শেষ অধ্যায়ে মানব জাতির নৈতিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার জন্যই পবিত্র কুরআনের ধারক ও বাহক মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে ভরপুর মানব সমাজের অনেকেই তাঁকে মিথ্যাবাদী হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের ভ্রম সংশোধনের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা পুনঃপুনঃ প্রত্যাদেশ বাণী প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দিবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমান ভিত্তিক কথাবার্তা বলে থাকে’ {আন‘আম ১১৫-১১৬}।
রাসূল (ছাঃ)-এর সম্পর্কে বাণী হ’ল, ‘মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী’ {মুনাফিকূন ১}।
সূরা ইউনুস-এর ১০৮ নং আয়াতে সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে প্রত্যাদেশ করেন, ‘বলুন, হে মানবকূল! সত্য তোমাদের কাছে পৌঁছে গেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে। এখন যে কেউ পথে আসে সে পথপ্রাপ্ত হয় স্বীয় মঙ্গলের জন্য। আর যে বিভ্রান্ত ঘুরতে থাকে, সে স্বীয় অমঙ্গলের জন্য বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকবে। অনন্তর আমি তোমাদের উপর অধিকারী নই’ {ইউনুস ১০৮}।
একইভাবে অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক’ {তওবাহ ১১৯}।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ‘আমি সত্যসহ এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং সত্যসহ এটা অবতীর্ণ হয়েছে। আমি তো আপনাকে শুধু সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শক করেই প্রেরণ করেছি’ {বনী ইসরাঈল ১০৫}।
ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে শেষ হবে ...
রচনাঃ
রফীক আহমাদ
শিক্ষক (অবঃ)
বিরামপুর, দিনাজপুর

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


