মানুষ কেবল দেহসর্বস্ব জীব নয়। সুন্দর দৈহিক অবয়বের সাথে মহান আল্লাহ মানুষকে সুন্দর একটি ক্বলব বা অন্তর দিয়েছেন। যার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা করে জীবনের ভাল-মন্দ বেছে নেয়। মানুষের অন্তরের চিন্তা-ভাবনার উপরই নির্ভর করে তার অন্যান্য অঙ্গের ভাল কাজ বা মন্দ কাজ সম্পাদন করা। এই ক্বলব বা অন্তরেই মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আক্বীদার অবস্থান। আর আল্লাহ বান্দার অন্তরই দেখেন।*১* এই ক্বলব বা অন্তর হ’ল পরিকল্পনাকারী এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি বাস্তবায়নকারী। অন্তর ভাল থাকলে, মানুষের কাজও ভাল হবে।*২* অন্তর বা মন খারাপ থাকলে, কাজে মনোযোগ থাকে না। কাজ হয় অগোছালো, অসুন্দর। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় এই অন্তরেরও রোগ-ব্যাধি হয়ে থাকে। শরীরের অন্যান্য রোগের কথা মানুষ জানলেও অন্তরের রোগ সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। ফলে অধিকাংশ মানুষের অন্তর সুস্থ না থাকার কারণে পাপ কাজ করেই যাচ্ছে। আল্লাহর আযাবের কথা শুনেও কর্ণপাত করছে না। অন্তর কঠিন হওয়া অন্তরের একটি অন্যতম রোগ। অন্তর কঠিন হ’লে মানুষ আল্লাহর আযাব ও জাহান্নামের শাস্তির কথা শুনে বিগলিত হয় না। আল্লাহ বনী ইসরাঈলদের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন’ {বাক্বারা ২/৭৪}। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘বস্তুতঃ তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাল, যে কাজ তারা করছিল’ {আন‘আম ৬/৪৩}। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ। তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে’ {যুমার ৩৯/২২}। আল্লাহ আরো বলেন, ‘তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। অতএব তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে’ {হাদীদ ৫৭/১৬}।
অন্তর কঠিন হওয়ার আলামত :
(১) আল্লাহর আনুগত্য ও ভালকাজে অলসতা : মানুষের অন্তর কঠিন হ’লে ইবাদতে অলসতা চলে আসবে। ছালাত পড়বে কিন্তু অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে না। ছালাতে নফল ও সুন্নাত আদায়ের পরিমাণ কমে যাবে। মুনাফিকদের চরিত্র প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘তারা ছালাতে আসে অলসতার সাথে আর ব্যয় করে সংকুচিত মনে’ {তওবা ৯/৫৪}। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায় তখন তারা অলসভাবে দাঁড়ায়’ {নিসা ৪/১৪২}।
(২) আল্লাহর আয়াত ও উপদেশ শুনে অন্তর প্রভাবিত না হওয়া : অন্তর কঠিন হ’লে মানুষ কুরআনের আয়াত শুনে বিশেষ করে আযাবের আয়াতগুলি শুনে ভীত হয় না; বরং কুরআন পড়া ও শোনাকে নিজের কাছে ভারী মনে হয়। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন’ {ক্বাফ ৫০/৪৫}। অন্যত্র আল্লাহ মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন, ‘যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় আল্লাহর আয়াত, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা করে’ {আনফাল ৮/২}।
(৩) দুনিয়াতে আল্লাহর আযাব-গযব ও মানুষের মৃত্যু দেখে অন্তর ভীত না হওয়া : মানুষ সাধারণত আযাব-গযব ও নিকটজনের মৃত্যু দেখলে ভীত হয়। কিন্তু কেউ যদি ভীত না হয়, ভাল আমল না করে, খারাপ আমল ছেড়ে না দেয়, তাহ’লে বুঝতে হবে তার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতিবছর তারা দু’একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে, অথচ তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না’ {তওবা ৯/১২৬}।
(৪) দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পাওয়া ও আখেরাতকে ভুলে যাওয়া : মুমিনদের আসল বাসস্থান হ’ল জান্নাত। দুনিয়া হ’ল আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। যদি কেউ আখেরাতের কথা ভুলে দুনিয়া অর্জনের পিছনে লেগে থাকে, তাহ’লে বুঝতে হবে তার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
(৫) আল্লাহকে সম্মান করা কমে যাওয়া : আল্লাহকে সম্মান না করার অর্থ হ’ল আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে মান্য না করা। সুতরাং কেউ আল্লাহর আদেশকে মান্য না করে নিষেধগুলিতে ডুবে থাকলে বুঝতে হবে লোকটির অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।
ইনশাআল্লাহ্ চলবে ...
রচনাঃ
মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াদূদ
তুলাগাঁও, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
*১* মুসলিম, মিশকাত তাহক্কীক আলবানী, ’রিক্কাক’ অধ্যায়, 'লোক দেখানো ও নাম কুড়ানো’ অনুচ্ছেদ হা/৫৩১৪, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৭।
*২* বুখারী হা/৫২, মুমলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৫৮৮।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



